রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দেড় লাখ কোটি টাকা কোথায় আটকে আছে অর্থ
- আপডেট সময় : ০৬:৫৫:১০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৩২ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের দুর্বলতা আবারও ভয়াবহ আকারে সামনে এসেছে। জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর দেওয়া সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, রাষ্ট্র-মালিকানাধীন ছয়টি ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। হিসাবটি ৩০ জুন ২০২৬ ভিত্তিক।
ছয় ব্যাংক হলো, অগ্রণী ব্যাংক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল), বেসিক ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংক।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। সংসদে অর্থমন্ত্রী যে তথ্য দিয়েছেন, সেখানে মোট খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বা প্রত্যেক খেলাপির নাম প্রকাশ করা হয়নি। ফলে ‘দেড় লাখ কোটি টাকা খেলাপি-এর পেছনে মোট কতজন ব্যক্তি’ এমন নির্দিষ্ট সংখ্যা এই তথ্য থেকে বলা সম্ভব নয়।
বরং সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের পর্যালোচনা ও সংবাদ অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, এই বিপুল খেলাপি ঋণের বড় অংশ অল্পসংখ্যক বড় ব্যবসায়ী ও শিল্পগোষ্ঠীর কাছে কেন্দ্রীভূত।
ব্যাংকভিত্তিক চিত্র
৩০ জুন ২০২৬-এর হিসাবে ছয় ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে জনতা ব্যাংকের। টাকার পরিমাণ ৭৫ হাজার ৩৯৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ ছয় ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় অর্ধেক এক ব্যাংকেই।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক, যার খেলাপি ঋণ ২৯ হাজার ২৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১৯ হাজার ২৮১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা এবং সোনালী ব্যাংকের ১৫ হাজার ৪৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। অন্যদিকে বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৮ হাজার ১৩১ কোটি ৯ লাখ টাকা এবং বিডিবিএলের ৮৮৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।
এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, সমস্যাটি ছয় ব্যাংকে সমানভাবে ছড়িয়ে নেই। বিশেষ করে জনতা ব্যাংকের অবস্থা সবচেয়ে উদ্বেগজনক।
কার কাছে কত টাকা?
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২৫ সালের শেষ হিসাব অনুযায়ী এই ছয় ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছেই আটকে ছিল ৯১ হাজার ১৩৩ কোটি ২১ লাখ টাকা, যা তখনকার মোট শ্রেণিকৃত ঋণের প্রায় ৬২ শতাংশ। অর্থাৎ বিপুল পরিমাণ ঋণ হাজার হাজার ছোট ঋণগ্রহীতার মধ্যে সমানভাবে ছড়িয়ে নেই; বরং বড় একটি অংশ অল্পসংখ্যক বড় গ্রাহকের হাতে কেন্দ্রীভূত।
আরও বিস্তৃত সরকারি পর্যালোচনায় ছয় ব্যাংকের শীর্ষ ২০ জন করে মোট ১২০ জন খেলাপির কাছে ৯২ হাজার ৬২৭ কোটি টাকা পাওনা থাকার তথ্য পাওয়া যায়। ২০২৫ সালে এসব শীর্ষ খেলাপির কাছ থেকে আদায় হয়েছে মাত্র ৪৬৯ কোটি টাকা পাওনার প্রায় ০.৫ শতাংশ।
এখানেই মূল প্রশ্নটি আসে, এই বড় ঋণগ্রহীতারা কারা?
জনতা ব্যাংক: সবচেয়ে বড় সংকট
জনতা ব্যাংক এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে ব্যাংকটির শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছে পাওনা ছিল প্রায় ৫৮ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা। অথচ সারা বছরে এসব গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় হয়েছে মাত্র প্রায় ৫৬ কোটি টাকা।
প্রকাশিত বিভিন্ন ব্যাংক নথি ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জনতা ব্যাংকের বড় খেলাপিদের মধ্যে উঠে এসেছে কয়েকটি বহুল পরিচিত শিল্পগোষ্ঠীর নাম। এর মধ্যে রয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপ, এস আলম গ্রুপ, অ্যাননটেক্স গ্রুপ, ক্রিসেন্ট গ্রুপ, রতনপুর গ্রুপ, রিমেক্স ফুটওয়্যার, সিকদার গ্রুপ, জনকণ্ঠ গ্রুপ, লিথুন ফ্যাব্রিকস ও হাবিব হোটেল ইন্টারন্যাশনাল।
একটি প্রতিবেদনে জনতা ব্যাংকের শীর্ষ ১১ গ্রাহকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪২ হাজার ৮২০ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে বেক্সিমকো গ্রুপের প্রায় ২৩ হাজার কোটি, এস আলম গ্রুপের ৯ হাজার ৪০০ কোটি, ক্রিসেন্ট গ্রুপের ২ হাজার ৫০ কোটি এবং অ্যাননটেক্স গ্রুপের প্রায় ৮০০ কোটি টাকা খেলাপি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে অবশ্য একটি সতর্কতা জরুরি: এসব প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যাংকের মোট সব খেলাপির তালিকা নয়, বরং বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত শীর্ষ বা বড় খেলাপি গ্রাহকদের তালিকায় থাকা নাম। কাউকে ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি’ বা অপরাধী বলা আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়া সমীচীন নয়।

জনতা ব্যাংকের ক্ষেত্রে অ্যাননটেক্স ও ক্রিসেন্ট গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। অ্যাননটেক্স গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠানের কাছে বড় অঙ্কের ঋণ ছিল এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছিল। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনও অনুসন্ধান করেছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
ক্রিসেন্ট গ্রুপের ক্ষেত্রেও জনতা ব্যাংকের বিপুল অর্থ আটকে থাকার তথ্য বহুবার প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৬ সালের আগস্টে খেলাপি ঋণ আদায়ে ক্রিসেন্ট গ্রুপের বন্ধকি সম্পদ নিলামে তোলার উদ্যোগ নেওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ সমস্যা শুধু ঋণ দেওয়ার সময়েই শেষ হয়নি; এখন ব্যাংকগুলোর বড় চ্যালেঞ্জ হলো ঋণের বিপরীতে থাকা সম্পদ উদ্ধার, মামলা পরিচালনা এবং বাস্তবে টাকা ফেরত আনা।
অগ্রণী ব্যাংক: বড় খেলাপির ঘনত্ব
অগ্রণী ব্যাংকের ৩০ জুন ২০২৬-এর খেলাপি ঋণ ২৯ হাজার কোটি টাকার বেশি। ২০২৫ সালের শেষেও ব্যাংকটির শ্রেণিকৃত ঋণ ছিল ২৬ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা। ওই সময় শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছে ব্যাংকটির পাওনা ছিল প্রায় ১৩ হাজার ৯০৭ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে এই শীর্ষ খেলাপিদের কাছ থেকে আদায় হয়েছে মাত্র ৩১ কোটি ১৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ অগ্রণী ব্যাংকের ক্ষেত্রেও বড় গ্রাহকনির্ভর ঋণ ঝুঁকি একটি বড় সমস্যা।
রূপালী ব্যাংক: বড় গ্রাহকের ঋণেও ঝুঁকি
রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩০ জুন ২০২৬-এ ১৯ হাজার ২৮১ কোটি টাকার বেশি। ২০২৫ সালের শেষ দিকে শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছে ব্যাংকটির পাওনা ছিল ৮ হাজার ৭৭৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। তবে অন্য কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের তুলনায় রূপালী ব্যাংক আদায়ে তুলনামূলক ভালো করেছে; ২০২৫ সালে শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছ থেকে ৩৬১ কোটি ৭ লাখ টাকা আদায় করেছে।
তবু ব্যাংকটির বড় গ্রাহকদের মধ্যে ঋণের ঘনত্ব যথেষ্ট বেশি। ব্যাংকার ও বিশ্লেষকদের মতে, বড় গ্রাহকদের কয়েকটি ঋণ একসঙ্গে খেলাপি হলে ব্যাংকের মূলধন ও তারল্যের ওপর বড় চাপ পড়ে।
সোনালী ব্যাংক ও হলমার্কের দীর্ঘ ছায়া
সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩০ জুন ২০২৬-এ ১৫ হাজার ৪৮ কোটি টাকার বেশি। তবে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের আলোচনায় এখনও হলমার্ক গ্রুপ একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। সোনালী ব্যাংকের শীর্ষ খেলাপিদের মধ্যে হলমার্ক গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে।
শীর্ষ ২০ খেলাপির তালিকায় হলমার্ক-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসহ রূপসী গ্রুপ, মডার্ন স্টিল, তাইপেই বাংলা ফেব্রিকস, ফেয়ার ট্রেড ফেব্রিকস, রহমান গ্রুপ, অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, মুন্নু ফেব্রিকস, রতনপুর স্টিল, মাগুরা পেপার মিলস, ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে।
তবে সোনালী ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনায় খেলাপি ঋণ আদায়ের কিছু অগ্রগতিও হয়েছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকটি শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছ থেকে ৭৪৫ কোটি টাকা আদায় করেছে, যার মধ্যে হলমার্ক গ্রুপ থেকেও উল্লেখযোগ্য অর্থ এসেছে।
বেসিক ব্যাংক: পুরোনো কেলেঙ্কারির ভার
বেসিক ব্যাংকের বর্তমান খেলাপি ঋণ ৮ হাজার ১৩১ কোটি টাকার বেশি। ব্যাংকটির সংকটের সঙ্গে অতীতের বড় ঋণ অনিয়মের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর আমলে ব্যাপক ঋণ অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত ও মামলার পর্যায়ে গেছে। ২০২৫ সালের সরকারি পর্যালোচনায় বেসিক ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছে পাওনা ছিল প্রায় ২ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। অথচ ২০২৫ সালে সেখান থেকে আদায় হয়েছে মাত্র ৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা।
ছয় ব্যাংকের মধ্যে বিডিবিএলের খেলাপি ঋণ সবচেয়ে কম ৮৮৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে ব্যাংকটি সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত। ২০২৫ সালের শেষ দিকে শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছেই প্রায় ৪৮৭ কোটি টাকা আটকে ছিল। ২০২৫ সালে এসব গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় হয়েছে মাত্র ৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা।
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি সতর্কতা প্রয়োজন। ৩০ জুন ২০২৬-এর সংসদীয় উত্তরে মোট খেলাপি গ্রাহকের সংখ্যা দেওয়া হয়নি। তাই ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা মানেই নির্দিষ্ট সংখ্যক ব্যক্তি এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
বরং ২০২৬ সালের সরকারি পর্যালোচনায় ছয় ব্যাংকের শীর্ষ ২০ জন করে মোট ১২০ জন বড় খেলাপির কাছে ৯২ হাজার ৬২৭ কোটি টাকা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যদিকে পৃথক অনুসন্ধানে ২০ জন শীর্ষ খেলাপির কাছেই ৯১ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা পাওনা থাকার তথ্য এসেছে। দুই হিসাবের পার্থক্য মূলত সময় ও তথ্যসংগ্রহের পদ্ধতির কারণে।
অর্থাৎ নিশ্চিতভাবে বলা যায়, অন্তত শীর্ষ ১২০ বড় খেলাপির একটি গোষ্ঠী রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের বিপুল খেলাপি ঋণের বড় অংশের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু তাঁদের বাইরে আরও বহু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাই ১২০ জনকে মোট খেলাপির সংখ্যা বলা যাবে না।
এই অর্থের দায় শেষ পর্যন্ত কার?
ব্যাংকের টাকা মূলত আমানতকারীদের অর্থ। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ব্যাংকের বড় ক্ষতি হলে মূলধন পুনর্গঠনে শেষ পর্যন্ত সরকারের অর্থ ব্যবহার করার প্রয়োজন হতে পারে। ২০২৫ সালের শেষে জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংক বড় মূলধন ঘাটতিতে ছিল বলে বিভিন্ন পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।
ফলে খেলাপি ঋণ কেবল ব্যাংকের হিসাবের একটি সংখ্যা নয়। এর প্রভাব পড়ে সাধারণ আমানতকারী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, প্রকৃত শিল্পোদ্যোক্তা এবং শেষ পর্যন্ত করদাতার ওপর।
মূল সংকট কোথায়?
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে অন্তত পাঁচটি সমস্যা স্পষ্ট হয়,
- ঋণ দেওয়ার সময় যথাযথ যাচাই-বাছাই না করা;
- অল্পসংখ্যক বড় গ্রাহকের হাতে বিপুল ঋণ কেন্দ্রীভূত করা;
- রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের চাপের অভিযোগ;
- খেলাপি হওয়ার পর দ্রুত আইনি ও সম্পদ-উদ্ধার ব্যবস্থা নিতে না পারা;
- দীর্ঘসূত্রতা, মামলা ও দুর্বল সুশাসনের কারণে টাকা ফেরত না আসা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন করে ঋণ পুনঃতফসিল করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রকৃত ব্যবসায়িক কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাকে পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ ফেরত না দেওয়া গ্রাহকদের ক্ষেত্রে কঠোর আইনি ব্যবস্থা, সম্পদ জব্দ ও নিলাম এবং প্রকৃত মালিকানা অনুসন্ধান জরুরি।
উপসংহার
৩০ জুন ২০২৬-এর হিসাবে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা খেলাপি ঋণ বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি বড় সতর্কসংকেত। এর মধ্যে শুধু জনতা ব্যাংকের খেলাপিই ৭৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিপুল অর্থ অল্পসংখ্যক বড় গ্রাহকের কাছে কেন্দ্রীভূত।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী বেক্সিমকো, এস আলম, অ্যাননটেক্স, ক্রিসেন্ট, রতনপুর, রিমেক্স ফুটওয়্যার, সিকদার, জনকণ্ঠ, লিথুন ফ্যাব্রিকস, হলমার্ক-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসহ বেশ কিছু বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বড় খেলাপি হিসেবে বিভিন্ন সময়ে চিহ্নিত হয়েছে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে আদালতের চূড়ান্ত রায় ছাড়া ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি’, ‘ঋণ আত্মসাৎকারী’ বা অপরাধী হিসেবে অভিহিত করা যাবে না।
সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এখন একটি ব্যাংকভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ, হালনাগাদ ও যাচাইকৃত শীর্ষ খেলাপি তালিকা প্রকাশ করা, যেখানে থাকবে ঋণগ্রহীতার নাম, প্রতিষ্ঠানের নাম, মোট ঋণ, খেলাপির পরিমাণ, ঋণ নেওয়ার বছর, জামানত, পুনঃতফসিলের ইতিহাস, আদালতের মামলা এবং এ পর্যন্ত আদায়ের পরিমাণ। এমন স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ হলেই বোঝা যাবে, দেড় লাখ কোটি টাকার এই বিশাল খেলাপি ঋণের প্রকৃত দায় কার, কতটা ব্যবসায়িক ব্যর্থতা এবং কতটা অনিয়ম বা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির ফল।

















