হাওরের ক্ষতি জাতীয় সংকট: ফসলহানির চেয়েও ভয়ংকর হতে পারে কৃত্রিম সংকট ও মূল্য কারসাজি
- আপডেট সময় : ০৭:৫২:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬ ৬৭ বার পড়া হয়েছে
মে মাসে হবিগঞ্জে আকস্মিক বন্যায় প্রায় সাত হাজার হেক্টর বোরো জমির পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে যায় ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের এই বিপর্যয় শুধু কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, এটি জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা ও বাজারব্যবস্থার জন্যও বড় সতর্কবার্তা।
১ হাজার ৪৭ কোটি টাকার ফসলহানি এবং প্রায় ২ লাখ ১৩ হাজার টন ধানের ক্ষতি দেশের চালের বাজারে চাপ তৈরি করতে পারে। এই পরিস্থিতিকে ঘিরে অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেট চক্র সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।
বাংলাদেশে বছরে যে মোট চাল উৎপাদন হয়, তার প্রায় ৫৫ শতাংশ আসে বোরো ধান থেকে। আর হাওর অঞ্চল দেশের অন্যতম প্রধান বোরো উৎপাদন এলাকা। ফলে এখানে সামান্য ক্ষতিও বাজারে বড় প্রভাব ফেলে।
স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা বেশি দাবি করা হলেও, তা দেশের মোট উৎপাদনের ১ থেকে সর্বোচ্চ ২ শতাংশ মাত্র।
আগের (২০২৪-২৫) অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৫ কোটি ৪ লাখ ২৬ হাজার টন দানাদার শস্য উৎপাদিত হয়, যার মধ্যে চালই ছিল ৪ কোটি ১৯ লাখ ১৬ হাজার টন (১ কেজি ধানে ৬৮০ গ্রাম চাল, এই হিসাবে সে বছর মোট ধানের উৎপাদন ছিল প্রায় ৬ কোটি ১৬ লাখ ৪১ হাজার টন)। এই বিপুল উৎপাদনের বিপরীতে এবারের এপ্রিল শেষে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হওয়া ক্ষতি নিতান্তই নগণ্য।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত জমি ৪৯ হাজার ৭৩ হেক্টর, ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৪৭ কোটি টাকা , নষ্ট হওয়া ধান প্রায় ২ লাখ ১৩ হাজার টন ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক প্রায় ২ লাখ ৩৬ হাজার।
যদিও সরকার বলছে, প্রায় ৮০ শতাংশ ধান ইতোমধ্যে কেটে ফেলা হয়েছে, তারপরও যে পরিমাণ ধান নষ্ট হয়েছে তা বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিতে পারে।
বাংলাদেশে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা উৎপাদন ঘাটতির খবর প্রকাশের পর কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। সাধারণত তারা কয়েকটি কৌশল বেচে নেয়। এরমধ্যে গুদামজাত করে কৃত্রিম সংকট, বড় মিল মালিক ও আড়তদাররা বিপুল পরিমাণ চাল মজুত করে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেয়। এতে বাজারে চালের দাম দ্রুত বাড়ে।
এছাড়া কৌশলে এই সিন্ডিকেট গোষ্ঠী বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে যেমন দেশে ধানের বড় ক্ষতি হয়েছে, চালের সংকট হবে, এমন সব প্রচারণা চালিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে থাকে। এতে মানুষ বেশি চাল কিনে মজুত করতে শুরু করে, যা বাজারে চাপ আরও বাড়ায়।
অপর দিকে কিছু ব্যবসায়ী বিদেশ থেকে চাল আমদানির সুযোগ নিতে চায়। কম শুল্কে চাল আমদানির অনুমতি পেলে তারা বিপুল মুনাফা করতে পারে।
সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো, কৃষক ফসল হারিয়ে নিঃস্ব হন, কিন্তু বাজারে চালের দাম বাড়লেও সেই লাভ কৃষক পায় না। লাভ যায় মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের হাতে।
কিশোরগঞ্জের কৃষক ফয়জুল ইসলামের ঘটনা পুরো হাওরাঞ্চলের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। পাঁচ একর জমির ধান আবাদ করে তিনি প্রায় ৩০০ মণ ধান হারিয়েছেন। ঋণের টাকায় চাষ করে এখন তিনি জমি বিক্রির চিন্তায়।
এমন হাজারো কৃষক এখন ঋণ, সুদ ও নতুন মৌসুমের চাষ ব্যয়ের দুশ্চিন্তায় আছেন। ক্ষতিপূরণ দ্রুত না পেলে অনেকেই কৃষি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি সরকার কঠোর নজরদারি না করে তাহলে, মোটা ও মাঝারি চালের দাম বাড়তে পারে, খুচরা বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে, নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে।
বিশেষ করে বর্ষাকালে পরিবহন ব্যয় বাড়লে চালের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন, এরমধ্যে কঠোর নজদারি, গুদামজাত ও অবৈধ মজুতের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে হবে।
ওএমএস ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির মাধ্যমে কম দামে চাল বিক্রি বাড়ালে বাজারের চাপ কমবে।
কৃষকদের সরাসরি সহায়তার অংশ হিসাবে নগদ অর্থ, বীজ, সার ও সহজ শর্তে ঋণ দিতে হবে।
প্রতি বছর একই ধরনের ক্ষতি ঠেকাতে হাওর রক্ষা বাঁধ সংস্কার জরুরি। যাতে আমদানির সুযোগ নিয়ে কেউ অস্বাভাবিক মুনাফা করতে না পারে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা স্বচ্ছভাবে তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন এবং তিন মাস আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা বলেছেন। এটি দ্রুত বাস্তবায়ন হলে কৃষকদের কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে।
তবে শুধু সহায়তা নয়, বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ ফসলহানির চেয়েও ভয়ংকর হতে পারে কৃত্রিম সংকট ও মূল্য কারসাজি।



















