স্ক্রিনের অদৃশ্য শিকলে বন্দি শৈশব
- আপডেট সময় : ০৯:৪৯:২০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬ ১১১ বার পড়া হয়েছে
মোবাইল-সোশ্যাল মিডিয়ার আসক্তি ঠেকাতে বিশ্বজুড়ে কড়াকড়ি, শিশুদের রক্ষায় কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
খাও, তারপর মোবাইলটা পাবে। বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবারে এটি এখন পরিচিত একটি বাক্য। কান্না থামাতে, খাওয়াতে, এমনকি অতিথির সামনে শিশুকে শান্ত রাখতেও অনেক অভিভাবক স্মার্টফোন তুলে দিচ্ছেন সন্তানের হাতে। কয়েক মিনিটের জন্য সমস্যার সমাধান হলেও অজান্তেই শিশুকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে এক অদৃশ্য নির্ভরতার দিকে। সেই নির্ভরতা ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে আসক্তিতে।
একসময় শিশুর শৈশবের সঙ্গী ছিল মাঠ, গাছ, নদী, বই, খেলনা আর বন্ধুদের সঙ্গে বিকেলের খেলাধুলা। এখন সেই জায়গা দখল করে নিচ্ছে মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। শিশুরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনের সামনে কাটাচ্ছে। বাস্তব পৃথিবীর বদলে তারা ডুবে থাকছে ভার্চুয়াল জগতে। চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদরা সতর্ক করছেন, এটি শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিবর্তন নয়, বরং শিশুদের সুস্থ বিকাশের জন্য একটি বৈশ্বিক সংকট।
এই সংকট মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ একের পর এক কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বয়সভিত্তিক সীমা নির্ধারণের বিষয়ে কাজ করছে। অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করেছে।
ব্রাজিল বয়স যাচাই ও অভিভাবকীয় তত্ত্বাবধান বাধ্যতামূলক করেছে। চীন বহু বছর ধরেই অপ্রাপ্তবয়স্কদের অনলাইন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, গ্রিস, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, নরওয়ে, কানাডা ও যুক্তরাজ্যসহ আরও অনেক দেশ একই পথে হাঁটছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, বরং শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি বৈশ্বিক আন্দোলনের সূচনা।
কেন এত উদ্বেগ?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়। এটি এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে ব্যবহারকারী যত বেশি সম্ভব সময় সেখানে কাটান। অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীর পছন্দ বুঝে একের পর এক ভিডিও, ছবি বা পোস্ট দেখাতে থাকে। শেষ নেই এমন স্ক্রলিং, মুহূর্তে মুহূর্তে নোটিফিকেশন, লাইক ও মন্তব্যের আকর্ষণ মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ বাড়ায়। এর ফলে বারবার ফোন হাতে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়।
ডোপামিন নিঃসরণ হলো মানব মস্তিষ্কে তৈরি একটি বিশেষ রাসায়নিক বা নিউরোট্রান্সমিটার-এর নির্গমন প্রক্রিয়া। কোনো ভালো কাজ, পুরস্কার বা তৃপ্তিদায়ক অভিজ্ঞতার পর মস্তিষ্ক ডোপামিন নিঃসরণ করে। এটি মানুষকে কোনো লক্ষ্য অর্জনে অনুপ্রাণিত করে, মনোযোগ বাড়ায় এবং আনন্দ অনুভূতি ও সন্তুষ্টি প্রদান করে।

প্রাপ্তবয়স্করাও যেখানে এই আকর্ষণ সামলাতে হিমশিম খান, সেখানে শিশু-কিশোরদের জন্য বিষয়টি আরও কঠিন। কারণ তাদের মস্তিষ্ক তখনও বিকাশের পর্যায়ে থাকে। আত্মনিয়ন্ত্রণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ঝুঁকি মূল্যায়নের ক্ষমতা পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। ফলে তারা খুব সহজেই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নকশাগত কৌশলের শিকার হয়।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ক্রিন-আসক্তি এখন অনেক ক্ষেত্রে আচরণগত আসক্তির বৈশিষ্ট্য বহন করছে। মোবাইল কেড়ে নিলে শিশু রেগে যাওয়া, কান্নাকাটি করা, অস্থির হয়ে পড়া বা আক্রমণাত্মক আচরণ করা, এসব লক্ষণ এখন অস্বাভাবিক নয়।
কী বলছে গবেষণা
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের ঘুম কমিয়ে দেয়, মনোযোগের ঘাটতি তৈরি করে এবং লেখাপড়ায় আগ্রহ কমিয়ে দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটানো শিশু-কিশোরদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, একাকীত্ব এবং আত্মসম্মানবোধের সংকটও বাড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্দার সামনে দীর্ঘ সময় কাটালে শিশুর মস্তিষ্ক সবসময় দ্রুত উদ্দীপনায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে বই পড়া, শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ দেওয়া কিংবা ধৈর্য ধরে কোনো কাজ করার ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
শারীরিক ক্ষতির দিকেও সতর্কতা
অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে শুধু মানসিক নয়, শারীরিক সমস্যাও বাড়ছে। চক্ষু বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখ শুষ্ক হয়ে যাওয়া, ঝাপসা দেখা, মাথাব্যথা এবং চোখে চাপ অনুভূত হতে পারে।
অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় মাথা নিচু করে মোবাইল ব্যবহারে ঘাড়, কাঁধ ও মেরুদণ্ডে অস্বাভাবিক চাপ পড়ে। একই সঙ্গে খেলাধুলা কমে যাওয়ায় স্থুলতা ডায়াবেটিস এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকিও ভবিষ্যতে বাড়তে পারে।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি–নিরাপত্তা
শিশুদের জন্য ইন্টারনেটের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো অনলাইন নিরাপত্তা। সাইবার বুলিং, পরিচয় গোপন করে প্রতারণা, অনুপযুক্ত কনটেন্ট, ভুয়া তথ্য, অনলাইন গেমের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রতারণা এবং ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস এসব ঘটনা বাড়ছে।
অনেক শিশু বুঝতেই পারে না, কার সঙ্গে কথা বলা নিরাপদ আর কার সঙ্গে নয়। ফলে তারা সহজেই প্রতারণার শিকার হতে পারে। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের সাজানো-গোছানো জীবন দেখে নিজেদের জীবনকে ছোট মনে করার প্রবণতাও তৈরি হয়, যা মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত। বড় শিশুদের ক্ষেত্রেও বয়স অনুযায়ী সীমিত সময় স্ক্রিন ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল, ট্যাব বা টেলিভিশন ব্যবহার বন্ধ রাখা উচিত।
একই সঙ্গে প্রতিদিন পর্যাপ্ত শারীরিক খেলাধুলা, বই পড়া, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা শিশুর সুস্থ বিকাশের জন্য অপরিহার্য।
পরিবারই প্রথম প্রতিরক্ষা
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের স্ক্রিন-আসক্তি প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর জায়গা হলো পরিবার। অভিভাবকদের উচিত সন্তানকে ব্যস্ত রাখার সহজ উপায় হিসেবে মোবাইল না দিয়ে বিকল্প কার্যক্রম তৈরি করা। গল্প শোনানো, ছবি আঁকা, দাবা, লুডু, ব্লক দিয়ে খেলা, বাগান করা কিংবা খোলা মাঠে খেলতে উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, অভিভাবকদের নিজেদেরও দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। শিশুরা কথার চেয়ে আচরণ বেশি অনুসরণ করে। তাই পরিবারে স্ক্রিনমুক্ত সময় চালু করা যেতে পারে, যেমন খাওয়ার টেবিলে, পারিবারিক আড্ডায় কিংবা ঘুমানোর আগে কোনো মোবাইল নয়।

বিদ্যালয় ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব
শুধু পরিবার নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিদ্যালয়ে ডিজিটাল সাক্ষরতা, সাইবার নিরাপত্তা, ভুয়া তথ্য শনাক্তকরণ এবং দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো শিশুদের জন্য শক্তিশালী অনলাইন নিরাপত্তা আইন, কার্যকর বয়স যাচাই ব্যবস্থা, ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গণমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর করণীয়
বিশ্বজুড়ে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোরও নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। শিশুদের লক্ষ্য করে তৈরি আসক্তিকর নকশা, অবিরাম নোটিফিকেশন, অসীম স্ক্রলিং ও স্বয়ংক্রিয় ভিডিও চালুর মতো বৈশিষ্ট্য সীমিত করতে হবে। বয়স যাচাই আরও নির্ভুল করা এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ সংস্করণ উন্নত করা জরুরি।
বাংলাদেশের বাস্তবতা
বাংলাদেশেও শিশুদের হাতে স্মার্টফোনের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। অনলাইন শিক্ষা, বিনোদন এবং পরিবারের ব্যস্ততার কারণে অনেক শিশুই দিনের বড় অংশ স্ক্রিনে কাটায়। শহরের পাশাপাশি গ্রামেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এর সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।
তাই প্রয়োজন জাতীয় পর্যায়ে শিশুদের নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তোলার একটি সমন্বিত নীতি। এতে পরিবার, বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যখাত, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের সমন্বিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
শৈশব ফিরিয়ে আনার সময় এখনই
প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, শিক্ষা ও জ্ঞানের নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। তাই প্রযুক্তিকে শত্রু হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রযুক্তি যেন শৈশবকে গ্রাস না করে, বরং শিশুর শেখা, সৃজনশীলতা ও বিকাশের সহায়ক হয়, সেই ভারসাম্য তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উদ্যোগ স্পষ্ট করে দিচ্ছে, শিশুদের সুরক্ষার প্রশ্নে আর অপেক্ষার সুযোগ নেই। আইন প্রয়োজন, প্রযুক্তিগত সুরক্ষা প্রয়োজন, সচেতনতা প্রয়োজন। কিন্তু সবকিছুর আগে প্রয়োজন পরিবারে সময় দেওয়া, সন্তানের কথা শোনা, তার সঙ্গে খেলা, বই পড়া এবং বাস্তব জীবনের আনন্দ ফিরিয়ে আনা।
কারণ একটি স্মার্টফোন কয়েক ঘণ্টার জন্য একটি শিশুকে নীরব রাখতে পারে, কিন্তু একটি গল্প, একটি মাঠ, একটি বই, একটি গাছের ছায়া কিংবা বাবা-মায়ের স্নেহময় উপস্থিতিই তাকে গড়ে তুলতে পারে একজন সুস্থ, আত্মবিশ্বাসী এবং মানবিক মানুষ হিসেবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে আজই স্ক্রিনের অদৃশ্য শিকল ভাঙার উদ্যোগ নিতে হবে।


















