যে ভবনে ছিল ক্ষমতার দাপট সেখানেই জুলাইয়ের স্মৃতি জাদুঘর
- আপডেট সময় : ০২:৫৫:৪৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬ ২৪ বার পড়া হয়েছে
৬ আগস্ট সবার জন্য খুলছে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর, প্রবেশে লাগবে অনলাইন বুকিং
একসময় যে ভবন ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অন্যতম প্রতীক, যেখানে বসে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো, সেই গণভবনই এখন বহন করবে এক ভিন্ন ইতিহাস। ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে এটি পরিণত হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ধারণ করা এক জাদুঘরে। দেয়াল, কক্ষ, প্রাঙ্গণ সবকিছুই যেন এখন একটি সময়ের সাক্ষী। সেই ইতিহাস সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরতেই আগামী ৬ আগস্ট থেকে সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হচ্ছে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’।
জুলাই-আগস্টের আন্দোলন, মানুষের ক্ষোভ, প্রতিবাদ, আত্মত্যাগ ও গণঅভ্যুত্থানের নানা স্মৃতি সংরক্ষণ করে সাবেক সরকারি বাসভবন গণভবনকে এই জাদুঘরে রূপ দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের আন্দোলনের স্মৃতি, আলোকচিত্র, ভিডিও, দলিলপত্র এবং বিভিন্ন নিদর্শন সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে স্থানটি এখন হয়ে উঠছে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন।
আগামী ৫ আগস্ট জাদুঘরটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে। পরদিন ৬ আগস্ট থেকে নির্ধারিত নিয়ম মেনে সাধারণ দর্শনার্থীরা সেখানে প্রবেশ করতে পারবেন। তবে ইচ্ছা থাকলেই সরাসরি গিয়ে প্রবেশের সুযোগ থাকছে না। দর্শনার্থীদের আগে অনলাইনে বুকিং করতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ের স্লট অনুযায়ী সীমিতসংখ্যক দর্শনার্থী জাদুঘরে প্রবেশের সুযোগ পাবেন।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি, তথ্য ও সম্প্রচার এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে জাদুঘরটির উদ্বোধন করবেন। উদ্বোধনের পর সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ সময় বরাদ্দ থাকবে। তারা জাদুঘর ঘুরে দেখে প্রতিবেদন তৈরি করতে পারবেন। একই দিনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্যদের জন্য জাদুঘরটি বিশেষভাবে সংরক্ষিত থাকবে। এরপর ৬ আগস্ট থেকে সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য এটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
প্রাপ্তবয়স্ক দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ টাকা এবং শিশুদের জন্য ২৫ টাকা। কর্তৃপক্ষ বলছে, একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রবেশ করলে জাদুঘরের পরিবেশ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এ কারণে সময়ভিত্তিক প্রবেশের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অনলাইনে বুকিং করে নির্ধারিত স্লট অনুযায়ী দর্শনার্থীদের সেখানে প্রবেশ করতে হবে।
তবে এই জাদুঘরের গুরুত্ব শুধু কয়েকটি কক্ষ, ছবি কিংবা পুরোনো সামগ্রী দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি উত্তাল সময়ের স্মৃতি। যে গণভবন দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতীক হয়ে ছিল, সেই স্থানেই এখন সংরক্ষিত হবে ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের রাস্তায় নেমে আসার ইতিহাস। গণভবনকে জাদুঘরে রূপান্তরের বিষয়টি তাই নিছক স্থাপনা পরিবর্তন নয়; এটি একটি সময়ের প্রতীকী রূপান্তর হিসেবেও সামনে এসেছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজপথে নেমেছিলেন শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী, পেশাজীবীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। আন্দোলনের সেই দিনগুলোর নানা আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, সংবাদপত্রের প্রতিবেদন, ব্যানার, প্ল্যাকার্ড, পোশাক ও বিভিন্ন স্মারক জাদুঘরে স্থান পেয়েছে বলে এর আগে জানানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ডা. জাহেদ উর রহমান আরও জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ঘিরে নতুন দেশাত্মবোধক গান তৈরির লক্ষ্যে আয়োজিত প্রতিযোগিতায় শতাধিক গান জমা পড়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে ২০টি গান পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়েছে। ৫ আগস্ট রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত কনসার্টে বিজয়ীদের পুরস্কৃত করা হবে। পাশাপাশি নির্বাচিত প্রথম তিনটি গান মঞ্চে পরিবেশন করা হবে।
সব মিলিয়ে ৬ আগস্ট থেকে খুলতে যাওয়া জুলাই স্মৃতি জাদুঘর হয়ে উঠতে পারে সাম্প্রতিক বাংলাদেশের ইতিহাস জানার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান। একসময় যেখানে ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আবহ, এখন সেখানে মানুষ দেখতে পাবেন সেই সময়ের স্মৃতি, যার পরিণতিতে বদলে গেছে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা। ইতিহাসের পাতা শুধু বইয়ে নয়, একটি ভবনের দেয়াল, কক্ষ আর সংরক্ষিত নিদর্শনের মধ্যেও যে বেঁচে থাকতে পারে, জুলাই স্মৃতি জাদুঘর যেন তারই এক জীবন্ত উদাহরণ।










