৬ যুবকের আমৃত্যু কারাদণ্ড দুই তরুণীকে তুলে নিয়ে ভয়াবহ নির্যাতন ধর্ষণ
- আপডেট সময় : ১২:৩৯:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬ ২৫ বার পড়া হয়েছে
কেরানীগঞ্জে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মামলায় দৃষ্টান্তমূলক সাজা, প্রত্যেকের এক লাখ টাকা জরিমানা
ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা এলাকায় দুই তরুণীকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, নির্যাতন, লুটপাট ও ধর্ষণের ভিডিও ধারণের ঘটনায় ছয় যুবককে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে প্রত্যেক আসামিকে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। চার বছর ধরে চলা মামলার বিচার শেষে মঙ্গলবার ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪ এ রায় ঘোষণা করা হয়।
ট্রাইব্যুনালের বিচারক মুন্সী মো. মশিয়ার রহমান এ রায় ঘোষণা করেন। দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন, রাহুল (২৩), মো. ডায়মন্ড (২০), আফসার উদ্দিন অনিম (২২), পারভেজ হক পলাশ (২৫), মিনহাজ ওরফে মিনহাজ আবেদীন (২১) এবং মিনহাজ ওরফে বাবু ওরফে মিনহাজ বাবু (২৪)।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. এরশাদ আলম (জর্জ) জানান, সাজা দেওয়ার পাশাপাশি প্রত্যেক আসামিকে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড করা হয়েছে। আসামিদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে অর্থদণ্ডের টাকা আদায় এবং তা ভুক্তভোগী বা তাদের পরিবারের কাছে দেওয়ার জন্য ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা কালেক্টরকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে রাহুল পলাতক রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানার পাশাপাশি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। অন্য পাঁচ আসামিকে সাজা পরোয়ানা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২৫ জুন দুই তরুণীসহ কয়েকজন বন্ধু এক বন্ধুর জন্মদিন উদযাপন করতে বের হন। রাত পৌনে ১০টার দিকে তারা কেরানীগঞ্জের পানকৌড়ি রেস্টুরেন্টে যান। সেখানে খাওয়া-দাওয়া শেষে বাসায় ফেরার জন্য শুভাঢ্যা এলাকায় অটোরিকশার অপেক্ষা করছিলেন তারা।
এ সময় আসামিরা একটি অটোরিকশা নিয়ে তাদের পথরোধ করে। এরপর দুই তরুণী ও তাদের বন্ধুদের মারধর করে ভয়ভীতি দেখানো হয়। একপর্যায়ে দুই তরুণীকে জোর করে ‘রতনের খামার’ নামের একটি অন্ধকার মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানে তাদের বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা-পয়সা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পর দুই তরুণীকে পালাক্রমে ধর্ষণ করা হয়। নৃশংসতার প্রমাণ মুছে ফেলার বদলে উল্টো ধর্ষণের ভিডিও ধারণ করে আসামিরা। ভুক্তভোগীদের মোবাইল ফোনও নিয়ে যায় তারা।
পরে দুই তরুণীর বন্ধুরা দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় গিয়ে পুলিশকে বিষয়টি জানান। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের উদ্ধার করে।
ঘটনার চার দিন পর, ২৯ জুন এক তরুণীর বাবা দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন। মামলা দায়েরের পর র্যাব মিনহাজ আবেদীনকে গ্রেপ্তার করে। তার কাছ থেকে ভুক্তভোগীদের একজনের মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। ওই মোবাইল ফোনে দুই তরুণীর ওপর সংঘটিত ধর্ষণের ভিডিওও পাওয়া যায় বলে মামলার তদন্তে উঠে আসে।
তদন্ত শেষে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার এসআই শরজিৎ কুমার ঘোষ ছয়জনকে আসামি করে ২০২৩ সালের ৩০ এপ্রিল আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। পরে আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করেন।
বিচার চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষ মোট ১২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করে। সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা, আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের বক্তব্য এবং উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে আদালত ছয় আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করেন। এরপর তাদের প্রত্যেককে আমৃত্যু কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
এই রায় কেবল একটি মামলার বিচারিক নিষ্পত্তি নয়; বরং নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদার ওপর সংঘবদ্ধ সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর বার্তাও দিয়েছে। রাস্তায় ফেরার পথে দুই তরুণীকে তুলে নিয়ে নির্জন স্থানে আটকে ধর্ষণ, নির্যাতন ও সেই অপরাধের ভিডিও ধারণের মতো ভয়াবহ ঘটনায় আদালতের কঠোর সাজা অপরাধীদের জন্য সতর্ক সংকেত হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।









