ঢাকা ১০:৫৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ট্রিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন যাত্রা: আজ বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাব: বাহরাইনে পঞ্চম মার্কিন নৌবহর ও জর্ডানে বিমানঘাঁটিতে হামলা দাবি ইরানের   চা-বাগানের সবুজে চা-বাগানের সবুজে ধরা দিল দুর্লভ চিতাবিড়াল ঢলনের চাপে আমচাষি, কেজিভিত্তিক বেচাকেনার সিদ্ধান্তেও মিলছে না সুফল বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ: শিগগিরই জারি হচ্ছে নবম পে-স্কেলের গেজেট পুশইন বিতর্ক, কূটনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে বাংলাদেশ প্রথম বাজেটেই জনগণের আস্থা জয়ের বার্তা নতুন সরকারের ১০০ কোটির প্রথম নায়িকা, বিয়ের পরই রুপালি পর্দা থেকে বিদায়, এখন কোথায় আসিন? টসে হেরে ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ, ১৫ বছর পর দেশের মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ শুরু ইসরায়েলকে সতর্ক করলেন ট্রাম্প: ইরানে হামলা হলে পাশে থাকবে না ওয়াশিংটন

ট্রিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন যাত্রা: আজ বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট

আমিনুল হক ভূইয়া
  • আপডেট সময় : ০৯:০৫:১৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬ ২৭ বার পড়া হয়েছে

সংগ্রহ

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির স্বপ্ন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় পরীক্ষা

দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে আজ জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এ বাজেট দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নতুন সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশলের প্রতিফলন ঘটবে এবারের বাজেটে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, “অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ: ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ” প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে প্রণীত এই বাজেটের মূল লক্ষ্য হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা।

বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতার মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে দেশের অর্থনীতি। এমন প্রেক্ষাপটে সরকার আগামী অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রবৃদ্ধির এ লক্ষ্য অর্জন করতে হলে উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং রপ্তানি কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য গতি আনতে হবে। একই সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ চেইন উন্নয়ন এবং রাজস্ব প্রশাসনে সংস্কার ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।

প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরা হয়েছে প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে ৬ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। বাকি অর্থ সংগ্রহ করা হবে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা থেকে।

সরকারের হিসাব অনুযায়ী, বাজেট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪ শতাংশ। এই ঘাটতি মোকাবিলায় ব্যাংকিং খাত থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণ গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

এবারের বাজেটের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মানবসম্পদ উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। অবকাঠামো খাতের তুলনায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বেশি বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সরকারের ধারণা, দীর্ঘমেয়াদে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।

ট্রিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন যাত্রা: আজ বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট
ট্রিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন যাত্রা: আজ বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট

স্বাস্থ্য খাতে ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে তরুণ জনগোষ্ঠীকে আধুনিক শ্রমবাজারের উপযোগী করে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। যুবসমাজকে মাদক, সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ থেকে দূরে রেখে উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হতে পারে।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিও এবারের বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। সরকারের ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচি হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং ‘কৃষক কার্ড’ চালুর পাশাপাশি বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা ও বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য হ্রাসে এসব কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

দেশীয় শিল্প ও উদ্যোক্তা উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের জন্য ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, এসব উদ্যোগ নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি, শিল্পায়ন সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

ব্যবসা পরিচালনা সহজ করতে লাইসেন্স, অনুমোদন ও কর ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি সমন্বিত ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর মাধ্যমে ব্যবসাসংক্রান্ত অধিকাংশ সেবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা হবে। পাশাপাশি কর রিটার্ন অনলাইনে দাখিল, সরাসরি ব্যাংক হিসাবে কর ফেরত এবং কর-সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও চালুর উদ্যোগ রয়েছে।

উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আগামী অর্থবছরের জন্য প্রায় ৩ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন করা হয়েছে। সম্প্রতি একনেক সভায় ৩৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্পসহ মোট নয়টি মেগা প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পকে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নতুন সরকারের প্রথম বাজেট বক্তৃতায় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার সমালোচনাও স্থান পেতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের খসড়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালের জুনে বেড়ে ৮ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ ঋণও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সুদ পরিশোধের ব্যয় বর্তমানে জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় চাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নীতিনির্ধারকদের মতে, ডি-রেগুলেশন, অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ, সৃজনশীল অর্থনীতি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের সমন্বিত কৌশল বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশকে আগামী দশকে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, কেবল উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না; বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কার্যকর পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট কতটা সফল হবে। ফলে আজ ঘোষিত হতে যাওয়া বাজেট শুধু একটি আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন গতিপথে এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত রূপরেখা হিসেবেই বিবেচিত হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

ট্রিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন যাত্রা: আজ বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট

আপডেট সময় : ০৯:০৫:১৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬

ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির স্বপ্ন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় পরীক্ষা

দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে আজ জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এ বাজেট দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নতুন সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশলের প্রতিফলন ঘটবে এবারের বাজেটে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, “অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ: ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ” প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে প্রণীত এই বাজেটের মূল লক্ষ্য হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা।

বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতার মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে দেশের অর্থনীতি। এমন প্রেক্ষাপটে সরকার আগামী অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রবৃদ্ধির এ লক্ষ্য অর্জন করতে হলে উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং রপ্তানি কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য গতি আনতে হবে। একই সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ চেইন উন্নয়ন এবং রাজস্ব প্রশাসনে সংস্কার ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।

প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরা হয়েছে প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে ৬ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। বাকি অর্থ সংগ্রহ করা হবে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা থেকে।

সরকারের হিসাব অনুযায়ী, বাজেট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪ শতাংশ। এই ঘাটতি মোকাবিলায় ব্যাংকিং খাত থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণ গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

এবারের বাজেটের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মানবসম্পদ উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। অবকাঠামো খাতের তুলনায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বেশি বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সরকারের ধারণা, দীর্ঘমেয়াদে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।

ট্রিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন যাত্রা: আজ বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট
ট্রিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন যাত্রা: আজ বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট

স্বাস্থ্য খাতে ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে তরুণ জনগোষ্ঠীকে আধুনিক শ্রমবাজারের উপযোগী করে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। যুবসমাজকে মাদক, সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ থেকে দূরে রেখে উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হতে পারে।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিও এবারের বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। সরকারের ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচি হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং ‘কৃষক কার্ড’ চালুর পাশাপাশি বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা ও বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য হ্রাসে এসব কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

দেশীয় শিল্প ও উদ্যোক্তা উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের জন্য ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, এসব উদ্যোগ নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি, শিল্পায়ন সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

ব্যবসা পরিচালনা সহজ করতে লাইসেন্স, অনুমোদন ও কর ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি সমন্বিত ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর মাধ্যমে ব্যবসাসংক্রান্ত অধিকাংশ সেবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা হবে। পাশাপাশি কর রিটার্ন অনলাইনে দাখিল, সরাসরি ব্যাংক হিসাবে কর ফেরত এবং কর-সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও চালুর উদ্যোগ রয়েছে।

উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আগামী অর্থবছরের জন্য প্রায় ৩ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন করা হয়েছে। সম্প্রতি একনেক সভায় ৩৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্পসহ মোট নয়টি মেগা প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পকে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নতুন সরকারের প্রথম বাজেট বক্তৃতায় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার সমালোচনাও স্থান পেতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের খসড়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালের জুনে বেড়ে ৮ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ ঋণও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সুদ পরিশোধের ব্যয় বর্তমানে জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় চাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নীতিনির্ধারকদের মতে, ডি-রেগুলেশন, অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ, সৃজনশীল অর্থনীতি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের সমন্বিত কৌশল বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশকে আগামী দশকে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, কেবল উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না; বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কার্যকর পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট কতটা সফল হবে। ফলে আজ ঘোষিত হতে যাওয়া বাজেট শুধু একটি আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন গতিপথে এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত রূপরেখা হিসেবেই বিবেচিত হবে।