ইউরোপজুড়ে অপরাধ জগতে কিশোরদের ভাড়াটে খুনি (Hitman) হিসেবে ব্যবহার করার একটি ভয়াবহ ও সংঘবদ্ধ সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে। সুইডেন ও ডেনমার্কসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সক্রিয় কুখ্যাত অপরাধী চক্র ‘ফক্সট্রট নেটওয়ার্ক’ (Foxtrot Network) এই অপরাধ সিন্ডিকেটের নেপথ্যে রয়েছে।
ইউরোপে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রগুলো এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে কিশোরদের অর্থের বিনিময়ে ভাড়াটে খুনি হিসেবে ব্যবহার করছে। এই প্রবণতাকে ভায়োলেন্স-অ্যাজ এ-সার্ভিস (VaaS) বলা হয়। এর অন্যতম কুখ্যাত সংগঠন ফক্সট্রট নেটওয়ার্ক, যা ২০২২ সাল থেকে প্রায় ৩৫টি হত্যাকাণ্ড এবং ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুর ওপর একাধিক হামলার সঙ্গে জড়িত বলে ধারণা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সংগঠনটির নেতা রাওয়া মাজিদ ইরানে অবস্থান করে দেশটির শাসকগোষ্ঠীর স্বার্থেও হামলা পরিচালনা করছেন।
ফক্সট্রটের কার্যপদ্ধতিতে কিশোরদের অনলাইনে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং কম্পিউটার গেমের মতো ধাপে ধাপে নির্দেশনা পাঠানো হয়। সুইডেনের ১৮ বছর বয়সী আতিলা আজিমভ এমনই এক অভিযানে ভুল ব্যক্তিকে হত্যা করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পান। আবার নরওয়ের কিশোর ইয়োহানেস নাটল্যান্ডকে যুক্তরাজ্যে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর জন্য পাঠানো হলেও, লক্ষ্যবস্তুর পরিচয় জানানোর আগেই ব্রিটিশ পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
তদন্তে দেখা যায়, নাটল্যান্ডকে প্রথমে আরেক কিশোর ‘জেনারেলেন’ নিয়োগ দেয়। পরে ‘এজেন্ট ৪৭’ নামে পরিচিত ফক্সট্রটের এক সদস্য তার বিমান টিকিট, ভ্রমণ ও অস্ত্র সংগ্রহের ব্যবস্থা করে। সিগন্যাল অ্যাপের মাধ্যমে তাকে প্রতিটি ধাপে নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে পুলিশ সময়মতো অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে।
ইউরোপোলের মতে, এই নেটওয়ার্ক দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের লক্ষ্য করে। তারা দ্রুত অর্থের লোভে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে এবং গ্রেপ্তার হওয়ার পর কোনো পারিশ্রমিকই পায় না। তদন্তে এমন কোনো নির্ভরযোগ্য উদাহরণ পাওয়া যায়নি যেখানে ভাড়াটে কিশোরদের প্রতিশ্রুত অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। বরং অপরাধচক্রগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে কম বয়সীদের ব্যবহার করে, কারণ তারা ঝুঁকি সম্পর্কে কম সচেতন এবং সহজে প্রভাবিত হয়।
এই হুমকি মোকাবিলায় ইউরোপোল অপারেশনাল টাস্কফোর্স গ্রিম (OTF Grim) গঠন করেছে, যেখানে ১১টি ইউরোপীয় দেশ একসঙ্গে কাজ করছে। গত ১৫ মাসে ২৮০ জনের বেশি সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ‘এজেন্ট ৪৭’ নামে পরিচিত আলি শেহাদ আহমেদ এবং ফক্সট্রটের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য মোহাম্মদ “মোয়েগলি” মোহধিও রয়েছেন। তবে সংগঠনের নেতা রাওয়া মাজিদ এখনো ইরানে অবস্থান করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রেপ্তার অভিযানে কিছু অগ্রগতি হলেও সমস্যা পুরোপুরি দূর হয়নি। ফক্সট্রটের পাশাপাশি অন্যান্য অপরাধী গোষ্ঠীও একই কৌশলে কিশোরদের ব্যবহার করে হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে। ফলে সুইডেন থেকে শুরু হওয়া এই অপরাধচক্রের প্রভাব এখন স্ক্যান্ডিনেভিয়া, উত্তর ইউরোপ এবং যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে, যা ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য একটি বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সূত্র বিবিসি