ঢাকা ০৮:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
এখনও ডিজেলে লোকসান লিটারে ৭০ টাকা : রিজভী জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় নিত্যপণ্যে তেমন প্রভাব পড়বে না: বাণিজ্যমন্ত্রী প্রাণিসম্পদ খাতকে এগিয়ে নিতে বিজ্ঞানীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ: মৎস্যমন্ত্রী বাণিজ্য ভারসাম্য রক্ষায় ভারতকে পণ্য আমদানি বাড়ানোর তাগিদ জাতিসংঘে জিয়া পরিবার বাংলাদেশের কণ্ঠস্বরের চার দশকের পথচলা জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি   কিলোমিটার প্রতি বাসভাড়া বাড়ল ১৭ পয়সা দ্বিতীয় স্ত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ, এমপি গাজী নজরুল ৪ দিনের রিমান্ডে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ট্রাক ভাড়া বেড়েছে ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ৮১তম জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কের পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

কবি নজরুলের পাশে চিরনিদ্রায় জুলাইযোদ্ধা শহীদ ওসমান হাদি

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৪:৩১:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ ৪০০ বার পড়া হয়েছে

নজরুলের পাশে চিরনিদ্রায় জুলাইযোদ্ধা শহীদ ওসমান হাদি

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

আমিনুল হক ভূইয়া

শনিবার ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ যেন আর শুধু একটি সড়ক ছিল না—তা রূপ নিয়েছিল এক বিশাল জনসমুদ্রে, যেখানে কান্না, শোক, গর্ব আর অঙ্গীকার একাকার হয়ে গিয়েছিল। মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে যিনি ছিলেন অগ্রভাগের যোদ্ধা, সেই জুলাইযোদ্ধা ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদিকে শেষ বিদায় জানাতে ঢাকায় জড়ো হয়েছিলেন লাখো মানুষ।

স্মরণকালের বৃহত্তম লোকসমাবেশের মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সম্পন্ন হয় তার নামাজে জানাজা। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় শহীদ ওসমান হাদিকে। এদিন রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক পালন করা হয়; সারাদেশে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়।

মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে আপসহীন ওসমান হাদি এখন আর শুধু একটি নাম নন, তিনি হয়ে উঠেছেন এক প্রজন্মের চেতনা। সেই চেতনাকে বুকে ধারণ করেই সকাল থেকে দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মানুষ ঢাকামুখী হতে থাকেন। বাস, ট্রাক, ট্রেন কিংবা পায়ে হেঁটে-যেভাবেই হোক, শেষবারের মতো প্রিয় মানুষটিকে দেখতে ছুটে আসেন তারা। দুপুরের আগেই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।

লাখো মানুষের ভালোবাসা আর অশ্রুসিক্ত বিদায় শহীদ শরিফ ওসমান হাদি। ছবি সংগ্রহ
ওসমান হাদির জানাজায় মানব ঢল

মাথায়, গায়ে কিংবা কব্জিতে বাঁধা লাল-সবুজ পতাকা যেন জানান দিচ্ছিল-এই শোক ব্যক্তিগত নয়, জাতীয়। তরুণদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কেউ চোখের জল লুকোতে পারছেন না, কেউ আবার স্লোগানে কণ্ঠ মিলিয়ে প্রতিজ্ঞা করছেন, ‘আমরা সবাই হাদি হব, যুগে যুগে লড়ে যাব’, ‘হাদি ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’। শোক আর প্রতিবাদের এই যুগলবন্দি পুরো এলাকা জুড়ে এক ভিন্ন আবহ তৈরি করে।

লাখো মানুষের আগমনে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ছিল নজিরবিহীন। সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও পুলিশের সদস্যরা পুরো এলাকা ঘিরে রাখেন। খামারবাড়ি গোলচত্বর দিয়ে ধাপে ধাপে মানুষকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে প্রবেশ করানো হয়। সন্দেহভাজনদের তল্লাশি করা হলেও বিপুল জনসমাগমের কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হিমশিম খেতে দেখা যায়। তবুও জনতার মধ্যেই ছিল এক ধরনের শৃঙ্খলা—এ যেন প্রিয় নেতার প্রতি নীরব শ্রদ্ধা।

দুপুর আড়াইটায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শুরু হয় নামাজে জানাজা। জানাজায় অংশ নেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, জুলাইযোদ্ধা ও সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ। সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর আবেগঘন বক্তব্যে ড. ইউনূস বলেন, প্রিয় হাদি, আমরা আজ তোমাকে বিদায় জানাতে আসিনি। তুমি যে আদর্শ রেখে গেছ, সেই আদর্শ বাস্তবায়নের ওয়াদা করতেই আজ এই জনসমুদ্র। তিনি বলেন, বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, ততদিন হাদি প্রতিটি বাংলাদেশির বুকের মধ্যে বেঁচে থাকবেন।

লাখো মানুষের ভালোবাসা আর অশ্রুসিক্ত বিদায় শহীদ শরিফ ওসমান হাদি। ছবি সংগ্রহ
লাখো মানুষের ভালোবাসা আর অশ্রুসিক্ত বিদায় শহীদ শরিফ ওসমান হাদি। ছবি সংগ্রহ

হাদির বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিক জানাজা পড়ান। জানাজা শেষে লাশবাহী গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে শোকমিছিল নিয়ে জনতা রওনা হয় শাহবাগের দিকে। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ নীরবে হাত তুলে, কেউ চোখের জলে, কেউ কণ্ঠ রুদ্ধ করে শেষ শ্রদ্ধা জানান।

অবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধি প্রাঙ্গণে শহীদ ওসমান হাদিকে দাফন করা হয়। বিদ্রোহী কবির পাশে আরেক বিদ্রোহীর চিরনিদ্রা যেন ইতিহাসের এক প্রতীকী মিলন। যে কবি শিখিয়েছিলেন মাথা নত না করার সাহস, তার পাশেই শুয়ে পড়লেন সেই মানুষটি, যিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেই সাহস ধারণ করেছিলেন।

ওসমান হাদি নেই-কিন্তু তার কণ্ঠ থেমে যায়নি। লাখো মানুষের সেই শোকসমুদ্রের ভেতর দিয়েই জন্ম নিয়েছে নতুন এক অঙ্গীকার। এই দেশ, এই মানুষ আর কোনোদিন অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবে না। শহীদ হাদি হয়ে থাকবেন সেই অঙ্গীকারের চিরন্তন নাম।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :