ঢলনের চাপে আমচাষি, কেজিভিত্তিক বেচাকেনার সিদ্ধান্তেও মিলছে না সুফল
- আপডেট সময় : ০৬:৫২:৩৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬ ৩০ বার পড়া হয়েছে
৫৪ কেজিতে মণ, বাড়তি আমের দাম মেলে না
প্রতি মৌসুমে ৫০০ কোটির বেশি টাকার আম যাচ্ছে বিনা মূল্যে
প্রশাসনের ঢলন বাতিলের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি এখনো
রাজশাহী অঞ্চলের আম দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও ক্রমেই জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। প্রতিবছর আমকে ঘিরে এই অঞ্চলের অর্থনীতি সম্প্রসারিত হলেও দীর্ঘদিনের একটি প্রথা, ‘ঢলন’, আমচাষিদের ন্যায্য লাভ থেকে বঞ্চিত করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আম কেনাবেচা কেজিভিত্তিক হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন মোকাম ও পাইকারি বাজারে এখনো পুরোনো ‘ঢলন’ প্রথাই বহাল রয়েছে। ফলে কৃষকদের নির্ধারিত ৪০ কেজি (এক মণ) আমের পরিবর্তে ৫২ থেকে ৫৪ কেজি পর্যন্ত আম দিতে হচ্ছে, অথচ মূল্য পরিশোধ করা হচ্ছে মাত্র ৪০ কেজির হিসাবেই। এতে উৎপাদিত আমের একটি বড় অংশ কার্যত বিনামূল্যে চলে যাচ্ছে ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের কাছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর জেলায় প্রায় ১২ লাখ ৫৫ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ফলনও ভালো হয়েছে। তবে উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও বাজার ব্যবস্থার নানা অসঙ্গতির কারণে চাষিরা কাঙ্ক্ষিত লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

আমচাষিদের অভিযোগ, বাগান পরিচর্যা, শ্রমিক, সার ও কীটনাশকের ব্যয় প্রতিবছর বাড়লেও বিক্রির সময় অতিরিক্ত ওজন দিতে বাধ্য হওয়ায় তাদের মুনাফা কমে যাচ্ছে। অনেক ব্যবসায়ী অতিরিক্ত ওজন ছাড়া আম কিনতে অনাগ্রহী বলেও তারা অভিযোগ করেন।
স্থানীয়ভাবে ‘ঢলন’ বলতে নির্ধারিত ওজনের চেয়ে বেশি আম দেওয়াকে বোঝায়। একসময় পরিবহন, ঝরে যাওয়া কিংবা পচনজনিত ক্ষতি সমন্বয়ের জন্য প্রতি মণে এক থেকে দুই কেজি অতিরিক্ত আম দেওয়ার প্রচলন ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এই প্রথা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে এখন অনেক বাজারে ৪০ কেজির দামে ৫২ থেকে ৫৪ কেজি পর্যন্ত আম নেওয়া হচ্ছে।
এর ফলে কৃষকদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এক মণ আমের দাম ২ হাজার টাকা হলে কাগজে-কলমে প্রতি কেজির মূল্য দাঁড়ায় ৫০ টাকা। কিন্তু একই দামে যদি কৃষককে ৫৪ কেজি আম দিতে হয়, তাহলে প্রকৃত মূল্য নেমে আসে প্রায় ৩৭ টাকায়। অর্থাৎ উৎপাদিত পণ্যের প্রায় ২৬ শতাংশ মূল্যের সমপরিমাণ আয় থেকে তিনি বঞ্চিত হন।

অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের দাবি, পরিবহন, বাছাই, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের সময় কিছু পণ্য নষ্ট হয় এবং ওজন কমে যায়। দীর্ঘদিন ধরে সেই ক্ষতি সমন্বয়ের জন্যই অতিরিক্ত ওজন নেওয়ার এই প্রথা চালু রয়েছে।
এ বিরোধ নিরসনে গত বছরের জুনে প্রশাসনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ঢলন প্রথা বাতিল করে কেজিভিত্তিক আম কেনাবেচার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে আড়তদারদের কমিশনও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। তবে কৃষকদের অভিযোগ, সিদ্ধান্তটি এখনো মাঠপর্যায়ে কার্যকর হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কৃষকরা ন্যায্যমূল্য না পেলে কৃষি খাতের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। তাই প্রতিটি বাজারে ইলেকট্রনিক ওজনযন্ত্র ব্যবহার, ডিজিটাল রসিদ চালু, নিয়মিত বাজার তদারকি এবং কৃষক সংগঠনকে শক্তিশালী করার ওপর তারা গুরুত্বারোপ করেছেন। প্রশাসনও কেজিভিত্তিক আম বেচাকেনা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনার আশ্বাস দিয়েছে।



















