ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪০২, দুর্ঘটনার শীর্ষে মোটরসাইকেল
- আপডেট সময় : ১০:০২:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬ ২৬ বার পড়া হয়েছে
ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশজুড়ে সংঘটিত সড়ক, রেল ও নৌপথের দুর্ঘটনায় মোট ৪৩৮ জন নিহত এবং ১,৩৪০ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু সড়ক দুর্ঘটনাতেই নিহত হয়েছেন ৪০২ জন এবং আহত হয়েছেন ১,২৯৪ জন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
রোববার ঢাকার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি-তে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী প্রতিবেদনটি তুলে ধরেন।
১৫ দিনে ৩৯৪টি সড়ক দুর্ঘটনা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঈদযাত্রা শুরুর দিন ২১ মে থেকে কর্মস্থলে ফেরার শেষ দিন ৪ জুন পর্যন্ত ১৫ দিনে দেশে ৩৯৪টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনায় ৪০২ জন নিহত এবং ১,২৯৪ জন আহত হন।
একই সময়ে:
৩১টি রেল দুর্ঘটনায় নিহত হন ২৩ জন, আহত ৩০ জন। ১৭টি নৌ দুর্ঘটনায় নিহত হন ১৩ জন, আহত ১৬ জন। সব মিলিয়ে সড়ক, রেল ও নৌপথে ৪৪২টি দুর্ঘটনায় ৪৩৮ জন নিহত এবং ১,৩৪০ জন আহত হয়েছেন।
গত বছরের ঈদুল আজহার তুলনায় এবার সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে ৩.৯৫ শতাংশ, প্রাণহানি বেড়েছে ৩.০৭ শতাংশ, আহতের সংখ্যা বেড়েছে ৯.৪৭ শতাংশ।
দুর্ঘটনার শীর্ষে মোটরসাইকেল
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বরাবরের মতো এবারও দুর্ঘটনার তালিকায় শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল।
ঈদকালীন সময়ে ১৫৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়, ১৫৯ জন নিহত এবং ১৮০ জন আহত হয়েছেন। মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৮.৮৩ শতাংশই মোটরসাইকেল-সম্পর্কিত দুর্ঘটনা।
দুর্ঘটনায় জড়িত যানবাহন
দুর্ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের সম্পৃক্ততার হার ছিল:
মোটরসাইকেল: ২৮.৯০%, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান: ২১.০% , বাস: ১৯.৫৬% , অবৈধ ব্যাটারিচালিত যান: ১২.৩৪% , কার ও মাইক্রোবাস: ৭.৮১%. নছিমন-করিমন: ৬.৫৬% এবং সিএনজিচালিত অটোরিকশা ৬.৪০%।
মোট দুর্ঘটনার মধ্যে ৪৪% মুখোমুখি সংঘর্ষ, ২৯.১৮% চাপা বা ধাক্কাজনিত, ১৭.২৫% নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদ বা খালে পড়ে যাওয়া, ৩.৫৫% ট্রেন-যানবাহনের সংঘর্ষ, ৫.৫৮% অন্যান্য বা অজ্ঞাত কারণে সংঘটিত হয়েছে।
দুর্ঘটনার অবস্থান বিশ্লেষণে দেখা গেছে: জাতীয় মহাসড়কে: ৫০.৫০%, আঞ্চলিক মহাসড়কে: ৩০.৭১%, ফিডার রোডে: ১৪.৪৬% , ঢাকা মহানগরীতে: ২.৫৩% , চট্টগ্রাম মহানগরীতে: ০.২৫%, রেলক্রসিংয়ে: ১.৫২%।
ঈদযাত্রার দুর্ঘটনাগুলোতে নিহতদের মধ্যে ছিলেন, ৮০ জন চালক, ৮৯ জন পরিবহন শ্রমিক, ৫৯ জন পথচারী, ৬৪ জন নারী, ৪৫ জন শিশু, ৬৬ জন শিক্ষার্থী, ৫ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ৩ জন শিক্ষক, ১ জন চিকিৎসক এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কয়েকজন নেতাকর্মী।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে দুর্ঘটনার কয়েকটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে:
- জাতীয় মহাসড়কে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার অবাধ চলাচল।
- রোড সাইন, রোড মার্কিং ও সড়কবাতির অভাব।
- সড়কে মিডিয়ান বা ডিভাইডার না থাকা।
- সড়কের নির্মাণগত ত্রুটি ও বৃষ্টির কারণে সৃষ্টি হওয়া গর্ত।
- অদক্ষ চালক ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন।
- ট্রাফিক আইন অমান্যের প্রবণতা।
- উল্টোপথে যান চলাচল।
- অতিরিক্ত যাত্রী ও পণ্য পরিবহন।
- চাঁদাবাজি ও পরিবহন খাতে অনিয়ম।
- চালকদের দীর্ঘ সময় বিরামহীন ও বিশ্রামহীনভাবে গাড়ি চালানো।
সংগঠনের মতে, চালক সংকটের কারণে প্রায় ৮০ শতাংশ যানবাহন একক চালকের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় পরিচালিত হয়েছে, যা দুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
করণীয় ও সুপারিশ
সংবাদ সম্মেলনে মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ঈদকেন্দ্রিক সাময়িক উদ্যোগ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
সমিতির সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- ঈদযাত্রার জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন।
- আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু।
- চালকদের উন্নত প্রশিক্ষণ ও মানসম্মত লাইসেন্স ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
- গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে সার্ভিস লেন ও নিরাপত্তা করিডোর নির্মাণ।
- সড়কে রোড সাইন, রোড মার্কিং ও পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা বৃদ্ধি।
- সড়ক নিরাপত্তা অডিট নিয়মিত পরিচালনা।
- ফিটনেস সনদ প্রদানের পদ্ধতি আধুনিকায়ন।
- মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন অপসারণ।
- বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (BRTA)-এর সক্ষমতা বৃদ্ধি।
- পরিবহন খাতে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও অনিয়ম দূর করা।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন ড. এ ওয়াই এম একরামুল হক, অর্পনা রায় দাশ, মাহমুদুল হাসান রাসেল, আলমগীর কবির লিটু, মনজুর হোসেন ইসা, সুবাস চন্দ্র দাশ এবং মনজুর হোসেন।














