এলএনজি টার্মিনাল সচলে আরও পাঁচ দিন দেশজুড়ে গ্যাস সংকট তীব্র, বাসা-বাড়ি, শিল্প ও যানবাহনে চরম ভোগান্তি
- আপডেট সময় : ১০:৫২:১২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬ ১৯ বার পড়া হয়েছে
মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনাল কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর দেশের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। টার্মিনালটি মেরামত করে পুনরায় চালু হতে আরও অন্তত চার থেকে পাঁচ দিন সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ফলে রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের সংকট আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে বাসা-বাড়িতে রান্না কার্যত অচল হয়ে পড়েছে, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, আর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ যানজট ও ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে।
রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের স্থাপনাপ্রধান ও উপমহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) প্রকৌশলী মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন জানিয়েছেন, যুক্তরাজ্য, রোমানিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে আসা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে স্থানীয় কারিগরি দল গত ২১ জুলাই থেকে বন্ধ হয়ে থাকা এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান টার্মিনালটি মেরামতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রাথমিক মূল্যায়নে কাজ শেষ করতে আরও চার থেকে পাঁচ দিন সময় লাগতে পারে। তবে নিরাপত্তা ও কারিগরি কারণে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত যন্ত্রাংশ বা ত্রুটির বিস্তারিত প্রকাশ করেননি।
টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায়। স্বাভাবিক সময়ে মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৯৫ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। একটি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এর ফলে মাত্র চার দিনের ব্যবধানে দেশের ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির মাধ্যমে দৈনিক গ্যাস বিতরণ প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট কমে গেছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০ জুলাই যেখানে মোট গ্যাস বিতরণ হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৫৮৭ মিলিয়ন ঘনফুট, সেখানে ২৪ জুলাই তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১৩৫ মিলিয়ন ঘনফুটে। অর্থাৎ চার দিনের ব্যবধানে গ্যাস সরবরাহ কমেছে প্রায় ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ। একই সময়ে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদনে বড় কোনো পরিবর্তন না থাকায় সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পুরো সংকটের মূল কারণ এলএনজি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির আওতাধীন এলাকায়। ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে চার দিনের মধ্যে তিতাসের দৈনিক গ্যাস বিতরণ কমেছে প্রায় ২৭ কোটি ঘনফুট। বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ কমেছে প্রায় ২২ কোটি ৭৪ লাখ ঘনফুট এবং আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প, ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ, সিএনজি ও অন্যান্য নন-বাল্ক গ্রাহকের জন্য সরবরাহ কমেছে প্রায় ১৯ কোটি ৭৬ লাখ ঘনফুট।
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র এখন রাজধানীর বাসা-বাড়িতে। ঢাকার গ্রিন রোড, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, উত্তরা, বাড্ডা, রামপুরা, খিলগাঁও, বাসাবোসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাস থাকে না। কোথাও কোথাও গভীর রাতে অল্প সময়ের জন্য গ্যাস এলেও চাপ এতটাই কম থাকে যে রান্না করা সম্ভব হয় না। অনেক পরিবারকে বাধ্য হয়ে ইন্ডাকশন কিংবা বৈদ্যুতিক চুলায় রান্না করতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন বিদ্যুতের বিল বাড়ছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত লোডের কারণে অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটও দেখা দিচ্ছে।
কর্মজীবী পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে। অনেক অভিভাবক সকালে সন্তানদের জন্য টিফিন প্রস্তুত করতে পারছেন না। আগের রাতে খাবার রান্না করে সংরক্ষণ করতে হচ্ছে, আবার অনেকেই বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনে আনছেন। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এই অতিরিক্ত ব্যয় নতুন করে আর্থিক চাপ তৈরি করেছে।
শুধু আবাসিক গ্রাহক নয়, শিল্পকারখানাগুলোও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। গ্যাসচালিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে উৎপাদন কমে যাচ্ছে, কোথাও কোথাও বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্পেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতেও। রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের চাপ কম থাকায় স্বাভাবিকভাবে জ্বালানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। ফলে সিএনজিচালিত যানবাহনকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এতে যাত্রী ও চালক উভয়কেই চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের এলএনজি আমদানির জন্য এখনো কার্যকর বিকল্প অবকাঠামো না থাকায় দুটি ভাসমান টার্মিনালের একটিতে সামান্য ত্রুটি দেখা দিলেই পুরো জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ে। অতীতেও একাধিকবার একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তারা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাকে নিরবচ্ছিন্ন রাখতে বিকল্প এলএনজি গ্রহণ সুবিধা, পাইপলাইন আধুনিকায়ন এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
এদিকে পেট্রোবাংলা গ্যাস সরবরাহে সাময়িক বিঘ্ন ঘটায় গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, মেরামতকাজ দ্রুত শেষ করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। তবে টার্মিনালটি কবে পুরোপুরি সচল হয়ে জাতীয় গ্রিডে আবার পূর্ণমাত্রায় গ্যাস সরবরাহ শুরু করবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো সময় জানানো হয়নি। ফলে আগামী কয়েকদিনও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাসা-বাড়ি, শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও যানবাহন খাতে গ্যাস সংকট এবং জনদুর্ভোগ অব্যাহত থাকার আশঙ্কাই বেশি।



















