ঢাকা দক্ষিণের বর্ধিত ১৮ ওয়ার্ড: মানচিত্র বদলেছে, ঠিকানা বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি মানুষের জীবনমান
- আপডেট সময় : ১০:৫৫:০৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৮ মে ২০২৬ ২৪ বার পড়া হয়েছে
নগরের পাশে থেকেও নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত লাখো মানুষ
রাজধানী ঢাকার একদিকে আকাশছোঁয়া ভবন, ঝলমলে সড়ক আর আধুনিক নগরজীবনের ব্যস্ততা; অন্যদিকে একই নগরের ভেতরেই রয়েছে এমন কিছু এলাকা, যেখানে এখনও মানুষের ভরসা মেঠোপথ, বাঁশের সাঁকো আর কাদামাখা সরু রাস্তা।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বর্ধিত ১৮টি ওয়ার্ডের বর্তমান বাস্তবতা যেন সেই বৈপরীত্যেরই নির্মম প্রতিচ্ছবি। প্রশাসনিকভাবে নগরের অংশ হলেও নাগরিক সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে এখনও অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে।
২০১৭ সালে নগরের চাপ কমানো এবং পরিকল্পিত সেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নাসিরাবাদ ইউনিয়নসহ কয়েকটি এলাকা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় আনা হয়। নতুন করে যুক্ত হওয়া ১৮টি ওয়ার্ডে বর্তমানে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ মানুষের বসবাস।
কিন্তু অন্তর্ভুক্তির প্রায় ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন আজও দৃশ্যমান হয়নি। এলাকাবাসীর অভিযোগ, নিয়মিত হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স ফি ও অন্যান্য সরকারি কর আদায় করা হলেও সেই অনুপাতে নাগরিক সুবিধা মিলছে না।
ঢাকা দক্ষিণের ৭৫ নম্বর ওয়ার্ড নাসিরাবাদ এলাকায় গেলে এখনও চোখে পড়ে জলাবদ্ধ খালপাড়, কাঁচা রাস্তা এবং বাঁশের তৈরি অস্থায়ী সাঁকো। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বর্ষা মৌসুমে চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। স্কুলগামী শিশু, কর্মজীবী মানুষ ও বৃদ্ধদের প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাফেরা করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে রোগী পরিবহনের জন্য অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারে না।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মালেক বলেন, “আমরা সিটি করপোরেশনের নাগরিক হয়েছি কাগজে-কলমে। কিন্তু বাস্তবে এখনও গ্রামের মতো জীবনযাপন করছি। সামান্য বৃষ্টি হলেই হাঁটু পানি জমে যায়।”
৭০ নম্বর ওয়ার্ডে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র, কিন্তু সমস্যার গভীরতা একই। সেখানে কিছু সড়ক নির্মাণকাজ চললেও তা অত্যন্ত ধীরগতির। অনেক জায়গায় রাস্তা খুঁড়ে ফেলে রাখা হয়েছে, ফলে বৃষ্টির পানিতে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। স্থানীয়রা বলছেন, উন্নয়নের নামে দুর্ভোগই যেন বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত পরিকল্পনার অভাবই এ অবস্থার জন্য দায়ী। নগরবিদদের ভাষ্য, কোনো এলাকাকে সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত করার আগে সেখানে সড়ক, ড্রেনেজ, বিদ্যুৎ, সুপেয় পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমন্বিত পরিকল্পনা থাকা জরুরি ছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রস্তুতি ছাড়াই ওয়ার্ড সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
৬৩ থেকে ৬৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের সবচেয়ে বড় দুর্ভোগ জলাবদ্ধতা। ড্রেন ও কালভার্ট না থাকায় অল্প বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যায়। অনেক এলাকায় দিনের পর দিন পানি জমে থাকায় সৃষ্টি হচ্ছে মশার উপদ্রব ও স্বাস্থ্যঝুঁকি। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু, জ্বর ও পানিবাহিত রোগের প্রকোপও বাড়ছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, রাতে অধিকাংশ সড়কে পর্যাপ্ত স্ট্রিটলাইট না থাকায় নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়ছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের চলাচলে চরম ভোগান্তি তৈরি হচ্ছে। এছাড়া নিয়মিত ময়লা অপসারণ ব্যবস্থা না থাকায় অনেক স্থানে বর্জ্যের স্তূপ জমে পরিবেশ দূষণের সৃষ্টি হয়েছে।
ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, এই বিশাল জনগোষ্ঠী এখনও মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশনের কাছে একাধিকবার উন্নয়ন প্রকল্পের দাবি জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এসব ওয়ার্ডে অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য সরকারের কাছে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, রাস্তা, ড্রেনেজ, বিদ্যুৎ লাইন ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত বরাদ্দ পেলে দ্রুত কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধু রাস্তা নির্মাণ নয়; টেকসই নগরায়ণের জন্য প্রয়োজন আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল পুনরুদ্ধার, গণপরিবহন সুবিধা, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, খেলার মাঠ এবং নিরাপদ ফুটপাত। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না করলে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান হবে না।
করপোরেট নগরের ঝকঝকে অংশের পাশেই বঞ্চিত এই জনপদ আজও মৌলিক নাগরিক অধিকার থেকে দূরে। আধুনিক নগরায়ণের মূল উদ্দেশ্য শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং মানুষের জীবনমান উন্নয়ন।
কিন্তু ঢাকা দক্ষিণের বর্ধিত ১৮টি ওয়ার্ডের বাস্তবতা বলছে, সেই স্বস্তি এখনও অধরাই রয়ে গেছে। নগরের কেন্দ্রের এত কাছে থেকেও নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত মানুষের একটাই প্রশ্ন-কবে বদলাবে তাদের ভাগ্য, কবে মিলবে একটি বাসযোগ্য নগরজীবন?



















