মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে প্রতিশ্রুতি নয়, নীতি বাস্তবায়নেই ভরসা অর্থমন্ত্রীর
- আপডেট সময় : ০৮:০৪:০২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬ ৫৮ বার পড়া হয়েছে
বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ
গত ১৬ মাসের মধ্যে মে মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে
দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে
মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাস্তবায়নকেই প্রধান অস্ত্র মানছেন অর্থমন্ত্রী
দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে এবং অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে নতুন সরকার নীতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিচ্ছে। প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। নতুন অর্থবছরের বাজেটের মূল লক্ষ্য ও কৌশলগুলো সম্পর্ক সরকারের তরফে বলা হচ্ছে, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকার ব্যবসা পরিচালনা ব্যয় কমানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী জানিয়েছেন, কেবল বাজারে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ বা অভিযান দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এর জন্য কাঠামোগত সংস্কার, আর্থিক খাতের সুশাসন এবং কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন প্রয়োজন। এই লক্ষ্য অর্জিত হলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এ অবস্থায় পরিস্থিতি থেকে স্বস্তি দিতে নীতি বাস্তবায়নের ওপর ভরসা রাখতে চান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। নতুন অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৭ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, আমাদের পলিসিগুলো যদি আমরা ঠিকমতো বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে আমাদের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন হবে না।
শুক্রবার বিকালে বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী এ কথা বলেন। বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলেনে যুক্ত হয়ে সূচনা বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সবার জন্য ইনক্লুসিভ বাজেট করতে হয়েছে। গত দেড় দশক আমাদের অর্থনীতি ছিল পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতি। কিছু মানুষের অর্থনীতি। নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে, একটি গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত বছরের মে মাসের পর থেকে ৯ শতাংশের ঘরেই ওঠানামা করলেও, সাম্প্রতিক সময়ে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় খাতেই এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা গেছে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু। নতুন অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৭ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্যের কথা বলেছেন তিনি। সবশেষ মে মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে সাড়ে ৯ শতাংশের কাছাকাছি চলে গেছে। বিএনপির নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার মাস চারেক পর দেওয়া এ বাজেটে মূল্যস্ফীতি কমানোর পদক্ষেপ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে অর্থমন্ত্রী বলেন, মূল্যস্ফীতিটা গত বেশ কয়েক বছর ধরে বাড়তে বাড়তে ৯ এর উপরে তিন বছর ধরে চলছে। এর সাথে যোগ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের বিষয়টা। আপনারা জানেন ব্যাংকগুলোতে যেহেতু বিরাট একটা মূলধন ঘাটতি রয়ে গেছে লুটপাটের কারণে, ঋণ নেওয়ার কারণে, যে কারণে তহবিল খরচ কিন্তু অনেক বেশি রয়ে গেছে, এটার প্রতিফলন কিন্তু মূল্যস্ফীতিতে পড়ছে।
আমদানিকৃত যে পণ্যগুলো সবগুলোর দাম বাড়ছে, বিশ্ববাজারে বাড়ছে, যুদ্ধের কারণে আরো বাড়ছে। সুতরাং আমরা আশা করছি যে আগামী দিনে আমরা যে রিফর্মের কথাগুলো বলেছি… সংস্কারগুলোর মাধ্যমে ব্যবসার খরচ আমরা কমানোর চেষ্টা করছি। আপনারা লক্ষ্য করবেন আমাদের দেশে এই যে একটা ব্যবসা করতে গেলে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে খরচটা আসে…এটা কিন্তু আপনার মূল্যস্ফীতিতে যোগ হয়। ব্যবসার খরচ বাড়ার ব্যাখা করে আমির খসরু বলেন, অনেকগুলো সময় নষ্ট হয় এবং অনেকগুলো জায়গায় তাদেরকে খরচ করতে হয়, এদিক সেদিক যেয়ে, বলতে চাচ্ছি না…খরচ করতে হয় এটা তো সত্যি কথা।
দ্বিতীয়ত আমাদের দেশে যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মালগুলো খালাস হয়, পোর্টে ফর এক্সাম্পল ওখানে একটু সময় নষ্ট হয়। ওখানেই অধিক খরচ তাদেরকে করতে হয় বিভিন্ন কারণে। মাল খালাস থেকে শুরু করে সরবরাহ নেওয়া পর্যন্ত বা পরিবহন পর্যন্ত অনেক বেশি খরচ হয়। এভাবে ব্যবসার খরচ বেড়ে যাচ্ছে তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, সবকিছু মিলিয়ে আমাদের যে মূল চেষ্টাটা হচ্ছে, বাইরের যে প্রভাবগুলোর কারণে যে মূল্যস্ফীতি হয়, এটা আমাদের কিছু করার থাকে না। আমরা চেষ্টা করতে হবে এই পরিস্থিতিতে আমাদের খরচটা কীভাবে কমিয়ে আনতে পারি ব্যবসার ক্ষেত্রে। ইতোমধ্যে তেলের মূল্য, গ্যাসের মূল্য ইত্যাদির কারণে মূল্যস্ফীতিতে আবার প্রভাব পড়ার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, তেলের মূল্য বাড়ানো মানে পরিবহন মূল্য বাড়বে এবং সব ক্ষেত্রে এটার একটা প্রতিফলন পড়বে।
সুতরাং বাইরের যে মূল্যস্ফীতিটা আসছে (আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি) এটাকে আমাদের মোকাবিলা করা কঠিন। কিন্তু আমাদের অভ্যন্তরীণ যেই জায়গাগুলো নিয়ন্ত্রণ করলে আমাদের ব্যবসার খরচ কমবে। ব্যবসার খরচ ও ব্যবসা সহজ করার সূচকে বাংলাদেশ একদম তলানিতে তুলে ধরে সাবেক এই বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ব্যবসা সহজ করার সূচকে তলানির অর্থ হল ব্যবসা করার খরচও উর্ধ্বমুখী। সুতরাং আমরা অ্যাড্রেস করছি এই জায়গাগুলোকে। বাজেট বক্তৃতায় খেয়াল করেছেন, অনেকগুলো ডিরেগুলেশন থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় খরচ কমিয়ে আনার জন্য আমরা অনেকগুলো পদক্ষেপ নিচ্ছি। এই পদক্ষেপগুলো যদি বাস্তবায়ন করতে পারি, আমাদের ইন্টারনালি কস্ট অফ ডুয়িং বিজনেস টাকে যদি আমি কমাইয়া আনতে পারি, এটার একটা প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে আগামী দিনে পড়বে।
বাজার নিয়ন্ত্রণ
পণ্য সরবরাহ যাতে ব্যাহত না হয় সে জন্য উৎস থেকে গন্তব্য পর্যন্ত বৈশ্বিক মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া নজরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেন অর্থমন্ত্রী। অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা শুধু বিশেষ প্রয়োজনে কেনাকাটা না করে আমাদের একটু দীর্ঘমেয়াদি কেনাকাটা প্রক্রিয়ায় যেতে হবে। যেমন, আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য আমাদের কমপক্ষে তিন মাসের জ্বালানি আমাদের রিজার্ভ থাকতে হবে। আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য আমাদের কমপক্ষে এই ধরনের একটা সময় থাকতে হবে। সার, সবকিছুতেই একটা। জ্বালানির ক্ষেত্রে স্পট বায়িং বা জরুরি ভিত্তিতে নগদ মূল্যে কেনার উদাহরণ দিয়ে আমির খসরু বলেন, স্পট বায়িংয়ে তো আপনি জানেন, আপনার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই দামের ওপরে।
তেল-গ্যাস, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় কেনাকাটার ক্ষেত্রে যথাযথ অবকাঠামো থাকার বিষয়েও জোর দেন তিনি। তাতে খরচ অনেক কমে আসবে বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী। তার মতে, বন্দরে দক্ষতা, স্বচ্ছতার আনার মাধ্যমে খরচ কমানো সম্ভব। খরচ কমাতে এভাবে প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।
অর্থমন্ত্রীর মতে, মূল্য নিয়ন্ত্রণ, বাজার নিয়ন্ত্রণ পুলিশ দিয়ে, র্যাব দিয়ে, সরকারি লোক দিয়ে মূল্য কারসাজি নিয়ন্ত্রণ হবে না। আপনাকে মূল্য নিয়ন্ত্রণটা করতে হবে আপনার নীতির মাধ্যমে। এবং আপনার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। সুতরাং আমাদের পলিসিগুলো যদি আমরা ঠিকমতো বাস্তবায়ন করতে পারি, আমি মনে করি, আমাদের ইনফ্লেশন কন্ট্রোল করা খুব কঠিন হবে আমি মনে করি না।


















