ঢাকা ১২:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
খুব দ্রুত বিশ্ববাজারে কমবে জ্বালানি তেলের দাম: ট্রাম্প ইসরায়েলে বহুমুখী হামলার প্রস্তুতি, মিত্রদের একজোট করছে ইরান এলএনজি সংরক্ষণ ও গ্যাসে রূপান্তরে বিনিয়োগে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র নিউ মেক্সিকো’র নাম পরিবর্তন করে নিউ আমেরিকা রাখার প্রস্তাব ট্রাম্পের রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের অন্যতম বড় সংকট : প্রধানমন্ত্রী সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটো নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিতের আহ্বান জনপ্রশাসন উপদেষ্টার ডেঙ্গুর ভয়াবহ ছোবল একদিনে রেকর্ড ১,৫৫৮ ভর্তি, মৃত্যু ৪ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানে গুরুত্ব রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দেড় লাখ  কোটি টাকা কোথায় আটকে আছে অর্থ

ডেঙ্গুর ভয়াবহ ছোবল একদিনে রেকর্ড ১,৫৫৮ ভর্তি, মৃত্যু ৪

বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ১১:২৯:০৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৯৩ বার পড়া হয়েছে

ভয়াবহ ছোবল একদিনে রেকর্ড ১,৫৫৮ ভর্তি, মৃত্যু ৪

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ছয় দিনে প্রাণ গেল ২০ জনের

 চলতি বছর আক্রান্ত ৪২ হাজার ৫৯০, মৃত্যু ১১৭

পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেওয়ার শঙ্কা স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর

ডেঙ্গুর ভয়াবহ ছোবলে ফের উদ্বেগের মুখে দেশ। প্রতিদিন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা। সেই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুও। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ দৈনিক পরিসংখ্যান বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ১ হাজার ৫৫৮ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এক দিনে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির হিসাবে এটি চলতি বছরের সর্বোচ্চ সংখ্যা। একই সময়ে প্রাণ গেছে আরও চারজনের। ফলে ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ নিয়ে স্বাস্থ্য খাতে নতুন করে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বরের শুরুতেই আক্রান্ত ও মৃত্যুর যে গতি দেখা যাচ্ছে, তাতে আগামী দিনগুলোতে ডেঙ্গু আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এডিস মশার বিস্তার, বর্ষা-পরবর্তী অনুকূল পরিবেশ এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় একযোগে রোগী বাড়তে থাকায় পরিস্থিতিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর কপালেও এখন স্বাভাবিকভাবেই চিন্তার ভাঁজ। কারণ শুধু রাজধানীতে নয়, দেশের বিভিন্ন বিভাগে একযোগে রোগী বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ সামলানোর পাশাপাশি ডেঙ্গুর উৎস এডিস মশা নিয়ন্ত্রণেও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আগেই কার্যকর ব্যবস্থা জোরদার করার তাগিদ বাড়ছে।

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকরভাবে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার এবং হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি বাড়ানো না গেলে সামনে রোগীর চাপ আরও বাড়তে পারে। এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন শত শত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। রাজধানীর পাশাপাশি খুলনা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডেঙ্গুর বিস্তার পরিস্থিতির ব্যাপ্তি আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

ভয়াবহ ছোবল একদিনে রেকর্ড ১,৫৫৮ ভর্তি, মৃত্যু ৪

একদিনে রেকর্ড রোগী

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৫৫৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরে এক দিনে এত বেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম। একই সময়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন রোগী ভর্তির হিসাবে সবচেয়ে এগিয়ে ঢাকা বিভাগ (মহানগরীসহ)। এ বিভাগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৫৭ জন। এরপরই রয়েছে খুলনা বিভাগ। সেখানে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ৩৩৪ জন।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ১৬৯ জন, বরিশালে ১৩৭ জন, রাজশাহীতে ১১২ জন, ময়মনসিংহে ৮৪ জন, রংপুরে ৫৬ জন এবং সিলেট বিভাগে ৯ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

অর্থাৎ রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য বিভাগেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের কাছে এ বিষয়টিই সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের। কারণ, ডেঙ্গু যখন একই সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সক্রিয় হয়ে ওঠে, তখন রোগী ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

ছয় দিনেই ২০ মৃত্যু

সেপ্টেম্বর মাস শুরু হওয়ার পর ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চলতি মাসের প্রথম ছয় দিনেই ডেঙ্গুতে ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আগস্ট মাসে মারা গিয়েছিলেন ৪৩ জন। এক মাস থেকে আরেক মাসে মৃত্যুর এই ধারাবাহিকতা স্বাস্থ্য খাতের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার ঝুঁকিপূর্ণ সময় হওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ বছর আক্রান্ত ৪২ হাজার ৫৯০

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪২ হাজার ৫৯০ জন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ১১৭ জনের। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৩৯ হাজার ৪৭৯ জন। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, ডেঙ্গু এখন আর শুধু একটি মৌসুমি রোগ হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। বছরের শুরু থেকেই আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তবে বর্ষা মৌসুমের শেষভাগে এসে সংক্রমণের গতি আরও বেড়েছে। বিশেষ করে গত ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ডসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা সামনে আসায় প্রশ্ন উঠেছে, সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে?

ঢাকায় মৃত্যুর চাপ বেশি

গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া চারজনের মধ্যে তিনজনই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার। অপর একজন ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকার বাসিন্দা। চলতি বছরও ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়। এ এলাকায় এখন পর্যন্ত ৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে। রাজধানীতে ঘনবসতি, নির্মাণাধীন ভবন, জমে থাকা পানি, বিভিন্ন স্থাপনার আশপাশে পানি জমে থাকা এবং মশার প্রজননস্থল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। এসব জায়গায় নিয়মিত অভিযান ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি নাগরিকদেরও সচেতন হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

ভয়াবহ ছোবল একদিনে রেকর্ড ১,৫৫৮ ভর্তি, মৃত্যু ৪

হাসপাতালেও বাড়ছে চাপ

রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোর ওপরও চাপ বাড়ছে। ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে অনেকেই জটিল অবস্থায় হাসপাতালে আসায় চিকিৎসকদের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সময়ে সাধারণ রোগীদের চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ।

স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু হাসপাতাল বাড়িয়ে বা শয্যা বাড়িয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। রোগীর সংখ্যা কমাতে হলে ডেঙ্গুর মূল বাহক এডিস মশার বিস্তার রোধ করতে হবে। এজন্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

এখনই কঠোর পদক্ষেপের তাগিদ

ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। বাসাবাড়ির ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত পাত্র, ফুলের টব, ড্রাম, বালতি কিংবা যেকোনো স্থানে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। তাই শুধু সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রমের ওপর নির্ভর না করে ব্যক্তি পর্যায়েও সতর্কতা বাড়াতে হবে।

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের মতে, আক্রান্তের সংখ্যা যখন এক দিনে দেড় হাজার ছাড়িয়ে গেছে, তখন পরিস্থিতিকে সতর্কতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়া প্রয়োজন। রোগী শনাক্তকরণ, দ্রুত চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, হাসপাতালের শয্যা প্রস্তুত রাখা এবং মৃত্যুঝুঁকিতে থাকা রোগীদের জন্য নিবিড় চিকিৎসার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে সামনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। গত ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড ১ হাজার ৫৫৮ জনের হাসপাতালে ভর্তি এবং চারজনের মৃত্যু সেই আশঙ্কাকেই আরও জোরালো করছে।

এক নজরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি

গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন রোগী ১,৫৫৮ জন, মৃত্যু ৪ জন। চলতি বছরে হাসপাতালে ভর্তি ৪২,৫৯০ জন এবং মোট মৃত্যু ১১৭ জন। সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৩৯,৪৭৯ জন, সেপ্টেম্বরের প্রথম ছয় দিনে মৃত্যু ২০ জন,  ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে চলতি বছরের মৃত্যু ৪২ জন।

ডেঙ্গুর এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা এখনই থামানো না গেলে সামনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। রেকর্ড রোগী ভর্তি ও ধারাবাহিক মৃত্যুর এই পরিসংখ্যান তাই শুধু একটি দৈনিক হিসাব নয়, এটি দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

ডেঙ্গুর ভয়াবহ ছোবল একদিনে রেকর্ড ১,৫৫৮ ভর্তি, মৃত্যু ৪

আপডেট সময় : ১১:২৯:০৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছয় দিনে প্রাণ গেল ২০ জনের

 চলতি বছর আক্রান্ত ৪২ হাজার ৫৯০, মৃত্যু ১১৭

পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেওয়ার শঙ্কা স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর

ডেঙ্গুর ভয়াবহ ছোবলে ফের উদ্বেগের মুখে দেশ। প্রতিদিন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা। সেই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুও। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ দৈনিক পরিসংখ্যান বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ১ হাজার ৫৫৮ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এক দিনে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির হিসাবে এটি চলতি বছরের সর্বোচ্চ সংখ্যা। একই সময়ে প্রাণ গেছে আরও চারজনের। ফলে ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ নিয়ে স্বাস্থ্য খাতে নতুন করে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বরের শুরুতেই আক্রান্ত ও মৃত্যুর যে গতি দেখা যাচ্ছে, তাতে আগামী দিনগুলোতে ডেঙ্গু আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এডিস মশার বিস্তার, বর্ষা-পরবর্তী অনুকূল পরিবেশ এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় একযোগে রোগী বাড়তে থাকায় পরিস্থিতিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর কপালেও এখন স্বাভাবিকভাবেই চিন্তার ভাঁজ। কারণ শুধু রাজধানীতে নয়, দেশের বিভিন্ন বিভাগে একযোগে রোগী বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ সামলানোর পাশাপাশি ডেঙ্গুর উৎস এডিস মশা নিয়ন্ত্রণেও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আগেই কার্যকর ব্যবস্থা জোরদার করার তাগিদ বাড়ছে।

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকরভাবে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার এবং হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি বাড়ানো না গেলে সামনে রোগীর চাপ আরও বাড়তে পারে। এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন শত শত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। রাজধানীর পাশাপাশি খুলনা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডেঙ্গুর বিস্তার পরিস্থিতির ব্যাপ্তি আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

ভয়াবহ ছোবল একদিনে রেকর্ড ১,৫৫৮ ভর্তি, মৃত্যু ৪

একদিনে রেকর্ড রোগী

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৫৫৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরে এক দিনে এত বেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম। একই সময়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন রোগী ভর্তির হিসাবে সবচেয়ে এগিয়ে ঢাকা বিভাগ (মহানগরীসহ)। এ বিভাগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৫৭ জন। এরপরই রয়েছে খুলনা বিভাগ। সেখানে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ৩৩৪ জন।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ১৬৯ জন, বরিশালে ১৩৭ জন, রাজশাহীতে ১১২ জন, ময়মনসিংহে ৮৪ জন, রংপুরে ৫৬ জন এবং সিলেট বিভাগে ৯ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

অর্থাৎ রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য বিভাগেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের কাছে এ বিষয়টিই সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের। কারণ, ডেঙ্গু যখন একই সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সক্রিয় হয়ে ওঠে, তখন রোগী ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

ছয় দিনেই ২০ মৃত্যু

সেপ্টেম্বর মাস শুরু হওয়ার পর ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চলতি মাসের প্রথম ছয় দিনেই ডেঙ্গুতে ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আগস্ট মাসে মারা গিয়েছিলেন ৪৩ জন। এক মাস থেকে আরেক মাসে মৃত্যুর এই ধারাবাহিকতা স্বাস্থ্য খাতের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার ঝুঁকিপূর্ণ সময় হওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ বছর আক্রান্ত ৪২ হাজার ৫৯০

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪২ হাজার ৫৯০ জন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ১১৭ জনের। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৩৯ হাজার ৪৭৯ জন। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, ডেঙ্গু এখন আর শুধু একটি মৌসুমি রোগ হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। বছরের শুরু থেকেই আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তবে বর্ষা মৌসুমের শেষভাগে এসে সংক্রমণের গতি আরও বেড়েছে। বিশেষ করে গত ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ডসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা সামনে আসায় প্রশ্ন উঠেছে, সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে?

ঢাকায় মৃত্যুর চাপ বেশি

গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া চারজনের মধ্যে তিনজনই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার। অপর একজন ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকার বাসিন্দা। চলতি বছরও ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়। এ এলাকায় এখন পর্যন্ত ৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে। রাজধানীতে ঘনবসতি, নির্মাণাধীন ভবন, জমে থাকা পানি, বিভিন্ন স্থাপনার আশপাশে পানি জমে থাকা এবং মশার প্রজননস্থল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। এসব জায়গায় নিয়মিত অভিযান ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি নাগরিকদেরও সচেতন হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

ভয়াবহ ছোবল একদিনে রেকর্ড ১,৫৫৮ ভর্তি, মৃত্যু ৪

হাসপাতালেও বাড়ছে চাপ

রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোর ওপরও চাপ বাড়ছে। ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে অনেকেই জটিল অবস্থায় হাসপাতালে আসায় চিকিৎসকদের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সময়ে সাধারণ রোগীদের চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ।

স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু হাসপাতাল বাড়িয়ে বা শয্যা বাড়িয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। রোগীর সংখ্যা কমাতে হলে ডেঙ্গুর মূল বাহক এডিস মশার বিস্তার রোধ করতে হবে। এজন্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

এখনই কঠোর পদক্ষেপের তাগিদ

ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। বাসাবাড়ির ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত পাত্র, ফুলের টব, ড্রাম, বালতি কিংবা যেকোনো স্থানে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। তাই শুধু সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রমের ওপর নির্ভর না করে ব্যক্তি পর্যায়েও সতর্কতা বাড়াতে হবে।

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের মতে, আক্রান্তের সংখ্যা যখন এক দিনে দেড় হাজার ছাড়িয়ে গেছে, তখন পরিস্থিতিকে সতর্কতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়া প্রয়োজন। রোগী শনাক্তকরণ, দ্রুত চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, হাসপাতালের শয্যা প্রস্তুত রাখা এবং মৃত্যুঝুঁকিতে থাকা রোগীদের জন্য নিবিড় চিকিৎসার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে সামনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। গত ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড ১ হাজার ৫৫৮ জনের হাসপাতালে ভর্তি এবং চারজনের মৃত্যু সেই আশঙ্কাকেই আরও জোরালো করছে।

এক নজরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি

গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন রোগী ১,৫৫৮ জন, মৃত্যু ৪ জন। চলতি বছরে হাসপাতালে ভর্তি ৪২,৫৯০ জন এবং মোট মৃত্যু ১১৭ জন। সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৩৯,৪৭৯ জন, সেপ্টেম্বরের প্রথম ছয় দিনে মৃত্যু ২০ জন,  ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে চলতি বছরের মৃত্যু ৪২ জন।

ডেঙ্গুর এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা এখনই থামানো না গেলে সামনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। রেকর্ড রোগী ভর্তি ও ধারাবাহিক মৃত্যুর এই পরিসংখ্যান তাই শুধু একটি দৈনিক হিসাব নয়, এটি দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা।