৫ জেলায় বন্যার আভাস: মৌলভীবাজারে আকস্মিক বন্যা, হাজারো মানুষ পানিবন্দি
- আপডেট সময় : ০৬:৪১:৫৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ২৬ বার পড়া হয়েছে
‘মৌলভীবাজারে কুলাউড়ার গোপালীছড়ায় প্রায় ৫০ মিটার বাঁধ ভেঙে সদর ইউনিয়নের বাগাজুরা, হাসনপুর ও শ্রীপুরসহ অন্তত ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে, এসব এলাকার হাজারো মানুষ পানিবন্দি। প্রস্তুত ১১৫টি আশ্রয়কেন্দ্র’
টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাঁচ জেলায় বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলায় আগামী কয়েকদিনের মধ্যে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।
ইতোমধ্যে মৌলভীবাজারের বিভিন্ন এলাকায় আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়ে হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

বুধবার (২৯ এপ্রিল) বিকেলে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী মোস্তফা কামাল জিহানের সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নেত্রকোনার ভুগাই-কংস নদী জারিয়াজাগুইল পয়েন্টে, সোমেশ্বরী নদী কমলাকান্দা পয়েন্টে, মগরা নদী নেত্রকোনা পয়েন্টে এবং মৌলভীবাজারের মনু নদী বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এছাড়া সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি সমতল আগামী তিনদিন বাড়তে পারে। তৃতীয় দিনে কুশিয়ারা নদীর পানি প্রাক-মৌসুমি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে এবং সুরমা নদী সতর্কসীমার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। ফলে হাওরাঞ্চলের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার মনু, খোয়াই ও জুড়ি নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খোয়াই ও জুড়ি নদী বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে মৌলভীবাজারের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি এবং হবিগঞ্জে নতুন করে বন্যা সৃষ্টি হতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে কিশোরগঞ্জের নিকলীতে ১৬১ মিলিমিটার। এছাড়া ভোলায় ১৫১ মিলিমিটার এবং ফেনীতে ১৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। ভারী বর্ষণের কারণে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।
এদিকে মৌলভীবাজার জেলায় ইতোমধ্যে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কুলাউড়া, কমলগঞ্জ ও সদর উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে হাজারো পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন ১১৫টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কুলাউড়া উপজেলার গোপালীছড়ায় প্রায় ৫০ মিটার বাঁধ ভেঙে বাগাজুরা, হাসনপুর ও শ্রীপুরসহ অন্তত ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে কয়েকশ পরিবার পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আখাইলকুড়া ইউনিয়নে মনু নদীর তীব্র ভাঙনে একটি কবরস্থান, একটি মক্তব ও ছয়টি বসতঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। কমলগঞ্জ উপজেলার পতনঊষার, মুন্সীবাজার ও শমশেরনগর ইউনিয়নে লাঘাটা নদীর পানি উপচে পড়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। রাজনগর উপজেলার উদনা নদী সংলগ্ন পূর্ব নন্দীউড়া ও ভুজবল গ্রামেও পানি ঢুকে রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৭টি উপজেলায় ১০০ মেট্রিক টন চাল ও ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে মনু, ধলাই, কুশিয়ারা ও জুড়ি নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। জুড়ি নদীর পানি ইতোমধ্যে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। তবে দুপুরের পর থেকে পানি কিছুটা কমতে শুরু করেছে এবং বৃষ্টি কমলে দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
পানিবন্দি স্থানীয় বাসিন্দা কামাল আহমেদ জানান, রাত থেকে হঠাৎ পানি বাড়তে শুরু করে সকালে বাড়িঘর ও রাস্তাঘাট ডুবে যায়। এতে তারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।

আকস্মিক বন্যায় কমলগঞ্জের পানিবন্দি মানুষ: ছবি সংগ্রহ
কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে এবং পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে। মৌলভীবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাজিব হোসেন জানান, নদীভাঙনে কয়েকটি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রশাসন পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন ওয়ালিদ বলেন, জেলার নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি পেলেও পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে। অন্যদিকে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাদু মিয়া জানিয়েছেন, দুর্গত মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণ ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সার্বিকভাবে, টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢল অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েকদিনে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন।



















