বাজেট ২০২৬-২৭ পেশ : মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে জোর
- আপডেট সময় : ০৯:৫৩:১৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬ ৩৮ বার পড়া হয়েছে
মূল্যস্ফীতির চাপ কমিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পরিধি বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত এ বাজেট দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট।
‘অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ: ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে প্রণীত বাজেটের আকার দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরের তুলনায় বাজেটের আকার বেড়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। এটি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট এবং তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকারেরও প্রথম জাতীয় বাজেট।
প্রায় ২৩৪ পৃষ্ঠার বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন, অগ্রাধিকার ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও ন্যায্যতাকে সামনে রেখে সামষ্টিক অর্থনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে।’
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব
গত কয়েক বছর ধরে নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। এ বাস্তবতায় আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়ন, বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সহায়তা সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসাসামগ্রী ও বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমাতে কর ও শুল্ক ছাড়েরও প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের আশা, এসব পদক্ষেপ বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং ভোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির উদ্যোগ
বাজেটে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং সরকারি সেবাকে আরও ডিজিটাল করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। লাইসেন্স ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা, অনলাইনভিত্তিক সেবা সম্প্রসারণ এবং কর ও শুল্ক কাঠামোকে আরও বিনিয়োগবান্ধব করার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।
সরকারের প্রত্যাশা, এসব উদ্যোগ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। অর্থমন্ত্রীর মতে, উৎপাদন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি ছাড়া টেকসই কর্মসংস্থান সম্ভব নয়।
রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬.৯৫ লাখ কোটি টাকা
আগামী অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১০ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংগ্রহ করবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে আসবে ৯১ হাজার কোটি টাকা।
করজাল সম্প্রসারণ ও রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে আগামী অর্থবছর থেকে সারা বছর আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। আগে রিটার্ন জমা দিলে কর ছাড়ের সুবিধাও থাকছে।
উন্নয়ন ব্যয়ে বড় বৃদ্ধি
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)-এর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ বাড়িয়ে ৩৩ দশমিক ৭০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে, অন্যদিকে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষায় নতুন কর্মসূচি
নিম্ন আয়ের ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বেশ কয়েকটি নতুন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি যুক্ত করা হয়েছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
বাজেট ঘাটতি ২.৪৩ লাখ কোটি টাকা
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এর মধ্যে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস এবং ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ৬ হাজার কোটি টাকা কম।
বাজেট বক্তব্যের শেষাংশে কৃষক, শ্রমিক, উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থী, নারী, তরুণ, পেশাজীবী ও প্রবাসীদের সহযোগিতা কামনা করে অর্থমন্ত্রী বলেন, জনগণের সৃজনশীলতা, উদ্যোগ ও পরিশ্রমই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটি স্বনির্ভর, মর্যাদাবান ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।
সংখ্যার বিচারে এটি দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট হলেও এর মূল বার্তা মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ব্যবসা সহজ করা এবং উন্নয়নের সুফল আরও বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার। নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে এটি আগামী কয়েক বছরের অর্থনৈতিক পথচলার গুরুত্বপূর্ণ রূপরেখা হিসেবে বিবেচিত হবে।



















