ঢাকা ০৪:২২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪০২, দুর্ঘটনার শীর্ষে মোটরসাইকেল মতিঝিলে প্রকাশ্যে ব্যবসায়ীকে গুলি করে ১৭ হাজার ডলার ছিনতাই বাজেট অধিবেশন ৯ জুলাই পর্যন্ত চলবে, চারদিন দুই বেলা বসবে সংসদ সন্তানহারা পরিবারকে ৮০ লাখ টাকা: প্রশাসনিক তৎপরতায় দায় স্বীকারে বাধ্য আদ-দ্বীন রামিসা হত্যা মামলার রায়, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান বজ্রপাত দেশের বিভিন্ন জেলায় ১১ জনের প্রাণহানি এটি বাংলাদেশের ও গণতন্ত্রের জয় সভাপতি নির্বাচিত হয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই, জাতিসংঘের সভাপতি পদে জয়ী হয়ে আশ্বস্ত করলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে বক্তব্যের জেরে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতার বিরুদ্ধে মামলা আদ-দ্বীনে  ৬ নবজাতকের মৃত্যু: হাসপাতালের অবহেলার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি

চারপাশে কয়েক ডজন ধর্ষক, মাঝে বসে থাকতেন পেলিকোত

ভয়েস ডিজিটাল ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ১২:২৬:৪২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২১ ডিসেম্বর ২০২৪ ২৭২ বার পড়া হয়েছে

৭২ বছর বয়সী গিস লে পেলিকোত। তাঁর স্বামী ঘুমের ওষুধ খাইয়ে এক দশকের বেশি সময় ধরে ৫০ জনকে দিয়ে তাঁকে ধর্ষণ করিয়েছিলেনছবি: রয়টার্স

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

 

৭২ বছর বয়সী গিস লে পেলিকোত। তাঁর স্বামী ঘুমের ওষুধ খাইয়ে এক দশকের বেশি সময় ধরে ৫০ জনকে দিয়ে তাঁকে ধর্ষণ করিয়েছিলেন

ফ্রান্সের অ্যাভিগনোনের কাচ আর কংক্রিটে তৈরি আদালত ভবনের বাইরে ব্যস্ত রিং রোড। পাশের ফুটপাতে প্রতিদিন শরতের ঠান্ডা হওয়া গায়ে মেখে একদল নারী এসে জড়ো হতেন। সকাল থেকে তাঁদের সারি লম্বা হতো, চলত সন্ধ্যা পর্যন্ত।

এভাবে দিনের পর দিন আদালতের পাশের এ ফুটপাতে জড়ো হতেন নানা শ্রেণি-পেশার নারী। তাঁদের মধ্যে কেউ আবার ফুল নিয়ে আসতেন। আর কাচের দরজার ভেতর দিয়ে সিঁড়ি ভেঙে যখন হেঁটে আসতেন গিস লে পেলিকোত, তখন সমবেত নারীরা তাঁকে করতালি দিয়ে সাধুবাদ জানাতেন। সাহস করে কেউ তাঁর কাছে গিয়ে কথা বলারও চেষ্টা করতেন। কেউ উচ্চস্বরে বলে উঠতেন, আমরা তোমার পাশে আছি গিস লে। বুকে সাহস রাখ।

এসব নারীর বেশির ভাগই আদালত ভবনে জনসাধারণের জন্য সংরক্ষিত কক্ষে একটি আসন পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতেন। প্রতিদিন কক্ষটি মানুষের উপস্থিতিতে কানায় কানায় ভরে উঠত। কক্ষে তাঁরা একটি মামলার বিচারকাজ দেখার সুযোগ পেতেন। অধীর আগ্রহে থাকতেন একজন বয়োবৃদ্ধ নারীর সাহসিকতার সাক্ষী হয়ে থাকতে।

আদালতকক্ষে চুপচাপ বসে থাকতেন পেলিকোত আর তাঁর চারপাশে থাকতেন তাকেই ধর্ষণ করার অভিযোগ ওঠা কয়েক ডজন আসামি।

বার্তা সংস্থা এএফপির এক খবরে বলা হয়েছে, স্বামীর সঙ্গে অ্যাভিগনোন শহরের মাজান এলাকায় থাকতেন পেলিকোত। উচ্চশক্তির ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে অন্য পুরুষদের দিয়ে তাঁকে ধর্ষণ করাতেন তারই স্বামী ডোমেনিক পেলিকোত। নির্মম এ ঘটনার শুরু ২০১১ সালে। বর্তমানে পেলিকোতের বয়স ৭২ বছর।

গেল (১৯ ডিসেম্বর) বৃহস্পতিবার ফ্রান্সের আদালতে পেলিকোত ধর্ষণ মামলার রায় হয়েছে। এতে তাঁর স্বামীকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। পাশাপাশি আরও ৫০ জনকেও ৩ থেকে ১৫ বছর মেয়াদে দণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আদালতে নিয়মিত এই ধর্ষণ মামলার বিচার দেখতে আসা ব্যক্তিদের একজন ৫৪ বছর বয়সী ইসাবেলা মুনিয়ের বলেন, আমি তার (পেলিকোত) মধ্যে নিজেকে দেখতে পাই। বিচারের মুখোমুখি হওয়া অভিযুক্ত পুরুষদের মধ্যে আমার এক বন্ধুও ছিলেন। এটি ছিল আমার জন্য খুব জঘন্য বিষয়।

সাদজিয়া জিমলি নামের ২০ বছর বয়সী এক তরুণী বলেন, পেলিকোত নারীদের জন্য আদর্শ হয়ে উঠেছেন। তবে আদালত প্রাঙ্গণে নারীরা শুধুই বিচারকাজ দেখতে যেতেন, তা নয়। এর পেছনে আরও কারণ ছিল। সর্বোপরি তাঁরা বেশ কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন।

আদালতে আইনজীবীর সঙ্গে গিস লে পেলিকোত। ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৪

ফ্রান্সের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ধর্ষণের ঘটনা এটি। এ ঘটনায় অ্যাভিগনোনের আদালত প্রাঙ্গণে যেসব নারী আসতেন, তাঁরাসহ ফ্রান্সের অনেক নারীর মাথায় এখন দুটি মৌলিক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রথমটি সহজাত। এ প্রশ্নের তির ফরাসি পুরুষদের দিকে। কেউ কেউ পুরো পুরুষ জাতির দিকেই আঙুল তুলছেন। কেউ বা শুধু ৫০ জনের কথা বলছেন, যাঁরা কি না একজন নারীকে ধর্ষণ করার অপ্রত্যাশিত আহ্বান লুফে নিতে একপায়ে খাড়া ছিলেন। একেবারেই পরিচিত এক ব্যক্তির বাড়ির শোবার ঘরে অচেতন হয়ে পড়ে ছিলেন সেই নারী।

দ্বিতীয় প্রশ্নটির উৎপত্তি প্রথম প্রশ্ন থেকেই। যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে জোরজবরদস্তি ও মাদক খাইয়ে ধর্ষণের মতো ঘটনা মোকাবিলায় লজ্জা ও সম্মতি সম্পর্কে কুসংস্কার এবং অজ্ঞতাকে চ্যালেঞ্জ করার বিষয়ে এ বিচার কত দূর যাবে?

সহজ ভাষায় বললে, পেলিকোত সাহস ও দৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমে এ মামলার বিচারকাজ প্রকাশ্যে করার অনুরোধ জানান। তাঁর অনুরোধেই প্রকাশ্যে শুনানি হয়েছে। ধর্ষণের ঘটনায় ভুক্তভোগীই সাধারণত লজ্জা ও সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হন। কিন্তু প্রকাশ্য বিচারের মাধ্যমে গিস লে বিষয়টিকে উল্টে দিতে চেয়েছেন। তাঁর চাওয়া ছিল অপরাধীরা যাতে লজ্জা পান। গিস লের এ প্রচেষ্টা কি বড় কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসবে?

ফ্রান্সের ইনস্টিটিউট অব পাবলিক পলিসিজ চলতি বছর একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। এতে দেখা গেছে, ফ্রান্সে যৌন নিপীড়নের গড়ে ৮৬ শতাংশ অভিযোগ ও ধর্ষণের ৯৪ শতাংশ অভিযোগের বিচার হয় না কিংবা এসব অভিযোগ বিচারের আওতায় আসে না।

বিচারচলাকালে দেখা গেছে, পেলিকোতকে ধর্ষণে অভিযুক্তরা আদালত প্রাঙ্গণের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, গল্প করছেন, হাসি-ঠাট্টা করছেন, কফি খাচ্ছেন বা রাস্তার ওপারে একটি ক্যাফে থেকে ফিরছেন। এর মধ্য দিয়ে তাঁরা বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে, তাঁরা নিতান্তই সাধারণ মানুষ। তাঁদের মনোভাব এমন যে, তাঁরা সংঘবদ্ধভাবে যৌন সম্পর্ক করার জন্য অনলাইনে সুযোগ খুঁজছিলেন। আর ঘটনাচক্রে একটি অপ্রত্যাশিত ঝামেলায় ফেঁসে গেছেন।

আদালতের নিযুক্ত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ লরেন্ট লেয়েট সাক্ষ্য দিয়েছেন যে অভিযুক্তরা দানবও নন, আবার সাধারণ পুরুষও নন। বিচার চলাকালে তাঁদের কেউ কেউ অশ্রুসিক্ত ছিলেন। কয়েকজন নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছেন। কিন্তু বেশির ভাগই নানা রকম অজুহাত দেখিয়েছেন। অনেকে বলেছেন, তাঁরা শুধুই ফুর্তিবাজ ছিলেন। পেলিকোত যৌন সম্পর্ক করার জন্য সম্মতি দিয়েছেন কি না, তা জানার কোনো উপায় ছিল না তাঁদের। অন্যদের দাবি, পেলিকোতের স্বামী ডমিনিক অভিযুক্তদের ভয় দেখিয়েছিলেন।

পেলিকোত ধর্ষণ মামলায় বিচারের আওতায় আনা ৫১ জন পুরুষের মধ্যে বৈশিষ্ট্যগত মিল নেই বললেই চলে। তাঁরা সমাজে ব্যাপক বৈচিত্র্যের প্রতিনিধিত্ব করেন। এর মধ্যে তিন-চতুর্থাংশের সন্তান আছে। অর্ধেক বিবাহিত বা প্রেমের সম্পর্কে আছেন। আর মাত্র এক-চতুর্থাংশ বলেছেন যে, তাঁরা শিশু বয়সে নির্যাতন বা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন

বয়স, চাকরি বা সামাজিক শ্রেণির ভিত্তিতে এ অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা দলের সদস্য নন। তাঁদের মধ্যে শুধু দুটি বিষয়ে মিল ছিল। তা হলো এই ব্যক্তিরা পুরুষ এবং তাঁরা একটি অবৈধ অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত ছিলেন। যাঁরা সংঘবদ্ধ যৌনাচার ও শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ অনুভব করেন, তাদের কাছে জনপ্রিয় ছিল এ প্ল্যাটফর্ম। মাদক ব্যবসায়ীদের কাছেও এটি ছিল পছন্দের। ফরাসি কৌঁসুলিদের মতে, প্ল্যাটফর্মটি চলতি বছরের শুরুতে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এটির মাধ্যমে ২৩ হাজারের বেশি অপরাধমূলক কার্যকলাপ সংগঠিত হয়েছে বলে নথিভুক্ত করা হয়েছে।

এ মামলাকে নিবিড়ভাবে অনুসরণ করেছেন জুলিয়েট ক্যাম্পিয়ন। তিনি একজন ফরাসি সাংবাদিক। সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম ফ্রান্স ইনফোর পক্ষ থেকে পুরো বিচারকাজ চলার সময় আদালতে ছিলেন তিনি। জুলিয়েট বলেন, আমি মনে করি, এ ঘটনা অবশ্যই অন্য কোনো দেশেও ঘটতে পারত। ফ্রান্সে পুরুষেরা নারীদের কোন চোখে দেখেন বা সম্মতির নেওয়ার বিষয়ে কী ভাবেন…সে বিষয়ে অনেক কথাই বলে এ ঘটনা। তিনি বলেন, অনেক পুরুষ জানেনই না, সম্মতি আসলে কী। তাই দুঃখজনকভাবে এ মামলা আমাদের দেশ সম্পর্কে অনেক কিছুর ইঙ্গিত দেয়।

পেলিকোত ধর্ষণ মামলা ফ্রান্সজুড়ে ধর্ষণ সম্পর্কে প্রচলিত ধ্যান-ধারণাই বদলে দিয়েছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর দেশটির অভিনেতা, গায়ক, সংগীতজ্ঞ ও সাংবাদিকসহ বিশিষ্ট ফরাসি পুরুষদের একটি দল, লিবারেশন পত্রিকায় একটি উন্মুক্ত চিঠি লিখেছিলেন। সেখানে তাঁরা বলেছিলেন, পেলিকোত মামলা প্রমাণ করেছে যে পুরুষদের যৌন সহিংসতার ঘটনা দানবীয় কোনো বিষয় নয়। অর্থাৎ যেকোনো পুরুষের পক্ষেই এমন ঘটনা ঘটানো সম্ভব।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

চারপাশে কয়েক ডজন ধর্ষক, মাঝে বসে থাকতেন পেলিকোত

আপডেট সময় : ১২:২৬:৪২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২১ ডিসেম্বর ২০২৪

 

৭২ বছর বয়সী গিস লে পেলিকোত। তাঁর স্বামী ঘুমের ওষুধ খাইয়ে এক দশকের বেশি সময় ধরে ৫০ জনকে দিয়ে তাঁকে ধর্ষণ করিয়েছিলেন

ফ্রান্সের অ্যাভিগনোনের কাচ আর কংক্রিটে তৈরি আদালত ভবনের বাইরে ব্যস্ত রিং রোড। পাশের ফুটপাতে প্রতিদিন শরতের ঠান্ডা হওয়া গায়ে মেখে একদল নারী এসে জড়ো হতেন। সকাল থেকে তাঁদের সারি লম্বা হতো, চলত সন্ধ্যা পর্যন্ত।

এভাবে দিনের পর দিন আদালতের পাশের এ ফুটপাতে জড়ো হতেন নানা শ্রেণি-পেশার নারী। তাঁদের মধ্যে কেউ আবার ফুল নিয়ে আসতেন। আর কাচের দরজার ভেতর দিয়ে সিঁড়ি ভেঙে যখন হেঁটে আসতেন গিস লে পেলিকোত, তখন সমবেত নারীরা তাঁকে করতালি দিয়ে সাধুবাদ জানাতেন। সাহস করে কেউ তাঁর কাছে গিয়ে কথা বলারও চেষ্টা করতেন। কেউ উচ্চস্বরে বলে উঠতেন, আমরা তোমার পাশে আছি গিস লে। বুকে সাহস রাখ।

এসব নারীর বেশির ভাগই আদালত ভবনে জনসাধারণের জন্য সংরক্ষিত কক্ষে একটি আসন পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতেন। প্রতিদিন কক্ষটি মানুষের উপস্থিতিতে কানায় কানায় ভরে উঠত। কক্ষে তাঁরা একটি মামলার বিচারকাজ দেখার সুযোগ পেতেন। অধীর আগ্রহে থাকতেন একজন বয়োবৃদ্ধ নারীর সাহসিকতার সাক্ষী হয়ে থাকতে।

আদালতকক্ষে চুপচাপ বসে থাকতেন পেলিকোত আর তাঁর চারপাশে থাকতেন তাকেই ধর্ষণ করার অভিযোগ ওঠা কয়েক ডজন আসামি।

বার্তা সংস্থা এএফপির এক খবরে বলা হয়েছে, স্বামীর সঙ্গে অ্যাভিগনোন শহরের মাজান এলাকায় থাকতেন পেলিকোত। উচ্চশক্তির ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে অন্য পুরুষদের দিয়ে তাঁকে ধর্ষণ করাতেন তারই স্বামী ডোমেনিক পেলিকোত। নির্মম এ ঘটনার শুরু ২০১১ সালে। বর্তমানে পেলিকোতের বয়স ৭২ বছর।

গেল (১৯ ডিসেম্বর) বৃহস্পতিবার ফ্রান্সের আদালতে পেলিকোত ধর্ষণ মামলার রায় হয়েছে। এতে তাঁর স্বামীকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। পাশাপাশি আরও ৫০ জনকেও ৩ থেকে ১৫ বছর মেয়াদে দণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আদালতে নিয়মিত এই ধর্ষণ মামলার বিচার দেখতে আসা ব্যক্তিদের একজন ৫৪ বছর বয়সী ইসাবেলা মুনিয়ের বলেন, আমি তার (পেলিকোত) মধ্যে নিজেকে দেখতে পাই। বিচারের মুখোমুখি হওয়া অভিযুক্ত পুরুষদের মধ্যে আমার এক বন্ধুও ছিলেন। এটি ছিল আমার জন্য খুব জঘন্য বিষয়।

সাদজিয়া জিমলি নামের ২০ বছর বয়সী এক তরুণী বলেন, পেলিকোত নারীদের জন্য আদর্শ হয়ে উঠেছেন। তবে আদালত প্রাঙ্গণে নারীরা শুধুই বিচারকাজ দেখতে যেতেন, তা নয়। এর পেছনে আরও কারণ ছিল। সর্বোপরি তাঁরা বেশ কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন।

আদালতে আইনজীবীর সঙ্গে গিস লে পেলিকোত। ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৪

ফ্রান্সের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ধর্ষণের ঘটনা এটি। এ ঘটনায় অ্যাভিগনোনের আদালত প্রাঙ্গণে যেসব নারী আসতেন, তাঁরাসহ ফ্রান্সের অনেক নারীর মাথায় এখন দুটি মৌলিক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রথমটি সহজাত। এ প্রশ্নের তির ফরাসি পুরুষদের দিকে। কেউ কেউ পুরো পুরুষ জাতির দিকেই আঙুল তুলছেন। কেউ বা শুধু ৫০ জনের কথা বলছেন, যাঁরা কি না একজন নারীকে ধর্ষণ করার অপ্রত্যাশিত আহ্বান লুফে নিতে একপায়ে খাড়া ছিলেন। একেবারেই পরিচিত এক ব্যক্তির বাড়ির শোবার ঘরে অচেতন হয়ে পড়ে ছিলেন সেই নারী।

দ্বিতীয় প্রশ্নটির উৎপত্তি প্রথম প্রশ্ন থেকেই। যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে জোরজবরদস্তি ও মাদক খাইয়ে ধর্ষণের মতো ঘটনা মোকাবিলায় লজ্জা ও সম্মতি সম্পর্কে কুসংস্কার এবং অজ্ঞতাকে চ্যালেঞ্জ করার বিষয়ে এ বিচার কত দূর যাবে?

সহজ ভাষায় বললে, পেলিকোত সাহস ও দৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমে এ মামলার বিচারকাজ প্রকাশ্যে করার অনুরোধ জানান। তাঁর অনুরোধেই প্রকাশ্যে শুনানি হয়েছে। ধর্ষণের ঘটনায় ভুক্তভোগীই সাধারণত লজ্জা ও সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হন। কিন্তু প্রকাশ্য বিচারের মাধ্যমে গিস লে বিষয়টিকে উল্টে দিতে চেয়েছেন। তাঁর চাওয়া ছিল অপরাধীরা যাতে লজ্জা পান। গিস লের এ প্রচেষ্টা কি বড় কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসবে?

ফ্রান্সের ইনস্টিটিউট অব পাবলিক পলিসিজ চলতি বছর একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। এতে দেখা গেছে, ফ্রান্সে যৌন নিপীড়নের গড়ে ৮৬ শতাংশ অভিযোগ ও ধর্ষণের ৯৪ শতাংশ অভিযোগের বিচার হয় না কিংবা এসব অভিযোগ বিচারের আওতায় আসে না।

বিচারচলাকালে দেখা গেছে, পেলিকোতকে ধর্ষণে অভিযুক্তরা আদালত প্রাঙ্গণের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, গল্প করছেন, হাসি-ঠাট্টা করছেন, কফি খাচ্ছেন বা রাস্তার ওপারে একটি ক্যাফে থেকে ফিরছেন। এর মধ্য দিয়ে তাঁরা বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে, তাঁরা নিতান্তই সাধারণ মানুষ। তাঁদের মনোভাব এমন যে, তাঁরা সংঘবদ্ধভাবে যৌন সম্পর্ক করার জন্য অনলাইনে সুযোগ খুঁজছিলেন। আর ঘটনাচক্রে একটি অপ্রত্যাশিত ঝামেলায় ফেঁসে গেছেন।

আদালতের নিযুক্ত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ লরেন্ট লেয়েট সাক্ষ্য দিয়েছেন যে অভিযুক্তরা দানবও নন, আবার সাধারণ পুরুষও নন। বিচার চলাকালে তাঁদের কেউ কেউ অশ্রুসিক্ত ছিলেন। কয়েকজন নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছেন। কিন্তু বেশির ভাগই নানা রকম অজুহাত দেখিয়েছেন। অনেকে বলেছেন, তাঁরা শুধুই ফুর্তিবাজ ছিলেন। পেলিকোত যৌন সম্পর্ক করার জন্য সম্মতি দিয়েছেন কি না, তা জানার কোনো উপায় ছিল না তাঁদের। অন্যদের দাবি, পেলিকোতের স্বামী ডমিনিক অভিযুক্তদের ভয় দেখিয়েছিলেন।

পেলিকোত ধর্ষণ মামলায় বিচারের আওতায় আনা ৫১ জন পুরুষের মধ্যে বৈশিষ্ট্যগত মিল নেই বললেই চলে। তাঁরা সমাজে ব্যাপক বৈচিত্র্যের প্রতিনিধিত্ব করেন। এর মধ্যে তিন-চতুর্থাংশের সন্তান আছে। অর্ধেক বিবাহিত বা প্রেমের সম্পর্কে আছেন। আর মাত্র এক-চতুর্থাংশ বলেছেন যে, তাঁরা শিশু বয়সে নির্যাতন বা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন

বয়স, চাকরি বা সামাজিক শ্রেণির ভিত্তিতে এ অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা দলের সদস্য নন। তাঁদের মধ্যে শুধু দুটি বিষয়ে মিল ছিল। তা হলো এই ব্যক্তিরা পুরুষ এবং তাঁরা একটি অবৈধ অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত ছিলেন। যাঁরা সংঘবদ্ধ যৌনাচার ও শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ অনুভব করেন, তাদের কাছে জনপ্রিয় ছিল এ প্ল্যাটফর্ম। মাদক ব্যবসায়ীদের কাছেও এটি ছিল পছন্দের। ফরাসি কৌঁসুলিদের মতে, প্ল্যাটফর্মটি চলতি বছরের শুরুতে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এটির মাধ্যমে ২৩ হাজারের বেশি অপরাধমূলক কার্যকলাপ সংগঠিত হয়েছে বলে নথিভুক্ত করা হয়েছে।

এ মামলাকে নিবিড়ভাবে অনুসরণ করেছেন জুলিয়েট ক্যাম্পিয়ন। তিনি একজন ফরাসি সাংবাদিক। সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম ফ্রান্স ইনফোর পক্ষ থেকে পুরো বিচারকাজ চলার সময় আদালতে ছিলেন তিনি। জুলিয়েট বলেন, আমি মনে করি, এ ঘটনা অবশ্যই অন্য কোনো দেশেও ঘটতে পারত। ফ্রান্সে পুরুষেরা নারীদের কোন চোখে দেখেন বা সম্মতির নেওয়ার বিষয়ে কী ভাবেন…সে বিষয়ে অনেক কথাই বলে এ ঘটনা। তিনি বলেন, অনেক পুরুষ জানেনই না, সম্মতি আসলে কী। তাই দুঃখজনকভাবে এ মামলা আমাদের দেশ সম্পর্কে অনেক কিছুর ইঙ্গিত দেয়।

পেলিকোত ধর্ষণ মামলা ফ্রান্সজুড়ে ধর্ষণ সম্পর্কে প্রচলিত ধ্যান-ধারণাই বদলে দিয়েছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর দেশটির অভিনেতা, গায়ক, সংগীতজ্ঞ ও সাংবাদিকসহ বিশিষ্ট ফরাসি পুরুষদের একটি দল, লিবারেশন পত্রিকায় একটি উন্মুক্ত চিঠি লিখেছিলেন। সেখানে তাঁরা বলেছিলেন, পেলিকোত মামলা প্রমাণ করেছে যে পুরুষদের যৌন সহিংসতার ঘটনা দানবীয় কোনো বিষয় নয়। অর্থাৎ যেকোনো পুরুষের পক্ষেই এমন ঘটনা ঘটানো সম্ভব।