বাজেট: ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির পথে বাংলাদেশের নতুন যাত্রা
- আপডেট সময় : ১০:০১:৫৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬ ২৫ বার পড়া হয়েছে
দেশকে আগামী দিনে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রায়’ শীর্ষক এই বাজেট বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হয়।
নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অর্থনীতিকে আরও উৎপাদনমুখী ও বিকেন্দ্রীভূত করার লক্ষ্যও নির্ধারণ করেছে সরকার।
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর সঙ্গে বৈদেশিক অনুদান হিসেবে আরও ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা যুক্ত হলে মোট আয় দাঁড়াবে ৭ লাখ ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। তবে বিপুল ব্যয়ের কারণে আগামী অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি হবে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে কর আদায়কে প্রধান ভরসা হিসেবে দেখছে সরকার। মোট ৬ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা কর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংগ্রহ করবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, আর এনবিআর-বহির্ভূত উৎস থেকে আসবে ২৫ হাজার কোটি টাকা। কর-বহির্ভূত রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৬৬ হাজার কোটি টাকা।
ব্যয়ের খাতে সবচেয়ে বড় অংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে পরিচালন ব্যয়ের জন্য। এ খাতে ব্যয় হবে ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে আবর্তক ব্যয় ৫ লাখ ৫১ হাজার ৮৭ কোটি টাকা। তবে বাজেটের সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি করেছে ঋণের সুদ পরিশোধ। শুধু সুদ বাবদ ব্যয় হবে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে দেশীয় ঋণের সুদ ১ লাখ ৫ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
অন্যদিকে দেশের অবকাঠামো ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গতি আনতে উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৩ লাখ কোটি টাকা। পাশাপাশি বিশেষ প্রকল্প, বিভিন্ন উন্নয়ন স্কিম এবং খাদ্যের বিনিময়ে কর্মসূচির জন্যও পৃথক বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকার বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। বৈদেশিক উৎস থেকে নিট ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা অর্থায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য নতুন করে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হবে, যদিও একই সময়ে ৪৬ হাজার কোটি টাকা পরিশোধও করতে হবে।
দেশীয় উৎস থেকেও নিট ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংক-বহির্ভূত উৎস থেকে আসবে ১৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে জাতীয় সঞ্চয়পত্র থেকেই সংগ্রহের লক্ষ্য ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
সরকারের প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে দেশের জিডিপির আকার দাঁড়াবে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন, রাজস্ব আহরণে গতি বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, উৎপাদনশীল খাতে উৎসাহ এবং উন্নয়ন ব্যয়ের কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে আবারও উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবিত বাজেট একদিকে যেমন মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তি ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশকে বৃহৎ অর্থনীতির কাতারে নিয়ে যাওয়ার একটি রূপরেখাও তুলে ধরেছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, উন্নয়ন প্রকল্পের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন এবং বাজেটের ঘোষণাগুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়া।



















