সেচ সংকটের পর প্লাবনে নষ্ট বোরো : দ্বিমুখী আঘাতে বিপর্যস্ত কৃষি
- আপডেট সময় : ১১:০৫:২৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১ মে ২০২৬ ৩৪ বার পড়া হয়েছে
দেশের কৃষি খাত আবারও এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে মৌসুমজুড়ে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটে সেচ দিতে না পেরে জমি পুড়েছে খরায়, অন্যদিকে ফসল ঘরে তোলার ঠিক আগমুহূর্তে টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ জনপদের বোরো ক্ষেত। সেচ সংকট ও আকস্মিক প্লাবনের এই দ্বিমুখী আঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন দেশের খাদ্য জোগানদাতা কৃষকরা, যাদের চোখে এখন শুধু হতাশা আর অনিশ্চয়তার ছাপ।
এপ্রিলের শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর ও উত্তরের বিভিন্ন জেলায় তৈরি হয়েছে বন্যাসদৃশ পরিস্থিতি। অনেকেই একে প্রচলিত বন্যা না বলে ‘অতিবৃষ্টিজনিত প্লাবন’ হিসেবে উল্লেখ করছেন।

কারণ, নদীর পানি বিপৎসীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার আগেই অতিবৃষ্টির পানিতে ডুবে যাচ্ছে ফসলি জমি। এতে হাজার হাজার হেক্টর জমির পাকা ও আধাপাকা বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, মৌলভীবাজার ও সিলেটের হাওরাঞ্চলে। শুধু নেত্রকোনাতেই প্রায় ৯ হাজার ৪৩৪ হেক্টর জমির বোরো ফসল তলিয়ে গেছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, টানা বৃষ্টিতে ভুগাই-কংস, সোমেশ্বরী, মগরা ও সুতাং নদীর পানি ইতোমধ্যে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নেত্রকোনা ও হবিগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং আগামী কয়েকদিনে পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উত্তরাঞ্চলেও একই চিত্র। টানা পাঁচ দিনের বর্ষণে রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ধরলাসহ অন্তত ২৬টি নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদিও এখনো বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি, তবুও বৃষ্টির ধারা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এই দুর্যোগের সবচেয়ে করুণ চিত্র দেখা যাচ্ছে কৃষকের জীবনে। অনেক কৃষক কোমরসম পানিতে দাঁড়িয়ে আধাপাকা ধান কাটতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ আবার চোখের সামনে ফসল ডুবে যেতে দেখেও কিছু করতে পারছেন না। যেসব কৃষক আগেভাগে ধান কেটেছেন, তারাও পড়েছেন নতুন বিপদে। রোদ না থাকায় ধান শুকাতে না পেরে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটছে তাদের।
চলতি মৌসুমে এই বিপর্যয় নতুন নয়, বরং প্রতি বছরই কোনো না কোনোভাবে হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যায় ফসল তলিয়ে যায়। ফলে প্রশ্ন উঠছে, প্রতিবছর কেন ভেঙে পড়ে ফসল রক্ষা বাঁধ? কেন সময়মতো টেকসই অবকাঠামো গড়ে তোলা যায় না? স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের কাজ, দুর্নীতি ও তদারকির অভাবের কারণে প্রতিবছরই একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।
অন্যদিকে, বোরো মৌসুমের শুরু থেকেই কৃষকরা পড়েছিলেন সেচ সংকটে। জ্বালানি ঘাটতি, বিদ্যুতের ঘন ঘন লোডশেডিং এবং ডিজেলের অপ্রতুলতায় সেচযন্ত্র চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অনেক জমিতে ধানের শীষ ঠিকমতো পূর্ণতা পায়নি। সেই দুর্বল ফসলই এখন বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গিয়ে পুরোপুরি নষ্ট হচ্ছে।

রাজশাহী অঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহ ও সেচ সংকটে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর এখন বৃষ্টি ও কালবৈশাখীর আঘাতে আধাপাকা ধান মাটিতে নুয়ে পড়েছে। চট্টগ্রামে ধান কাটার শুরুতেই টানা বৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সিলেট বিভাগে ডিজেল সংকট ও জলাবদ্ধতার কারণে কৃষকরা সময়মতো ধান কাটতে পারছেন না। জমিতে পানি জমে থাকায় কম্বাইন হারভেস্টার ব্যবহারও ব্যাহত হচ্ছে।
মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জে হাওরের নিচু এলাকার পাকা ও আধাপাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কোথাও খলায় মাড়াই করা ধানও ডুবে গেছে। কিশোরগঞ্জে প্রায় ৬ হাজার ৭৬৮ হেক্টর জমির ধান ইতোমধ্যে তলিয়ে গেছে। অনেক কৃষক পানির ওপর ভাসমান ধান কেটে নেওয়ার চেষ্টা করছেন, যা তাদের অসহায়তার নির্মম প্রতিচ্ছবি।
কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ময়মনসিংহেও বৃষ্টি, ঝড়, শ্রমিক সংকট ও যন্ত্রপাতির অভাবে ফসল ঘরে তুলতে না পেরে ক্ষতির মুখে পড়ছেন কৃষকরা। গাইবান্ধায় সেচের অভাবে ধান পূর্ণতা না পাওয়ার পর এখন বৃষ্টির পানিতে জমি ডুবে যাচ্ছে। ফলে কোথাও ধানে চিটা ধরছে, কোথাও আবার সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

এই ধারাবাহিক আঘাতে শুধু কৃষক নয়, দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ছে। বোরো ধান দেশের প্রধান খাদ্য উৎপাদনের বড় উৎস। এই মৌসুমে ব্যাপক ক্ষতি হলে জাতীয় খাদ্য উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে, যার প্রভাব পড়তে পারে বাজারে চালের দাম ও সাধারণ মানুষের জীবনে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই জরুরি ভিত্তিতে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, টেকসই বাঁধ নির্মাণ, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য প্রণোদনা ও সহায়তা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে হাওর ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে এই সংকট প্রতি বছর আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।
কৃষকের ঘাম ঝরানো পরিশ্রম যদি বারবার প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট ব্যর্থতায় ভেসে যায়, তাহলে শুধু একটি পেশা নয়, পুরো জাতির খাদ্য নিরাপত্তাই হয়ে পড়বে অনিশ্চিত। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়-অবহেলা না করে কৃষিকে রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে, নাকি প্রতি বছর একই দুঃখগাথা লিখে যেতে হবে।









