৭ নভেম্বর সংকটের অন্ধকার পেরিয়ে বাংলাদেশের নতুন পথচলার সূচনা
- আপডেট সময় : ০৬:২২:৪২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬ ২৩ বার পড়া হয়েছে
সিপাহি–জনতার বিপ্লব, জিয়ার নেতৃত্ব ও জাতীয় ঐক্যের এক ঐতিহাসিক অধ্যায়
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাংলাদেশের মানুষ। স্বপ্ন ছিল একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক, শোষণমুক্ত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার। কিন্তু স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পুনর্গঠনের নানা সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক বিভাজন, অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও প্রশাসনিক দুর্বলতা নতুন রাষ্ট্রকে গভীর সংকটে ফেলে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংকোচন এবং রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ জনমনে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় জাসদের সহিংস রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং রাষ্ট্রীয় অস্থিরতা। এমন এক অনিশ্চিত সময়ে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে আবির্ভূত হয়।
স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ধারাবাহিক পরিবর্তন শুরু হয়। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে অভ্যুত্থানের পর সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংকট আরও ঘনীভূত হয়। বন্দিদশায় ছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। এরই ধারাবাহিকতায় ৭ নভেম্বর সেনাসদস্যদের একটি অংশ ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে সংঘটিত হয় সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান। মুক্ত হন জিয়াউর রহমান। পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনীতিতে তাঁর নেতৃত্বের উত্থানের পথ তৈরি হয়।
৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে তিনটি নাম বিশেষভাবে আলোচিত খালেদ মোশাররফ, কর্নেল আবু তাহের ও জিয়াউর রহমান। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার তৎপরতা এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ মিলিয়ে দিনটি ছিল বহুমাত্রিক। বিএনপি ও দলটির অনুসারীদের কাছে ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লব, জাতীয় সংহতি ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতীক। তাঁদের মতে, এই দিনই জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা পায়।
স্বাধীনতার ঘোষক ও একজন সম্মুখযুদ্ধের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জিয়াউর রহমানের পরিচিতি আগে থেকেই জনপরিসরে ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর নেতৃত্ব ও স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারের ভূমিকা তাঁকে বিশেষ পরিচিতি দেয়। ৭ নভেম্বরের পর রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর প্রভাব বিস্তারের মধ্য দিয়ে সেই পরিচিতি নতুন রাজনৈতিক মাত্রা লাভ করে। পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণাকে সামনে রেখে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ নেন।

রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের অন্যতম অগ্রাধিকার ছিল অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ, খাল খনন, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। কৃষককে উৎপাদনের কেন্দ্রে রেখে খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জনের চেষ্টা ছিল তাঁর উন্নয়ন ভাবনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগও তাঁর শাসনামলের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
শিল্প, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করা হয়। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি বাণিজ্যের প্রসার এবং উদ্যোক্তা শ্রেণির বিকাশে নীতিগত পরিবর্তন আনা হয়। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কাজের ক্ষেত্র সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে ক্ষুদ্রঋণ, নারী উদ্যোক্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে এনজিওগুলোর ভূমিকা বিস্তৃত হওয়ার পেছনে এই সময়ের নীতিগত পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বিকাশের ইতিহাসে আলোচিত হয়ে আছে।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও বহুদলীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ছিল জিয়াউর রহমানের শাসনামলের গুরুত্বপূর্ণ দিক। বাকশাল প্রতিষ্ঠার পর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছিল, তা থেকে বেরিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে আবার নিজস্ব পরিচয়ে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন দল রাজনীতিতে ফিরে আসে। জামায়াতে ইসলামীসহ স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনও এই সময়ের রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের অংশ ছিল, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিতর্কের বিষয় হয়ে রয়েছে।
১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান তাঁর রাজনৈতিক দর্শনকে সাংগঠনিক রূপ দেন। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটি রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালান তিনি। ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন বহুদলীয় রাজনীতির নতুন অধ্যায় তৈরি করে। তবে তাঁর শাসনামল ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিকাশ নিয়ে যেমন ইতিবাচক মূল্যায়ন রয়েছে, তেমনি সামরিক শাসনের প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা নিয়েও ইতিহাসে বিতর্ক রয়েছে।
সত্তরের দশকে বিশ্বজুড়েই রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামরিক শাসনের বিস্তার ঘটেছিল। ব্রাজিল, চিলি ও আর্জেন্টিনায় সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও সামরিক নেতৃত্বের প্রভাব ছিল প্রবল। এমন এক বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনায় জিয়াউর রহমান জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন। চীন, মুসলিম বিশ্ব, পশ্চিমা দেশ ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের প্রচেষ্টা চালানো হয়। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা উত্থাপনেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। পরবর্তী সময়ে সার্ক প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সেই ধারণা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে। কিন্তু তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন উদ্যোগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে যায়।

বিপ্লব ও সংহতি দিবসের তাৎপর্য
৭ নভেম্বরকে ঘিরে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ব্যাখ্যায় মতভিন্নতা রয়েছে। বিএনপি দিনটিকে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পালন করে এবং জিয়াউর রহমানকে সেই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে বিবেচনা করে। অন্যদিকে ইতিহাসবিদদের একটি অংশ দিনটিকে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, জাসদের ভূমিকা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ক্ষমতা পুনর্বিন্যাসের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করেন। কর্নেল আবু তাহেরের ভূমিকা ও পরিণতিও এই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে ৭ নভেম্বর যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথে গভীর প্রভাব ফেলেছিল, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এই দিনের ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের উত্থান ঘটে এবং পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোয় নানা পরিবর্তন আসে।
আজকের বাংলাদেশে ৭ নভেম্বরের তাৎপর্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি ইতিহাসের সব পক্ষের ভূমিকা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করাও জরুরি। স্বাধীনতার মূল চেতনা, জাতীয় সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, রাজনৈতিক সহনশীলতা ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠাই হওয়া উচিত জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি।
১৯৭১ সালে যে স্বপ্ন নিয়ে এ দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব আজও সবার। রাজনৈতিক মতপার্থক্য অতিক্রম করে একটি গণতান্ত্রিক, সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের মূল প্রত্যয়।
রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ৭ নভেম্বর উদযাপন
দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৬ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উদযাপিত হচ্ছে। দিবসটি উপলক্ষে ৭ নভেম্বর সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণী দেবেন। সরকারি-বেসরকারি ভবন ও বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, রাজধানীর সড়ক ও সড়কদ্বীপ সাজানো, জেলা-উপজেলায় আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। টেলিভিশন, বেতার ও সংবাদপত্রে প্রকাশিত হবে বিশেষ অনুষ্ঠান, নিবন্ধ ও ক্রোড়পত্র। মসজিদে বিশেষ মোনাজাত এবং অন্যান্য উপাসনালয়ে প্রার্থনার পাশাপাশি হাসপাতাল, কারাগার ও এতিমখানায় বিশেষ খাবার পরিবেশন করা হবে। শিশু পার্কগুলো বিনা টিকিটে উন্মুক্ত রাখারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ কর্মসূচির পাশাপাশি ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে বর্ণাঢ্য ডিসপ্লের আয়োজন রয়েছে।
অন্যদিকে দিবসটি উপলক্ষে বিএনপি ৫ থেকে ১১ নভেম্বর পর্যন্ত সাত দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ৭ নভেম্বর সকাল ৬টায় দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন এবং সকাল সাড়ে ৮টায় শেরেবাংলা নগরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন ও ফাতেহা পাঠ করা হবে। এতে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ দলের নেতারা অংশ নেবেন। বিকেল ৩টায় নয়াপল্টন থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে শেষ হবে। দেশের বিভিন্ন জেলা ও মহানগরেও শোভাযাত্রা হবে। এ ছাড়া আলোচনা সভা, আলোকচিত্র প্রদর্শনী, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পৃথক কর্মসূচি রয়েছে। ৮ নভেম্বর থানা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মসূচি পালন করা হবে।
















