নেত্রকোনায় ধান তলিয়ে ক্ষতি ৩৭৩ কোটি টাকার, ক্ষতিগ্রস্ত ৭৮ হাজার কৃষক
- আপডেট সময় : ০৪:১৩:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৯ মে ২০২৬ ২৪ বার পড়া হয়েছে
টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে হাওরের ধান তলিয়ে ক্ষতি হয়েছে ক্ষতি ৩৭৩ কোটি টাকার। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন হাওর এবং নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৭৮ হাজার কৃষক।
নদ-নদী ও খাল বিল ভরে গিয়ে ধান শুকানোর খলাগুলোও তলিয়ে গেছে। এতে দীর্ঘ সময় স্তূপ করে রাখা ধান পচে হাওর এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
কৃষকরা দাব করছেন, তাদের ৯০ শতাংশ ধানে চারা গজিয়ে গেলেও টিকে থাকার লড়াইয়ে সেই পচা ও দুর্গন্ধযুক্ত ধানই সামান্য রোদে শুকিয়ে ঘরে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলার মোট বোরো আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে। অতিবৃষ্টিতে নিমজ্জিত হয়েছে ১৮ হাজার ৪৭৮ হেক্টর জমি। এর মধ্যে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৬ হাজার ৮৭৭.৬৫ হেক্টর জমির ধান।
উৎপাদনে মোট ক্ষতি ৭৫ হাজার ৯৪৯.৪৩ মেট্রিক টন যার আর্থিক মূল্য ৩৭২ কোটি ১৫ লাখ টাকা। জেলায় মোট ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ৭৭ হাজার ৩৬৩ জন।
এছাড়া হাওরে আবাদ করা ধানের পরিমাণ ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর, নিমজ্জিত হয়েছিল ১১ হাজার ২৩০ হেক্টর আর সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ ১০ হাজার ৭২৭ হেক্টর।
উৎপাদনে ক্ষতি ৪৮ হাজার ২৭১ ধমমিক ৫০ মেট্রিক টন যার আর্থিক মূল্য ২৩৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকা এবং হাওরে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ৩৮ হাজার ২৩৮ জন। এসব তথ্য নিশ্চিত করেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. আমিনুল ইসলাম।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরি করে প্রণোদনার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে, জেলা ত্রাণ ও পূর্নবাসন কর্মকর্তা মো রুহুল আমিন জানান, উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে তালিকা করা হচ্ছে আগামী রোববার বা সোমবার নাগাদ তা সম্পন্ন হবে।
তালিকা অনুযায়ী তিনটি ক্যাটাগরিতে ৭৫০০, ৫০০০ এবং ২৫০০ করে টাকা এবং ২০ কেজি করে চাল ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে আগামী তিন মাস বিতরণ করা হবে।
কৃষি কার্ডের ব্যাপারে জানতে চাইলে খালিয়াজুরি সদরের কৃষক ক্ষিতিশ সরকার বলেন, আমার ১৫ কাঠা জমির ধান তলাইয়া গেছে। কিছু ধান তুলছি তাও আবার জায়গার অভাবে শুকাতে পারছি না।
২০১৭ সালের বন্যার পর এত বড় ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে হাওরের কৃষকদের। আর সাহায্য কার্ডের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন নাম এখনো নেয়নি।

নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কয়েক শ কোটি টাকার ফসল তলিয়ে গেছে। ফসল হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন কয়েক লাখ কৃষক। এর মধ্যে নেত্রকোনায় ক্ষতির পরিমাণ ৩৭৩ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছে ৭৮ হাজার কৃষক পরিবার। অন্যদিকে সুনামগঞ্জে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরিতে জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও প্রকৃত কৃষকদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
নেত্রকোনার হাওরপাড়ের কৃষকরা জানান, বৃষ্টি ও ঢলের পানিতে এভাবে বিপুল পরিমাণ ফসল তলিয়ে যাবে, তা ছিল কল্পনার বাইরে। খেতে পানি জমায় এবং জ্বালানিসংকটে যন্ত্র দিয়ে ধান কাটা সম্ভব হয়নি। শ্রমিকসংকটে কৃষকরা নিজেরাই কাস্তে দিয়ে ধান কেটে শুকনো জমিতে আনছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, জেলায় চলতি মৌসুমে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। অকালবৃষ্টি ও ঢলে ১৮ হাজার ৪৭৮ হেক্টরের বেশি জমির ধান তলিয়ে গেছে। এর বাজারমূল্য ৩৭২ কোটি ১৫ লাখ টাকার বেশি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা অন্তত ৭৮ হাজার। এই ক্ষতি অপূরণীয়।
অধিদপ্তর আরও জানায়, শুধু জেলার হাওরাঞ্চলে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। অতিবৃষ্টিতে ১১ হাজার ২৩০ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। এতে ৪৮ হাজার ২৭১ টনের বেশি ধান উৎপাদিত হতো, যার বাজারমূল্য ২৩৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকার বেশি। এ অঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ৩৮ হাজারের বেশি।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা রুহুল আমিন জানান, উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করা হচ্ছে। আগামী সপ্তাহে তালিকা শেষ হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার ৫০০ টাকা ও পরবর্তী তিন মাস ২০ কেজি করে চাল বিতরণের কথা রয়েছে।
মোহনগঞ্জের মানারকান্দি গ্রামের ওয়াজেদ আলী জানান, ডিঙ্গাপোতা হাওরে ৩০ কাঠা জমিতে বোরো রোপণ করেছিলেন। ১০ কাঠা জমির ধান কাটতে পারলেও বাকি ২০ কাঠা তলিয়ে গেছে। রোদের অভাবে ধান শুকাতে না পেরে কম দামে ভেজা ধান বিক্রি করেছেন। কৃষি সহায়তা পাবেন কি না, তা নিয়ে তিনি অনিশ্চিত।
খালিয়াজুরীর সুশীল তালুকদার জানান, ৮০ কাঠা জমির মধ্যে ৪০ কাঠা সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে। পাঁচ ভাইয়ের পরিবারে যে ধান ঘরে উঠেছে, তাতে খোরাকি চললেও পড়াশোনা বা চিকিৎসার খরচ চালানো সম্ভব নয়। পরে বাধ্য হয়ে চাল কিনে খেতে হবে। গরু বিক্রি বা মহাজনের ঋণের ওপর নির্ভর করা ছাড়া বিকল্প থাকবে না।
জেলা কৃষি অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘জেলায় বোরো চাষ প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাধাগ্রস্ত হয়। এবারও অতিবৃষ্টি ও ঢলের কারণে তাই হয়েছে। এই ক্ষতি অপূরণীয়। সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করছে, তাদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।’



















