শুক্রবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২১, ০৪:৫৮ অপরাহ্ন

ভাইফোঁটার কয়েক কথা

ড. বিরাজলক্ষী ঘোষ
  • Update Time : রবিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২১
  • ৫২ Time View

ছবি সংগৃহিত

ড. বিরাজলক্ষী ঘোষ

‘প্রতি বছর কার্তিক মাসের অমাবস্যার পরে দ্বিতীয়া তিথিতে বাংলার ঘরে ঘরে অনুষ্ঠিত হয় ভাইফোঁটা, যার পোশাকি নাম ‘ভ্রাতৃদ্বিতীয়া’, ভাইফোঁটা এক সর্বজনীন সৌভ্রাতৃত্বের পরম পবিত্র উৎসব, যার সারা গায়ে মাখানো থাকে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, আবেগ ও আন্তরিকতা। অনাবিল আনন্দের বাতাবরণে দিদি বা বোনেরা ছোটো বা বড়ো ভাইদের কপালে চন্দনের বা দইয়ের টিপ পরিয়ে শাঁখের আওয়াজের সঙ্গে উচ্চারণ করে ওঠেন, “ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা, যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা, যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা, আমি দিই আমার ভাইকে ফোঁটা’


বলা যায়, যমের হাত থেকে ভাইদের রক্ষার জন্যই ভাইদের মঙ্গলকামনা করে থাকেন বোনেরা। বাংলার বাইরেও দেশজুড়েই পালন করা হয় ভাইফোঁটা। কোথাও এর নাম ‘ভাইটিকা’, কোথাও ‘ভাইদুজ’, কোথাও আবার ‘ভাই বিছিয়া’। মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, উত্তরাখণ্ড, ছত্তিশগড়, হিমাচল প্রদেশ, গুজরাত, মধ্যপ্রদেশ, গোয়ায় চালের গুঁড়ো দিয়ে আলপনা

দেওয়া হয়, যাকে অঞ্চলভেদে চৌকনা, চতুর্কোন, চোকনা বা চুকনা বলা হয়ে থাকে। আলপনার নির্দিষ্ট জায়গায় ভাইকে বসিয়ে বোনেরা দিদিরা তাদের ভাইদের নরকাসুর বধকারী শ্রীকৃষ্ণ রূপে পুজো করে, কপালে চন্দনের তিল্কা বা তিলক পরিয়ে আরতি বা আর্তি করে। কথিত আছে, এইদিন নাকি শ্রীকৃষ্ণ নরকাসুর বধ করেছিলেন।

পূর্ব ভারতের অসম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, ওড়িশা, এমনকি দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন জায়গায়, বাংলাদেশ, নেপালেও পালন করা হয়ে আসছে এই উৎসব। নেপালের রীতিটা একটু ভিন্ন রকম। ভাইরা যখন ঘুমিয়ে থাকেন, বোনেরা ভাইয়ের কপালে পরিয়ে দেন পোড়া চালের ফোঁটা, উদ্দেশ্য অশুভ শক্তির হাত থেকে ভাইকে বাঁচানো। ভাইফোঁটা’কে নেপালের কোথাও কোথাও ‘ভাইলগন’ বা ‘ভাতিলগন’ বলা হয়

এদিন সকালবেলাতেই ভাই বোনের বাড়ি বা বোন ভাইয়ের বাড়ি এসে ভাইফোঁটা পালন করেন। শুধু মিষ্টি খাওয়ানো আর ফোটা দেওয়াই নয়, চলে নানা উপহারসামগ্রী কেনাও। যাদের ঘরে নাতি, নাতনী, দাদু, ঠাকুরমা রয়েছেন, সেখানেও অনেক নাতনি ফোঁটা দেয় দাদুর কপালে, দিদিমা-ঠাকুমারা নাতিকে ফোঁটা দেন। এ ছাড়াও বিভিন্ন সম্পর্কের মহিলারা, ‘ভাই’ বা ‘দাদা’ সম্পর্ক

পাতিয়ে ফোঁটা দিয়ে থাকেন। সব মিলিয়ে ভাইফোঁটা এক সর্বজনীন সৌভ্রাতৃত্বের পরম পবিত্র উৎসব, যার সারা গায়ে মাখানো থাকে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, আবেগ ও আন্তরিকতা। অনাবিল আনন্দের বাতাবরণে দিদি বা বোনেরা ছোটো বা বড়ো ভাইদের নির্দিষ্ট আসনে বসিয়ে তাদের কপালে চন্দনের বা দইয়ের টিপ পরিয়ে শাঁখের আওয়াজের সঙ্গে উচ্চারণ করে ওঠেন,

“ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা, যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা, যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা, আমি দিই আমার ভাইকে ফোঁটা”।

সঙ্গে থাকে ধান ও দুর্বার আশীর্বাদী মঙ্গলকামনা এবং থালায় সাজানো নানারকম খাবার। তারপর উপহার দেওয়া নেওয়া। আনন্দে ভরে ওঠে সকলের ঘর। এই দিনটিতে ঘরে-বাইরে ছড়িয়ে থাকে ভাইদের জন্য বোনেদের আর বোনেদের জন্য ভাইদের শুভকামনা এবং মঙ্গলা আকাঙ্ক্ষা।

একটু খুঁজলে দেখা যায় ভাই ফোঁটার ইতিহাস বেশ বর্ণময়। চতুর্দশ শতাব্দীতে সর্বানন্দসুরী নামে এক আচার্য পণ্ডিতের তালপাতার পুথি, ‘দীপোৎসবকল্প’ থেকে জানা যায় জৈন ধর্মের অন্যতম মহাপ্রচারক মহাবীর বর্ধমানের মহাপ্রয়াণের পর তাঁর অন্যতম অনুগত সঙ্গী রাজা নন্দীবর্ধন মানসিক এবং শারীরিক ভাবে খুবই ভেঙে পড়েন। বন্ধ করে দেন খাওয়াদাওয়াও।

এইরকম অবস্থায় তাঁর প্রিয় বোন অনসূয়া নন্দীবর্ধনকে তাঁর নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। দিনটি ছিল কার্তিক মাসের শুক্ল পক্ষের দ্বিতীয়া তিথি। রাজার কপালে রাজতিলক পরিয়ে বোন অনসূয়া ভাইকে কিছু খাবার খাইয়ে দেন, আর বলেন, “রাজ্যের প্রজারা তোমার দিকে তাকিয়ে আছে, এই অনশন তোমাকে মানায় না। হে ভ্রাতা, হে রাজন, রাজতিলক এঁকে

দিলাম তোমার কপালে এবং ক্ষুধা নিরসনের জন্য গ্রহণ করো খাদ্য। তুমি সাদর আপ্যায়িত হও। সর্ববিধ মঙ্গলের জন্য তুমি জেগে ওঠো, ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন। তোমার দীর্ঘায়ু কামনা করি। প্রতি বছর এইদিনে তোমাকে রাজতিলক পরিয়ে অভিষিক্ত করা হবে, এই আমার ব্রত।” এরপর বোনের দেওয়া খাবার খেয়ে এবং বোনের মুখে এই কথা শুনে রাজা নন্দীবর্ধন অনশন ভেঙে জীবনসত্যে উদ্ভাসিত হয়েছিলেন।

‘দীপোৎসবকল্প’-এ বর্ণিত এই ইতিহাস আর কাহিনি যদি সত্যি হয়, তা হলে সেই সূত্র ধরে আমরা ‘ভাইফোঁটা’ উৎসবের সময়কাল আন্দাজ করতে পারি। মহাবীরের মহাপ্রয়াণ ঘটেছিল খ্রিস্টপূর্ব ৫২৭ অব্দে। সেই হিসেবে এই উৎসবের বয়স আড়াই হাজার বছর।

এ ছাড়াও পুরাণ, বেদ, উপনিষদসহ বিভিন্ন গ্রন্থে আমরা সূর্যদেবের কথা জানতে পারি। ‘মৎস্যপুরাণ’-এ সূর্যদেবের উল্লেখ আছে। সেখানে কশ্যপ মুনি এবং অদিতির পুত্র। তাঁর আরেক নাম বিবস্বান। সূর্যদেবের তিন পত্নী সংজ্ঞা, প্রভা ও রজনী। সংজ্ঞা ও সূর্যদেবের দুই পুত্রের নাম মনু আর যম। আর কন্যা যমুনা। ওই সুপ্রাচীন গ্রন্থমতে, মনুর উত্তরসূরিরাই মানুষ।

ঘরে ঘরে বেঁচে থাকুক এই মঙ্গল উৎসবের আদর্শ। পৃথিবীর সব ভাইরা বোনদের দুহাত দিয়ে আগলে রাখুক। আর বোনরা শঙ্খ বাজাক ভাইদের মঙ্গল কামনায়।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2017 voiceekattor
কারিগরি সহযোগিতায়: সোহাগ রানা
11223