ঢাকা ১১:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
এখনও ডিজেলে লোকসান লিটারে ৭০ টাকা : রিজভী জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় নিত্যপণ্যে তেমন প্রভাব পড়বে না: বাণিজ্যমন্ত্রী প্রাণিসম্পদ খাতকে এগিয়ে নিতে বিজ্ঞানীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ: মৎস্যমন্ত্রী বাণিজ্য ভারসাম্য রক্ষায় ভারতকে পণ্য আমদানি বাড়ানোর তাগিদ জাতিসংঘে জিয়া পরিবার বাংলাদেশের কণ্ঠস্বরের চার দশকের পথচলা জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি   কিলোমিটার প্রতি বাসভাড়া বাড়ল ১৭ পয়সা দ্বিতীয় স্ত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ, এমপি গাজী নজরুল ৪ দিনের রিমান্ডে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ট্রাক ভাড়া বেড়েছে ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ৮১তম জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কের পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

রক্তাক্ত জুলাই, উত্তাল আগস্ট যেভাবে এলো ৫ আগস্ট

বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ০৭:৩৯:০৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬ ৯৯ বার পড়া হয়েছে

রক্তাক্ত জুলাই, উত্তাল আগস্ট যেভাবে এলো ৫ আগস্ট

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের নাম। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই রূপ নেয় সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে। রাজপথে গুলি, মৃত্যু, আহত, দৃষ্টিশক্তি হারানো, গ্রেপ্তার, ইন্টারনেট বন্ধ ও সংঘাতের মধ্য দিয়ে আন্দোলন শেষ পর্যন্ত এক দফা দাবিতে পৌঁছায়। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার মধ্য দিয়ে আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে।

দুই বছর পরও জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহতের সংখ্যা নিয়ে সরকারি ও আন্তর্জাতিক হিসাবের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তবে একটি বিষয়ে বড় ধরনের ঐকমত্য রয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে নজিরবিহীন প্রাণহানি ঘটে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বলপ্রয়োগ ছিল সেই প্রাণহানির অন্যতম প্রধান কারণ।

যেভাবে শুরু আন্দোলন

জুলাই আন্দোলনের সূত্রপাত সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ থেকে। ২০১৮ সালের আন্দোলনের পর সরকার কোটা বাতিল করেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্টের এক রায়ের পর মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান-নাতিদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা পুনর্বহালের পথ তৈরি হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে ক্ষোভ দেখা দেয়। জুলাইয়ের শুরুতে আন্দোলন আরও সংগঠিত হয়। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ‘বাংলা ব্লকেড’সহ নানা কর্মসূচি পালন করেন। ১০ জুলাই আপিল বিভাগ হাইকোর্টের সিদ্ধান্তের ওপর স্থিতাবস্থা দিলেও আন্দোলন থামেনি।

১৫-১৬ জুলাই মোড় ঘোরে

আন্দোলনের সবচেয়ে বড় মোড় আসে ১৫-১৬ জুলাই। শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকার’ মন্তব্যকে ঘিরে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক জনমত তৈরি হয়। এরপর একের পর এক মৃত্যু ও সংঘর্ষ আন্দোলনকে আর কেবল কোটা সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ রাখেনি। ১৭ থেকে ১৯ জুলাই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ভয়াবহ আকার নেয়। গুলি, রাবার বুলেট, ছররা ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। বন্ধ হয়ে যায় ইন্টারনেট। জারি হয় কারফিউ। একপর্যায়ে আন্দোলন রূপ নেয় সরকার পতনের এক দফা দাবিতে।

কেন এত প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ?

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, আন্দোলনের আড়ালে সহিংসতা, সরকারি স্থাপনায় হামলা, অগ্নিসংযোগ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বলপ্রয়োগ করা হয়। তবে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, তৎকালীন সরকার, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সহিংস উপাদানগুলো আন্দোলন দমনে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত ছিল। জাতিসংঘের হিসাবে ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন। নিহতদের বড় অংশ নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে মারা যান। প্রতিবেদনে হাজার হাজার আহত ও ১১ হাজারের বেশি আটকের তথ্যও উঠে আসে। মানবতাবিরোধী অপরাধের আশঙ্কার কথাও বলা হয়।

নিহত ও আহত

নিহতের সংখ্যা নিয়ে সরকারি ও আন্তর্জাতিক হিসাব এক নয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সরকার প্রথম দফায় ৮৩৪ জনকে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের শহীদ হিসেবে গেজেটভুক্ত করে। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৬৪ এবং আহত প্রায় ১৪ হাজার। ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত সরকারি তত্ত্বাবধানে ১৫,৩৯৩ জন আহতকে চিকিৎসা দেওয়ার তথ্য প্রকাশ করা হয়। জুলাই আন্দোলনের আরেক ভয়াবহ ক্ষত দৃষ্টিশক্তি হারানো। স্বাস্থ্য উপদেষ্টার দেওয়া তথ্যে ৪০০-এর বেশি মানুষের এক বা দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারানোর কথা বলা হয়েছিল। পরে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের এক চিকিৎসক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জানান, গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসা নেওয়া ৮৬৪ রোগীর মধ্যে ৪৯৩ জন এক চোখ এবং ১১ জন দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি স্থায়ীভাবে হারিয়েছেন।

জুলাই আন্দোলনের দুই বছর

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। পরদিন শুরু হয় অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া। পরে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। ফলে ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, সরকারি ও আন্তর্জাতিক হিসাবেও পার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু শত শত পরিবারের শূন্যতা, হাজার হাজার আহত মানুষের শরীরের ক্ষত এবং দৃষ্টিশক্তি হারানো তরুণদের জীবন বলে দেয়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট শুধু একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস নয়, এটি রাষ্ট্র, সমাজ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য গভীর আত্মজিজ্ঞাসার সময়। দুই বছর পর তাই প্রশ্ন শুধু কতজন মারা গেলেন নয়—কেন এত মানুষ মারা গেলেন, প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের জবাবদিহি কোথায় এবং ভবিষ্যতে এমন রক্তপাত ঠেকাতে রাষ্ট্র কী শিক্ষা নিয়েছে, ইতিহাসের কাছে সেই উত্তরও দিতে হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :