রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন, জোরালো হচ্ছে রাজনৈতিক আলোচনা
- আপডেট সময় : ০১:৪১:২৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬ ৪১ বার পড়া হয়েছে
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন খুব শিগগিরই পদত্যাগ করতে পারেন, এমন তথ্য বঙ্গভবনের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি ইতোমধ্যে তার কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের পদত্যাগের বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে জাতীয় সংসদের স্পিকার বর্তমানে দেশের বাইরে থাকায় এখনও তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেননি।
বঙ্গভবনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি নিয়ে কোনো তাড়াহুড়ো করা হচ্ছে না। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে তার পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছে জমা দিতে হয়। তাই স্পিকার দেশে ফেরার পরই নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করবেন বলে পরিকল্পনা করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, পুরো প্রক্রিয়াটি এমনভাবে সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে যাতে কোনো ধরনের সাংবিধানিক জটিলতা বা রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি না হয়। এজন্যই স্পিকারের দেশে ফেরার অপেক্ষা করা হচ্ছে।
বর্তমানে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে অবস্থান করছেন। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী তার ২৬ জুলাই দেশে ফেরার কথা থাকলেও নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, সফর সংক্ষিপ্ত করে তিনি নির্ধারিত সময়ের দুই দিন আগেই, অর্থাৎ শুক্রবার দেশে ফিরছেন।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষরযুক্ত একটি পত্র স্পিকারের উদ্দেশে প্রেরণের মাধ্যমে পদত্যাগ করতে পারেন। একই সঙ্গে সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সংবিধানে স্পিকারের শারীরিক উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা না হলেও বাস্তবিক কারণে তাকে দেশে থাকা জরুরি। কারণ রাষ্ট্রপতি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করার সঙ্গে সঙ্গেই রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয়ে যায়। সেই মুহূর্ত থেকেই সাংবিধানিকভাবে স্পিকারকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়। এ কারণে স্পিকার দেশে ফেরার পর একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করবেন বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের নজির রয়েছে। এর আগে রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী দায়িত্ব পালনকালেই পদত্যাগ করেছিলেন। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতেও সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের পদক্ষেপ নতুন কোনো ঘটনা নয়।
এদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনেও রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। একাধিক রাজনৈতিক সূত্রের দাবি, বিএনপির উচ্চপর্যায় থেকে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে পদত্যাগের বার্তা দেওয়া হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ প্রকাশ্যে মন্তব্য করেননি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, রাষ্ট্রপতি যদি পদত্যাগ করতে চান, তাহলে সংবিধানে সেই সুযোগ রয়েছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগের জন্য কোনো নির্দেশ বা অনুরোধ করা হয়নি বলেও তিনি স্পষ্ট করেন।
অন্যদিকে বিএনপির একাধিক সূত্রের দাবি, রাষ্ট্রপতি ব্যক্তিগত অসুস্থতাকে পদত্যাগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করতে পারেন। তবে বঙ্গভবনের কর্মকর্তাদের মতে, অসুস্থতা কিংবা ব্যক্তিগত বা মানসিক কারণ—যে কারণই দেখানো হোক না কেন, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলেই তারা ধারণা করছেন।
গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে দেশের প্রথম সারির কয়েকটি সংবাদমাধ্যমেও সম্ভাব্য পদত্যাগের খবর প্রকাশিত হওয়ায় বিষয়টি রাজনৈতিক মহলে আরও গুরুত্ব পায়।
রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগের পাশাপাশি নতুন রাষ্ট্রপতি কে হবেন, তা নিয়েও আলোচনা তুঙ্গে উঠেছে। গত দুই দিন ধরে একজন জ্যেষ্ঠ সচিবের নাম সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে। যদিও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পরও নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। তখন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. মঈন খান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং নজরুল ইসলাম খানের নাম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে রাজনৈতিক মহলে আলোচিত হয়।
তবে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে দলের বাইরের কাউকে মনোনয়ন দেওয়ার পক্ষে তারা নন। তাদের ধারণা, বিএনপিরই একজন জ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ নেতাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
তারা আরও জানান, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দলের শীর্ষ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা শুরু হয়নি। কারণ, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করার সুযোগ রয়েছে। ফলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় রয়েছে।
গত বছরের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হলেও রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তার দায়িত্বে বহাল ছিলেন। সংসদ বিলুপ্তির আদেশ জারি করা, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে শপথ পড়ানো এবং পরবর্তীতে সেই সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত অধ্যাদেশে রূপ দিতে তার স্বাক্ষর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ও গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু করলেও তখন বিএনপি সাংবিধানিক সংকটের আশঙ্কা প্রকাশ করে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। ফলে সে সময় রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের উদ্যোগ আর এগোয়নি।
২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, তিনি বঙ্গভবন ছেড়ে যেতে আগ্রহী এবং দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চান। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিদেশি মিশনগুলো থেকে তার ছবি সরিয়ে ফেলা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেকে কোণঠাসা অবস্থায় দেখতে হওয়ায় তিনি অপমানবোধ করেছেন বলেও সেই সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছিলেন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে শপথবাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এরপর সরকারের সঙ্গে তার সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল। এমনকি তিনি বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠানে অংশ নেন এবং গত মে মাসে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্য সফরও করেন।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগের গুঞ্জনকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে যে, লন্ডন সফর শেষে দেশে ফেরার পর বিএনপি সরকারের সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, সেই প্রেক্ষাপটও তার সম্ভাব্য পদত্যাগের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। পেশায় একজন আইনজীবী হওয়ার পাশাপাশি তিনি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। এছাড়া ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
তার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিল মাসে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি তিনি পদত্যাগ করেন, তাহলে নির্ধারিত সময়ের প্রায় দুই বছর আগেই তার রাষ্ট্রপতির দায়িত্বের সমাপ্তি ঘটবে। সেই সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং পরবর্তী সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সূত্র বিবিসি



















