অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বিপর্যস্ত দেশ: ৭ জেলায় ভয়াবহ বন্যা প্রাণহানি ৪৪ নতুন করে প্লাবনের শঙ্কা
- আপডেট সময় : ০১:৪৮:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬ ৩১ বার পড়া হয়েছে
টানা অতিবৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং পাহাড়ধসের কারণে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা ভয়াবহ বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শনিবার (১১ জুলাই) সন্ধ্যা পর্যন্ত বন্যা ও পাহাড়ধস-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪৪ জন। আহত হয়েছেন আরও ৩৯ জন। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবারের সদস্য এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জনে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দৈনিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ এই সাত জেলার মোট ৫৮টি উপজেলা বন্যাকবলিত হয়েছে। পাহাড়ি ঢল, টানা বর্ষণ এবং নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় এসব জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। অনেক এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, কৃষিজমি তলিয়ে গেছে এবং বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও ব্যাহত হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন উপজেলা। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকায় একদিকে ভূমিধস, অন্যদিকে পাহাড়ি ঢলের কারণে শত শত বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় পাহাড়ি ঢলে ভেসে গিয়ে দুই শিশু মোহাম্মদ আশিক (৭) ও মোহাম্মদ মিরাজ (৩) মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারিয়েছে। স্থানীয়রা জানান, কয়েক দিনের টানা বর্ষণে পাহাড়ি ছড়া ও খাল উপচে পড়ায় মুহূর্তেই বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৪ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ভারী বর্ষণে এক সপ্তাহে মোট ১ হাজার ১৬৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে গত মঙ্গলবার একদিনেই ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম সর্বোচ্চ। অতিবৃষ্টির প্রভাবে পরে মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার নদ-নদীর পানি দ্রুত বেড়ে গিয়ে নতুন করে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, বর্তমানে ছয় জেলার পাঁচটি নদীর সাতটি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের পানি এখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এসব নদীর মধ্যে রয়েছে সাঙ্গু, মাতামুহুরী, কুশিয়ারা, মনু ও সোমেশ্বরী। এসব নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে এখনো জলাবদ্ধতা ও প্লাবন অব্যাহত রয়েছে। যদিও আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে, তবে নতুন করে ফেনী, সিলেট এবং উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে তিস্তা অববাহিকার জেলাগুলো, লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার নিম্নাঞ্চলে নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে উজানের ঢল অব্যাহত থাকলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এছাড়া ফেনী, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের উপকূলসংলগ্ন এলাকাতেও অতিবৃষ্টি অব্যাহত থাকলে জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে ব্যাপক ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করেছে। দুর্গত মানুষের জন্য ১ হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে বর্তমানে ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন আশ্রয় নিয়েছেন। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসাসেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো উদ্ধার ও ত্রাণ বিতরণে কাজ করছে।

ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বন্যাকবলিত জেলাগুলোর জন্য এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৬৫০ মেট্রিক টন চাল, ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা নগদ সহায়তা এবং শিশু খাদ্য ও গোখাদ্যের জন্য পৃথক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে বিভিন্ন দুর্গত এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক পরিবার এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী পায়নি এবং নিরাপদ আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন সংকট দেখা দিয়েছে।
এদিকে গত দুই দিনের তুলনায় গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত কিছুটা কমেছে। শনিবার দেশের সর্বোচ্চ ১৪৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ফরিদপুরে। এছাড়া চট্টগ্রামের আমবাগানে ১০৬ মিলিমিটার, রাঙামাটিতে ৯০ মিলিমিটার, বান্দরবানে ৮৮ মিলিমিটার এবং কক্সবাজারে ৫৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যার প্রবণতা বাড়ছে। তাই নদীর পানি ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস নিয়মিত অনুসরণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে বন্যা-পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং কৃষি ক্ষতি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।


















