কাগজে নদীর সংখ্যা বাড়ছে নদী রক্ষাই এখন সবচেয়ে বড় সংকট
- আপডেট সময় : ১২:৫৯:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৯ বার পড়া হয়েছে
নাম আছে, নদী নেই সরকারি তালিকা আর বাস্তবতার ফারাক বাড়ছেই
কাগজে নদী বাড়ানোর পাশাপাশি বাস্তবের নদী বাঁচানোই এখন সবচেয়ে জরুরি
নদীমাতৃক বাংলাদেশের অস্তিত্ব, অর্থনীতি ও পরিবেশের সঙ্গে নদী ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অথচ দেশের নদ-নদী রক্ষা এখন অন্যতম বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। সরকারি তালিকায় নদীর সংখ্যা বাড়লেও বাস্তবে বহু নদী দখল, দূষণ, নাব্যতা সংকট ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের চাপে অস্তিত্ব হারাচ্ছে। নদীর জায়গা দখল করে গড়ে উঠছে বসতি, বাজার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও নানা অবকাঠামো। কোথাও আবার বর্জ্য ও শিল্পবর্জ্য ফেলে নদীর পানি ও জীববৈচিত্র্য বিপন্ন করা হচ্ছে।
এই সংকটের পেছনে দায়িত্বহীন নাগরিক আচরণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অনেক মানুষ নদী ও খালকে আবর্জনা ফেলার সহজ জায়গা হিসেবে ব্যবহার করছেন। প্লাস্টিক, পলিথিন, গৃহস্থালি বর্জ্য ও নির্মাণসামগ্রী নদীতে ফেলার প্রবণতা শহরাঞ্চলে বিশেষভাবে দৃশ্যমান। একই সঙ্গে নদীর তীর দখল ও দূষণের সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অর্থনৈতিক স্বার্থে নদীর জমি দখল কিংবা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করার প্রবণতা নদীর অস্তিত্বকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
প্রশাসনিক অবহেলা ও দুর্বল তদারকিও সংকটকে জটিল করছে। কোথাও উচ্ছেদ অভিযান হলেও পরে পুনর্দখলের ঘটনা ঘটে। আবার নদী দূষণের উৎস শনাক্ত হওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়। ফলে আইন ও নীতিমালা থাকলেও বাস্তব প্রয়োগে ঘাটতি থেকে যায়।
বিশেষ করে সিটি করপোরেশন ও নগর এলাকার বাসিন্দাদের একটি অংশের পরিবেশ-সচেতনতার ঘাটতি নদীর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। নদীকে শুধু পানি প্রবাহের পথ হিসেবে না দেখে জীবন্ত পরিবেশব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।

নদী রক্ষায় তাই শুধু সরকারি অভিযান যথেষ্ট নয়। নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণ, দখল-দূষণের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ, প্রভাবশালী দখলদারদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ এবং প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি সবকিছুর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নদী বাঁচানো মানে শুধু একটি জলধারা রক্ষা নয়; এর সঙ্গে জড়িত কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য, ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য, নৌ-যোগাযোগ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ পরিবেশ।
বাংলাদেশের নদীর তালিকায় একের পর এক নতুন নাম যুক্ত হচ্ছে। সরকারি হিসাবে দেশের নদ-নদীর সংখ্যা এখন ১ হাজার ৪১৫টি। ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসন ও নদী-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সহায়তায় প্রস্তুত করা তালিকাটি প্রকাশ করা হয়।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তালিকায় থাকা এসব নদীর কতটি এখনো স্বাভাবিক প্রবাহ ধরে রেখেছে? কতটি নদী বর্ষায় পানি পেলেও শুষ্ক মৌসুমে মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে? আর কতটি নদীর নাম কাগজে থাকলেও বাস্তবে তার কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্ব নেই? এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত উত্তর এখনো নেই।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় নদীর গতিপথ দখল, পলি জমে ভরাট, অপরিকল্পিত বাঁধ ও অবকাঠামো নির্মাণ, বর্জ্য ও শিল্পদূষণ এবং শুষ্ক মৌসুমে অতিরিক্ত পানি প্রত্যাহারের কারণে বহু নদী সংকুচিত হয়েছে। কোনোটি পরিণত হয়েছে সরু খালে, কোনোটি ভরাট হয়ে গেছে কৃষিজমি বা স্থাপনায়। আবার কোথাও নদীর পুরোনো গতিপথের চিহ্নটুকুও খুঁজে পাওয়া কঠিন।
তালিকায় নদী, বাস্তবে সংকট
নদীর সংখ্যা নির্ধারণে সরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যের মধ্যেও অতীতে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে। ২০২৫ সালে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগে খসড়া তালিকায় ১ হাজার ২৯৪টি নদীর কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। পরে সংশোধন ও যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে সরকারি তালিকায় সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ৪১৫।
অর্থাৎ তালিকা প্রণয়ন ও সংশোধনের কাজ চললেও নদীগুলোর বাস্তব অবস্থা নির্ধারণের বিষয়টি সমান গুরুত্ব পাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ একটি নদীর নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া এবং নদীটির স্বাভাবিক প্রবাহ, প্রস্থ, নাব্যতা ও পরিবেশগত অস্তিত্ব টিকে থাকা দুটি ভিন্ন বিষয়।
নদীর দৈর্ঘ্য নিয়েও বিভিন্ন সরকারি নথিতে অসংগতি রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী ও তুরাগের দৈর্ঘ্য নিয়ে সরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যে পার্থক্য দেখা গেছে। নদীর সীমানা ও গতিপথ নির্ধারণে এমন অসংগতি থাকলে দখল শনাক্তকরণ, উচ্ছেদ এবং নদীর প্রকৃত সীমানা রক্ষার কাজও জটিল হয়ে পড়ে।

দখল-দূষণে বিপন্ন নদী
নদী দখল বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সংকট। ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্যে দেশে ২১ হাজার ৯৮৮ জন অবৈধ নদীদখলদার শনাক্ত হওয়ার কথা সংসদে জানানো হয়েছে। জেলা প্রশাসনকে তালিকা যাচাই করে উচ্ছেদের কর্মপরিকল্পনা তৈরির নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে নদী দখলমুক্ত করতে বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
সাম্প্রতিক সংসদীয় তথ্যে জানানো হয়েছে, ২০১০ সাল থেকে নদ-নদী ও নদীবন্দর এলাকায় ২৮ হাজারের বেশি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে ১ হাজার ২৪৪ একরের বেশি তীরভূমি। তবে উচ্ছেদের পর পুনর্দখল ঠেকানো এবং উদ্ধার করা জায়গার স্থায়ী সুরক্ষা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর চিত্র এ সংকটকে আরও স্পষ্ট করে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যার বিভিন্ন অংশে দখল, শিল্পবর্জ্য ও অপরিশোধিত বর্জ্য ফেলার কারণে নদীর পানি ও পরিবেশ দীর্ঘদিন ধরে চাপে রয়েছে। নদী রক্ষায় একাধিক প্রকল্প ও অভিযান পরিচালিত হলেও নদীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
শুষ্ক মৌসুমে নদী হয়ে যায় মাঠ
শুধু শহরের নদী নয়, গ্রামাঞ্চলের ছোট ও মাঝারি নদীগুলোর অবস্থাও উদ্বেগজনক। উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন নদীতে শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে যাওয়ায় নদীর তলদেশে চাষাবাদ করা হচ্ছে। কোথাও বালুচর স্থায়ী হয়ে গেছে, কোথাও নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে।
ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন জেলার প্রশাসনিক তালিকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নদী রয়েছে। কিন্তু এর অনেকগুলোই শুষ্ক মৌসুমে পানিশূন্য হয়ে পড়ে। কোথাও নদীর তলদেশে কৃষিকাজ চলছে, আবার কোথাও নদীর জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে বসতি বা অন্যান্য স্থাপনা। ফলে তালিকায় নদী থাকলেও বাস্তবে তার নদীসত্তা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
পরিবেশ ও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
একটি নদীর মৃত্যু শুধু একটি জলধারা হারানোর ঘটনা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে কৃষি, মৎস্য, নৌ-যোগাযোগ, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং জীববৈচিত্র্যের প্রশ্ন।
নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে বর্ষায় পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয়ে জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকট বাড়ে। নদী ও জলাভূমির ওপর নির্ভরশীল মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর আবাসস্থলও সংকুচিত হয়। কৃষিতে সেচের পানির ওপর চাপ বাড়ে এবং অনেক এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়।
নদীর সংকট তাই শুধু পরিবেশগত নয়; এটি কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, স্থানীয় অর্থনীতি এবং মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।

দায়িত্বের বিভাজনেও সংকট
নদী রক্ষায় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থা যুক্ত। কিন্তু নদীর সীমানা নির্ধারণ, দখল উচ্ছেদ, নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং নদীর পানি ব্যবস্থাপনায় একাধিক সংস্থার দায়িত্ব থাকায় সমন্বয়ের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে দেশের নদ-নদীর আইনগত অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হলেও কমিশনের ক্ষমতা ও কার্যকারিতা বাড়াতে আইনি সংস্কারের উদ্যোগ চলছে। প্রস্তাবিত পরিবর্তনে নদী দখল ও দূষণকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা, পৃথক নদী আদালত প্রতিষ্ঠা এবং দূষণের ক্ষতিপূরণ আদায়ের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার কথা জানানো হয়েছে।
নদী বাঁচাতে প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক হিসাব
নদী রক্ষার প্রথম শর্তই হলো কোন নদী কোথায় আছে, তার প্রকৃত সীমানা কতটুকু, কোথা দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এবং বর্তমান অবস্থাই বা কী—এসব তথ্য নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা। শুধু তালিকায় নদীর সংখ্যা বাড়িয়ে নদী রক্ষা করা সম্ভব নয়।
প্রয়োজন প্রতিটি নদীর পৃথকভাবে জিআইএসভিত্তিক মানচিত্র, সীমানা নির্ধারণ, প্রবাহ ও নাব্যতা যাচাই, দখল-দূষণের হালনাগাদ তথ্য এবং নদীর পরিবেশগত অবস্থার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ। একই সঙ্গে দখল উচ্ছেদের পর উদ্ধার করা নদীতীর যাতে পুনরায় দখল না হয়, সে ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী রক্ষায় শুধু খনন কিংবা উচ্ছেদ অভিযান যথেষ্ট নয়। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, উৎস ও সংযোগস্থল রক্ষা, পানিপ্রবাহের পথ উন্মুক্ত রাখা এবং দূষণের উৎস বন্ধ করা জরুরি।
বাংলাদেশের নদী শুধু মানচিত্রের নীল রেখা নয়, এগুলো দেশের কৃষি, পরিবেশ, অর্থনীতি ও মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত। তাই তালিকায় নদীর সংখ্যা কত তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, তালিকাভুক্ত নদীগুলোর কতটি বাস্তবে বেঁচে আছে। কাগজে নদী বাড়ানোর পাশাপাশি বাস্তবের নদী বাঁচানোই এখন সবচেয়ে জরুরি।



















