ঢাকা ০৮:০৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪০২, দুর্ঘটনার শীর্ষে মোটরসাইকেল মতিঝিলে প্রকাশ্যে ব্যবসায়ীকে গুলি করে ১৭ হাজার ডলার ছিনতাই বাজেট অধিবেশন ৯ জুলাই পর্যন্ত চলবে, চারদিন দুই বেলা বসবে সংসদ সন্তানহারা পরিবারকে ৮০ লাখ টাকা: প্রশাসনিক তৎপরতায় দায় স্বীকারে বাধ্য আদ-দ্বীন রামিসা হত্যা মামলার রায়, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান বজ্রপাত দেশের বিভিন্ন জেলায় ১১ জনের প্রাণহানি এটি বাংলাদেশের ও গণতন্ত্রের জয় সভাপতি নির্বাচিত হয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই, জাতিসংঘের সভাপতি পদে জয়ী হয়ে আশ্বস্ত করলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে বক্তব্যের জেরে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতার বিরুদ্ধে মামলা আদ-দ্বীনে  ৬ নবজাতকের মৃত্যু: হাসপাতালের অবহেলার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি

প্রকৃতিতে শীতের পদধ্বনি, বাঙালির সংস্কৃতি ও অনুভূতির স্নিগ্ধ ঋতু

আমিনুল হক ভূইয়া, ঢাকা
  • আপডেট সময় : ০৪:১৪:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩ নভেম্বর ২০২৫ ২৯২ বার পড়া হয়েছে

প্রকৃতিতে শীতের পদধ্বনি বাঙালির সংস্কৃতি ও অনুভূতির স্নিগ্ধ ঋতু

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

প্রকৃতির বুকে এখন শীতের আগমনী পদধ্বনি। হেমন্তের দিনগুলো ক্রমেই ফুরিয়ে আসছে। কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর ‘পেঁচা’ কবিতায় যেমন লিখেছিলেন-প্রকৃতিতে শীতের পদধ্বনি, প্রথম ফসল গেছে ঘরে; হেমন্তের মাঠে মাঠে ঝরে শুধু শিশিরের জল।

এই কয়েকটি পঙ্ক্তিতে তিনি তুলে ধরেছেন হেমন্তের বিদায়ী রূপ ও শীতের আগমনবার্তা নিয়ে।  পাকা ধান ঘরে তোলার পর মাঠে পড়ে থাকে শিশিরভেজা ঘাস, আর অঘ্রাণের নদীর শীতল হাওয়া জানান দেয় নতুন ঋতুর আগমন।

হেমন্তের সোনালি দিনগুলোতে ভোরবেলা শিশিরের ফোঁটা ঝকঝক করে ঘাসের ডগায়, দুপুরে নরম রোদে শরীর জুড়িয়ে যায়। শরতের শুভ্র মেঘ সরিয়ে হেমন্ত আসে হালকা কুয়াশামাখা মুখে। নতুন ধানের ঘ্রাণে ভরে ওঠে গ্রামবাংলা। তখনই বুঝে নিতে হয়-শীত আসছে।

শহরের কংক্রিটের দালানে শীত পৌঁছাতে কিছুটা দেরি হলেও গ্রামীণ জনপদে হেমন্তের শেষেই শীতের আমেজ নেমে আসে। দিন যত গড়ায়, রোদের তেজ কমে আসে, বিকেল নামতেই হিমেল হাওয়া জানান দেয় আগাম শীতের খবর।

সম্প্রতি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বারমাসিয়া গ্রামে শীত সকালে দেখা গেছে প্রকৃতি ও শিশিরের লুকোচুরি খেলা। রাজশাহীতেও মিলেছে মৌসুমের প্রথম কুয়াশা। ভোর থেকে ঘন কুয়াশায় ঢাকা ছিল গোটা শহর, যানবাহন চলেছে হেডলাইট জ্বালিয়ে।

আবহাওয়া অফিস জানায়, রাজশাহীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা গত দিনের তুলনায় প্রায় দুই ডিগ্রি কম। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, মেঘ সরে যাওয়ার কারণে কুয়াশা পড়ছে, আগামী দিনগুলোতে তাপমাত্রা আরও নামবে।

প্রকৃতিতে শীতের পদধ্বনি, বাঙালির সংস্কৃতি ও অনুভূতির স্নিগ্ধ ঋতু
প্রকৃতিতে শীতের পদধ্বনি

বাংলার ছয় ঋতুর চতুর্থ ঋতু হেমন্ত, যা কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাস জুড়ে থাকে। হেমন্তের শেষে আসে শীত, তাই একে বলা হয় শীতের পূর্বাভাস। এই সময় গ্রামবাংলায় শুরু হয় নতুন ধান কাটার উৎসব। কৃষকের মুখে হাসি, ঘরে নতুন ফসলের গন্ধ-সব মিলে সৃষ্টি হয় এক উল্লাসমুখর আবহ।

এই ফসল ঘরে তোলার পরই পালিত হয় নবান্ন উৎসব, যা বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকজ উৎসব। নতুন চালের পিঠা, পায়েস, ক্ষীরসহ নানা সুস্বাদু খাবার তৈরি হয় এবং আত্মীয়-স্বজন, পড়শিদের ঘরে ঘরে বিতরণ করা হয়। সঙ্গে চলে বাউল গান, পালাগান, লোকগীতি ও নাচগান।

শীতের এই আগমনী বার্তা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে গ্রামে। ভোরে কুয়াশার ধোঁয়াটে পর্দা ভেদ করে যখন সূর্যের আলো মৃদু হয়ে নামে, তখন শিশিরবিন্দু ঝলমল করে মুক্তার মতো। রোদের তেজ কমে যায়, মিষ্টি রোদে পিঠ পেতে বসার সে এক অন্যরকম অনুভূতি। সন্ধ্যা নামতেই হিমেল হাওয়া আর কুয়াশা মিলেমিশে চরাচর ঢেকে ফেলে সাদা চাদরে।

প্রকৃতির এই রূপান্তরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে যায় মানুষের জীবনও। মাঠে চলে ধান কাটা, ঘরে চলে খেজুরের রস সংগ্রহের প্রস্তুতি, লেপ-কাঁথা নামানোর তোড়জোড়। এ সময় গন্ধরাজ, শিউলি, কামিনী, জুঁই, মল্লিকার মিষ্টি সুবাসে ভরে ওঠে প্রকৃতি।

হেমন্তের প্রকৃতি মানেই সোনালি ধানের মাঠ, ফসলের ঘ্রাণ, কুয়াশার পর্দা আর উৎসবের আমেজ। এই ঋতুতে মানুষের মুখে হাসি, প্রকৃতির মুখে শান্তি। শহরে হয়তো শীতের উষ্ণতা একটু দেরিতে আসে, কিন্তু গ্রামের প্রতিটি পাতায়, ঘাসে, পাখির গানে আর মানুষের হৃদয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ঋতুর এই মৃদু পরিবর্তন।

শীত তাই শুধু প্রকৃতির পালাবদল নয়, এটি বাঙালির সংস্কৃতি, উৎসব আর অনুভূতির এক স্নিগ্ধ কবিতা, যা হেমন্তের সোনালি আলোয় শুরু হয়ে মিশে যায় শীতের শুভ্র কুয়াশায়।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

প্রকৃতিতে শীতের পদধ্বনি, বাঙালির সংস্কৃতি ও অনুভূতির স্নিগ্ধ ঋতু

আপডেট সময় : ০৪:১৪:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩ নভেম্বর ২০২৫

প্রকৃতির বুকে এখন শীতের আগমনী পদধ্বনি। হেমন্তের দিনগুলো ক্রমেই ফুরিয়ে আসছে। কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর ‘পেঁচা’ কবিতায় যেমন লিখেছিলেন-প্রকৃতিতে শীতের পদধ্বনি, প্রথম ফসল গেছে ঘরে; হেমন্তের মাঠে মাঠে ঝরে শুধু শিশিরের জল।

এই কয়েকটি পঙ্ক্তিতে তিনি তুলে ধরেছেন হেমন্তের বিদায়ী রূপ ও শীতের আগমনবার্তা নিয়ে।  পাকা ধান ঘরে তোলার পর মাঠে পড়ে থাকে শিশিরভেজা ঘাস, আর অঘ্রাণের নদীর শীতল হাওয়া জানান দেয় নতুন ঋতুর আগমন।

হেমন্তের সোনালি দিনগুলোতে ভোরবেলা শিশিরের ফোঁটা ঝকঝক করে ঘাসের ডগায়, দুপুরে নরম রোদে শরীর জুড়িয়ে যায়। শরতের শুভ্র মেঘ সরিয়ে হেমন্ত আসে হালকা কুয়াশামাখা মুখে। নতুন ধানের ঘ্রাণে ভরে ওঠে গ্রামবাংলা। তখনই বুঝে নিতে হয়-শীত আসছে।

শহরের কংক্রিটের দালানে শীত পৌঁছাতে কিছুটা দেরি হলেও গ্রামীণ জনপদে হেমন্তের শেষেই শীতের আমেজ নেমে আসে। দিন যত গড়ায়, রোদের তেজ কমে আসে, বিকেল নামতেই হিমেল হাওয়া জানান দেয় আগাম শীতের খবর।

সম্প্রতি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বারমাসিয়া গ্রামে শীত সকালে দেখা গেছে প্রকৃতি ও শিশিরের লুকোচুরি খেলা। রাজশাহীতেও মিলেছে মৌসুমের প্রথম কুয়াশা। ভোর থেকে ঘন কুয়াশায় ঢাকা ছিল গোটা শহর, যানবাহন চলেছে হেডলাইট জ্বালিয়ে।

আবহাওয়া অফিস জানায়, রাজশাহীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা গত দিনের তুলনায় প্রায় দুই ডিগ্রি কম। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, মেঘ সরে যাওয়ার কারণে কুয়াশা পড়ছে, আগামী দিনগুলোতে তাপমাত্রা আরও নামবে।

প্রকৃতিতে শীতের পদধ্বনি, বাঙালির সংস্কৃতি ও অনুভূতির স্নিগ্ধ ঋতু
প্রকৃতিতে শীতের পদধ্বনি

বাংলার ছয় ঋতুর চতুর্থ ঋতু হেমন্ত, যা কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাস জুড়ে থাকে। হেমন্তের শেষে আসে শীত, তাই একে বলা হয় শীতের পূর্বাভাস। এই সময় গ্রামবাংলায় শুরু হয় নতুন ধান কাটার উৎসব। কৃষকের মুখে হাসি, ঘরে নতুন ফসলের গন্ধ-সব মিলে সৃষ্টি হয় এক উল্লাসমুখর আবহ।

এই ফসল ঘরে তোলার পরই পালিত হয় নবান্ন উৎসব, যা বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকজ উৎসব। নতুন চালের পিঠা, পায়েস, ক্ষীরসহ নানা সুস্বাদু খাবার তৈরি হয় এবং আত্মীয়-স্বজন, পড়শিদের ঘরে ঘরে বিতরণ করা হয়। সঙ্গে চলে বাউল গান, পালাগান, লোকগীতি ও নাচগান।

শীতের এই আগমনী বার্তা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে গ্রামে। ভোরে কুয়াশার ধোঁয়াটে পর্দা ভেদ করে যখন সূর্যের আলো মৃদু হয়ে নামে, তখন শিশিরবিন্দু ঝলমল করে মুক্তার মতো। রোদের তেজ কমে যায়, মিষ্টি রোদে পিঠ পেতে বসার সে এক অন্যরকম অনুভূতি। সন্ধ্যা নামতেই হিমেল হাওয়া আর কুয়াশা মিলেমিশে চরাচর ঢেকে ফেলে সাদা চাদরে।

প্রকৃতির এই রূপান্তরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে যায় মানুষের জীবনও। মাঠে চলে ধান কাটা, ঘরে চলে খেজুরের রস সংগ্রহের প্রস্তুতি, লেপ-কাঁথা নামানোর তোড়জোড়। এ সময় গন্ধরাজ, শিউলি, কামিনী, জুঁই, মল্লিকার মিষ্টি সুবাসে ভরে ওঠে প্রকৃতি।

হেমন্তের প্রকৃতি মানেই সোনালি ধানের মাঠ, ফসলের ঘ্রাণ, কুয়াশার পর্দা আর উৎসবের আমেজ। এই ঋতুতে মানুষের মুখে হাসি, প্রকৃতির মুখে শান্তি। শহরে হয়তো শীতের উষ্ণতা একটু দেরিতে আসে, কিন্তু গ্রামের প্রতিটি পাতায়, ঘাসে, পাখির গানে আর মানুষের হৃদয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ঋতুর এই মৃদু পরিবর্তন।

শীত তাই শুধু প্রকৃতির পালাবদল নয়, এটি বাঙালির সংস্কৃতি, উৎসব আর অনুভূতির এক স্নিগ্ধ কবিতা, যা হেমন্তের সোনালি আলোয় শুরু হয়ে মিশে যায় শীতের শুভ্র কুয়াশায়।