ঢাকা ০১:৪৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১০ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
দেশের স্বার্থে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনায় প্রস্তুত সরকার: তারেক রহমান সোনার ভরিতে ৩২৬৫ ও রুপার ভরিতে ৩৫০ টাকা কমলো জাতীয় মহিলা পার্টির আহ্বায়ক নুরুন নাহার বেগম সদস্য সচিব জেসমীন নূর প্রিয়াংকা পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন প্রথম দফায় ১৫২ আসনে ভোটগ্রহণ চলছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান অবরোধে অচলাবস্থা, আলোচনায় চাপ বাড়াচ্ছে পাকিস্তান হরমুজে নৌ-সংঘাত: ইরানের হামলায় তিন জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত, আটক দুটি ১০ বছর পর তনু হত্যা রহস্যে অগ্রগতি, সাবেক সেনা সদস্য রিমান্ডে পাচারের অর্থ উদ্ধারে ১০ দেশের সঙ্গে চুক্তি প্রক্রিয়াধীন: সংসদে প্রধানমন্ত্রী ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারে টান: প্যাট্রিয়ট ও থাডের অর্ধেক প্রায় শেষ ভারত-শাসিত কাশ্মীরে যাত্রীবাহী বাস খাদে পড়ে অন্তত ২১ জনের প্রাণহানি

Durgotsava of Shikdar’s house : সম্প্রীতির বন্ধন ‘শিকদার বাড়ির দুর্গোৎসব (১)

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:২৯:৪৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২ ৪০০ বার পড়া হয়েছে
ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

শিকদার বাড়ির দুর্গেোৎসব

 

অনিরুদ্ধ

বাগেরহাট কাটাখালি মোড়ে গন্তব্য ‘শিকদার বাড়ির’ বলতেই অটোওয়া বললো ওঠে বসুন। কোন প্রশ্ন না করেই ওঠে বসলাম। খুলনা-মোংলা হাইওয়ে দিয়ে উড়ে চলছে আটোরিকশা। কিছুদূর যাবার পর হাইওয়ে থেকে বামে মোড় নিয়ে অটো ডুকে পড়ে একটি লিংক রুটে। মাইল ফলকে লেখা গুচ্ছগ্রাম চুলকাঠি। দু’পাশে ছায়াঘেরা পরিবেশ। মাছ চাষের বেশ কিছু পুকুর দেখা গেলো। অটোচালক জানান, চিংড়িসহ নানা জাতের মাছ চাষ হয় এসব পুকুরে। আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে অটো গিয়ে থামলো ‘সিংহ দুয়ারী’  বাড়ির সামনে। অটোওয়ালা বললেন, এটাই শিকদার বাড়ি।

বাড়ি দক্ষিণ পাশে বিশাল প্যাণ্ডেল। কম করে হলেও হাজার খানেক দর্শনার্থী এক সঙ্গে বসে পুজার নানা আয়োজন উপভোগ করতে পারবেন। প্যাণ্ডেলের পাশের রাস্তাটি সাজিয়ে তুলতে বেশ কয়েকজন শ্রমিক কাজ করে চলেছেন। তাদের মধ্যে বয়স্ক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ‘শিকদার বাড়ির পুজো সকলের পুজো’। মনে হচ্ছে, আপনি–কথা শেষ করা গেলো না। ছোঁ মেরে মুখের কথা টেনে নিয়ে বললেন, আমি মুসলিম তাতে কি? এই গোটা অঞ্চলের পুজো এটি। আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে ঘুরে ফিরে আনন্দ উপভোগ করি। এই দেখুন কাজ করছি সবাই মিলে। গায়ে  লেখা ‘আমরা মানুষ’!

দুলাল কৃষ্ণ শিকদার

মানুষের এই ভালোবাসা এবং সম্প্রীতি মনে করিয়ে দেয়-

‘মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মোসলমান।
মুসলিম তার নয়ণ-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ॥
এক সে আকাশ মায়ের কোলে
যেন রবি শশী দোলে,
এক রক্ত বুকের তলে, এক সে নাড়ির টান’

হাকিমপুর গ্রামই নয়, বাগেরহাট জেলা তথা বাংলাদেশের মানচিত্র ছাপিয়ে এশিয়া জয় করে বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে ‘শিকদার বাড়ির’ পুজো এবং সম্প্রীতির খ্যাতি।

শিক্ষানুরাগী দুলাল কৃষ্ণ শিকদার

এক নিভৃত গ্রাম হাকিমপুর। গ্রামের অধিকাংশ মানুষই অশিক্ষিত। এখানের ছেলে-মেয়েরা  শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত।  গ্রামের শিক্ষা প্রসারে ভাবতে থাকেন দুলাল বাবু। নির্ঘুম রাত কাটে তার। মাঝ রাতে বিছানা ছেড়ে ঘরের মধ্যে পায়চারি করেন, ভাবেন শত বাধা ডিঙ্গিয়ে তাকে এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। গভীর  রাতে দুলাল বাবু যখন ভাবনার অতলে, তখন যেন স্বামী জী দাঁড়িয়ে বলছেন,

‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর!’

অবশেষে যেই ভাবনা সেই কাজ। দুলাল বাবু সিদ্ধান্ত নিলেন, নিজের অর্থে ‘হাকিমপুর পল্লী মঙ্গল স্কুল’ প্রতিষ্ঠাতা করেন তিনি। কাদাজল মাড়িয়ে ছেলে মেয়েদের স্কুলে পথে দেখতে পেয়ে নিভৃতে চোখের জল ফেলেন দুলাল কৃষ্ণ শিকদার। মনে মনে ভাবেন, আজ যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তিনি গড়ে দিয়ে গেলেন, একদিন তার সন্তানরা এলাকার মানুষের জন্য আরও বড় করার কাজে হাত লাগাবে।

 

দুলাল বাবু মনে অনুরণন হতে থাকে-

গাহি সাম্যের গান-
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি,
সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।
‘মানুষ এনেছে গ্রন্থ, গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোন’

 

মহামিলনের নজির গড়েন দুলাল বাবু

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার পর দুলাল বাবু ভাবেন এলাকার মানুষকে সম্প্রীতির ছাতার তলায় আনতে দুর্গোৎসবের আয়োজন করবেন।  যেখানে কোন ধর্ম নয়, মানুষের মিলন মেলাই হবে উৎসবের প্রধান বৈশিষ্ট। সেই ভাবনা থেকে ২০১০ সালে শুরু করেন সর্ববৃহৎ দুর্গোৎসব।  পন্ডপে স্থান পায় দুই শতাধিক প্রতিমা। যেখানে রয়েছে, যুগে যুগে আসা অবতারদের প্রতিমা।

(প্রতিবেদন নির্মাণ সহযোগিতা পুজা দেবী-মা)

 

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

Durgotsava of Shikdar’s house : সম্প্রীতির বন্ধন ‘শিকদার বাড়ির দুর্গোৎসব (১)

আপডেট সময় : ০৯:২৯:৪৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২

শিকদার বাড়ির দুর্গেোৎসব

 

অনিরুদ্ধ

বাগেরহাট কাটাখালি মোড়ে গন্তব্য ‘শিকদার বাড়ির’ বলতেই অটোওয়া বললো ওঠে বসুন। কোন প্রশ্ন না করেই ওঠে বসলাম। খুলনা-মোংলা হাইওয়ে দিয়ে উড়ে চলছে আটোরিকশা। কিছুদূর যাবার পর হাইওয়ে থেকে বামে মোড় নিয়ে অটো ডুকে পড়ে একটি লিংক রুটে। মাইল ফলকে লেখা গুচ্ছগ্রাম চুলকাঠি। দু’পাশে ছায়াঘেরা পরিবেশ। মাছ চাষের বেশ কিছু পুকুর দেখা গেলো। অটোচালক জানান, চিংড়িসহ নানা জাতের মাছ চাষ হয় এসব পুকুরে। আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে অটো গিয়ে থামলো ‘সিংহ দুয়ারী’  বাড়ির সামনে। অটোওয়ালা বললেন, এটাই শিকদার বাড়ি।

বাড়ি দক্ষিণ পাশে বিশাল প্যাণ্ডেল। কম করে হলেও হাজার খানেক দর্শনার্থী এক সঙ্গে বসে পুজার নানা আয়োজন উপভোগ করতে পারবেন। প্যাণ্ডেলের পাশের রাস্তাটি সাজিয়ে তুলতে বেশ কয়েকজন শ্রমিক কাজ করে চলেছেন। তাদের মধ্যে বয়স্ক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ‘শিকদার বাড়ির পুজো সকলের পুজো’। মনে হচ্ছে, আপনি–কথা শেষ করা গেলো না। ছোঁ মেরে মুখের কথা টেনে নিয়ে বললেন, আমি মুসলিম তাতে কি? এই গোটা অঞ্চলের পুজো এটি। আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে ঘুরে ফিরে আনন্দ উপভোগ করি। এই দেখুন কাজ করছি সবাই মিলে। গায়ে  লেখা ‘আমরা মানুষ’!

দুলাল কৃষ্ণ শিকদার

মানুষের এই ভালোবাসা এবং সম্প্রীতি মনে করিয়ে দেয়-

‘মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মোসলমান।
মুসলিম তার নয়ণ-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ॥
এক সে আকাশ মায়ের কোলে
যেন রবি শশী দোলে,
এক রক্ত বুকের তলে, এক সে নাড়ির টান’

হাকিমপুর গ্রামই নয়, বাগেরহাট জেলা তথা বাংলাদেশের মানচিত্র ছাপিয়ে এশিয়া জয় করে বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে ‘শিকদার বাড়ির’ পুজো এবং সম্প্রীতির খ্যাতি।

শিক্ষানুরাগী দুলাল কৃষ্ণ শিকদার

এক নিভৃত গ্রাম হাকিমপুর। গ্রামের অধিকাংশ মানুষই অশিক্ষিত। এখানের ছেলে-মেয়েরা  শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত।  গ্রামের শিক্ষা প্রসারে ভাবতে থাকেন দুলাল বাবু। নির্ঘুম রাত কাটে তার। মাঝ রাতে বিছানা ছেড়ে ঘরের মধ্যে পায়চারি করেন, ভাবেন শত বাধা ডিঙ্গিয়ে তাকে এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। গভীর  রাতে দুলাল বাবু যখন ভাবনার অতলে, তখন যেন স্বামী জী দাঁড়িয়ে বলছেন,

‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর!’

অবশেষে যেই ভাবনা সেই কাজ। দুলাল বাবু সিদ্ধান্ত নিলেন, নিজের অর্থে ‘হাকিমপুর পল্লী মঙ্গল স্কুল’ প্রতিষ্ঠাতা করেন তিনি। কাদাজল মাড়িয়ে ছেলে মেয়েদের স্কুলে পথে দেখতে পেয়ে নিভৃতে চোখের জল ফেলেন দুলাল কৃষ্ণ শিকদার। মনে মনে ভাবেন, আজ যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তিনি গড়ে দিয়ে গেলেন, একদিন তার সন্তানরা এলাকার মানুষের জন্য আরও বড় করার কাজে হাত লাগাবে।

 

দুলাল বাবু মনে অনুরণন হতে থাকে-

গাহি সাম্যের গান-
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি,
সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।
‘মানুষ এনেছে গ্রন্থ, গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোন’

 

মহামিলনের নজির গড়েন দুলাল বাবু

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার পর দুলাল বাবু ভাবেন এলাকার মানুষকে সম্প্রীতির ছাতার তলায় আনতে দুর্গোৎসবের আয়োজন করবেন।  যেখানে কোন ধর্ম নয়, মানুষের মিলন মেলাই হবে উৎসবের প্রধান বৈশিষ্ট। সেই ভাবনা থেকে ২০১০ সালে শুরু করেন সর্ববৃহৎ দুর্গোৎসব।  পন্ডপে স্থান পায় দুই শতাধিক প্রতিমা। যেখানে রয়েছে, যুগে যুগে আসা অবতারদের প্রতিমা।

(প্রতিবেদন নির্মাণ সহযোগিতা পুজা দেবী-মা)