আদ-দ্বীন হাসপাতালে ৬ নবজাতকের মৃত্যু: অবহেলা, শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ নাকি অন্য কিছু প্রশ্নের মুখে কর্তৃপক্ষ
- আপডেট সময় : ০৮:৩৬:৩১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৭ মে ২০২৬ ৩৪ বার পড়া হয়েছে
ঈদের আগের রাত। যে রাতে একটি পরিবারে নতুন শিশুর আগমনে আনন্দ, স্বপ্ন আর ভবিষ্যতের আলো ছড়িয়ে পড়ার কথা ছিল, কোরবানির সেই রাতই রাজধানী ঢাকার আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশন পরিচালিত আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল–এর পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে পরিণত হয় এক বিভীষিকাময় ঘটনায়।
একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যু শুধু কয়েকটি পরিবারকেই শোকস্তব্ধ করেনি, নাড়িয়ে দিয়েছে পুরো দেশকে। মাতৃত্বের আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে কান্না, হতাশা ও অসহনীয় বেদনায়।
স্বজনদের অভিযোগ, সন্তান জন্মের পর তারা ভেবেছিলেন নতুন জীবনের শুরু হবে আনন্দে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই শিশুরাই নিথর হয়ে পড়ে। অনেক মা এখনো হাসপাতালের বিছানায়, কিন্তু তাদের বুক খালি।
একজন মা যে সন্তানের প্রথম কান্না শুনে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুখ অনুভব করেন, সেই মায়ের কাছ থেকেই কেড়ে নেওয়া হয়েছে তার সমস্ত স্বপ্ন। ঈদের আনন্দের বদলে হাসপাতালের করিডোরজুড়ে ছিল আহাজারি আর অসহায় মানুষের কান্না।

ঘটনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গভীর শোক প্রকাশ করলেও, অভিভাবকদের প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা। ডা. নাহিদ ইয়াসমিন বলেন, যে বাচ্চাগুলো মারা গেছে, তাদের বাবা-মার কষ্ট আমরা ফিরিয়ে দিতে পারব না।
একজন মা হিসেবে তিনি এই বেদনার গভীরতা অনুভব করেন বলেও জানান। তবে কী কারণে একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হলো, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর জানান, ওয়ার্ডের পরিবেশ ছিল সাফোকেটিভ বা শ্বাসরুদ্ধকর।
সেখানে এসি বন্ধ হলে বিকল্প ভেন্টিলেশনের কোনো ব্যবস্থা ছিল না বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এই বক্তব্যের পর হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, শিশুগুলো অসুস্থ হয়ে পড়ার পর যথাসময়ে চিকিৎসক বা নার্সদের তৎপরতা দেখা যায়নি। অনেককে সময়মতো জানানো হয়নি বলেও অভিযোগ ওঠে।

কেউ কেউ দাবি করেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলাই শিশুদের মৃত্যুর জন্য দায়ী। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, সবকিছু এত দ্রুত ঘটেছে যে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সুযোগই পাওয়া যায়নি।
এই ঘটনার সবচেয়ে নির্মম দিক হলো, যেসব পরিবার নতুন অতিথিকে ঘিরে ঈদের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তারা এখন সন্তানের লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। একটি নবজাতকের মৃত্যু শুধু একটি প্রাণের অবসান নয়; এটি একটি পরিবারের স্বপ্ন, আশা এবং ভবিষ্যতের মৃত্যু।
একজন মা নয় মাস সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেন অসীম কষ্ট সহ্য করে। সেই সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখানোর পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হারানোর বেদনা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
১৯৯৭ সাল থেকে পরিচালিত এই হাসপাতালে এত বড় ঘটনা আগে ঘটেনি বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এই মৃত্যুগুলো দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার নানা দুর্বলতা, অব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহিতার অভাবকে সামনে নিয়ে এসেছে।

একটি হাসপাতাল শুধু চিকিৎসার জায়গা নয়; এটি মানুষের শেষ আশ্রয়। সেখানে যদি নিরাপত্তা ও ন্যূনতম মানবিক সেবা নিশ্চিত না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের আস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেই প্রশ্ন এখন সবার মুখে।
ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। ফরেনসিক টিম, স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা কারণ অনুসন্ধানে কাজ করছেন। কিন্তু তদন্তের ফল যাই হোক না কেন, যে ছয়টি প্রাণ চলে গেছে, তাদের আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
এই মৃত্যু যেন আর কোনো মায়ের বুক খালি না করে, আর কোনো পরিবারকে এমন অসহনীয় শোকের মুখোমুখি না করে, এটাই এখন সবার প্রত্যাশা।



















