ঢাকা ০৬:৩৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বাড়ল পেট্রোল-ডিজেলের দাম, কূটনীতিতেও কোণঠাসা ভারত জ্বালানি সহযোগিতায় বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা সই শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ‘খুবই সফল’ বৈঠক শেষে বেইজিং ছাড়লেন ট্রাম্প ভারতীয় হাই কমিশনের আয়োজনে ঢাকায় রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী উদযাপন মশা নৌবহর: হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ছোট নৌকা যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ দিচ্ছে গরীবের পুষ্টিতে থাবা: গরম ডিম-সবজির বাজার, পেঁয়াজের হাফ সেঞ্চুরী ঈদুল আজহায় টানা ৭ দিনের ছুটি, ঢাকা ছাড়তে পারেন কোটি মানুষ পর্যটকদের নিরাপত্তায় কক্সবাজার-কুয়াকাটা স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার সূচিতে পরিবর্তন: ২০২৭ সালের এসএসসি শুরু ৭ জানুয়ারি, এইচএসসি ৬ জুনে বিয়ের সওদা করতে গিয়ে ৪ ভাইয়ের মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া

বাড়ল পেট্রোল-ডিজেলের দাম, কূটনীতিতেও কোণঠাসা ভারত

ভয়েস ডিজিটাল ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৪:২২:১৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬ ৩৪ বার পড়া হয়েছে

ছবি সংগ্রহ

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ভারতে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থান, এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে বর্তমানে দেশটির অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বড় ধরনের আলোচনা শুরু হয়েছে।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে পেট্রোল-ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি যেমন সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলছে, তেমনি ভারতের বৈদেশিক নির্ভরতা ও কূটনৈতিক ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

শুক্রবার, (১৫ মে) ভারত সরকার পেট্রোল ও ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৩ টাকা করে বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে সিএনজির দামও কেজিপ্রতি ২ টাকা বাড়ানো হয়েছে।

ভারতে দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল রাখা হয়েছিল। ২০২২ সালের এপ্রিলের পর বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি হয়নি। বরং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে সরকার পেট্রোল ও ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২ টাকা কমিয়েছিল।

কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবার সরকার আর মূল্য নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেনি।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভারত গড়ে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল প্রায় ৬৯ ডলারে আমদানি করছিল। পরে সেই দাম বেড়ে ১১৩-১১৪ ডলারে পৌঁছে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি বাজারে।

  • কলকাতায় পেট্রোলের দাম বেড়ে হয়েছে লিটারপ্রতি ১০৮.৭৪ টাকা।
  • দিল্লিতে পেট্রোলের দাম ৯৭.৭৭ টাকা এবং ডিজেল ৯০.৬৭ টাকা।
  • মুম্বাইয়ে পেট্রোল ১০৬.৬৮ টাকা এবং ডিজেল ৯৩.১৪ টাকা।
  • চেন্নাইয়ে পেট্রোল ১০৩.৬৭ টাকা ও ডিজেল ৯৫.২৫ টাকা।

ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ। দেশটির মোট জ্বালানি চাহিদার বিশাল অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেই ভারতের অর্থনীতির ওপর চাপ পড়ে।

বাড়ল পেট্রোল-ডিজেলের দাম, কূটনীতিতেও কোণঠাসা ভারত
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদ হায়দরাবাদের একজন ব্যক্তির

২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত অপরিশোধিত তেল আমদানিতে ব্যয় করেছে প্রায় ১৭ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। এটি দেশের সবচেয়ে বড় আমদানি খাত। এরপর রয়েছে ইলেকট্রনিক পণ্য ও স্বর্ণ আমদানি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ ও অস্থিরতার কারণে জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ইরান সংকট এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা বিশ্ববাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হলো হরমুজ প্রণালি। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে বিশ্ববাজারে যায়। ভারতের আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের প্রায় অর্ধেক এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের দুই-তৃতীয়াংশ আসে এই অঞ্চল থেকে।

সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো সতর্ক করেছে, হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বজুড়ে গ্যাসোলিন ও জেট ফুয়েলের মজুদ বিপজ্জনকভাবে কমে যেতে পারে।

কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী আমিন নাসের জানান, ইরান যুদ্ধের পর বিশ্ব ইতোমধ্যে প্রায় ১০০ কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ হারিয়েছে। হরমুজে সমস্যা চলতে থাকলে প্রতি সপ্তাহে আরও বিপুল ঘাটতি তৈরি হতে পারে।

বর্তমানে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৬৯ হাজার কোটি ডলার। তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, এটি পর্যাপ্ত নয়।

বাড়ল পেট্রোল-ডিজেলের দাম, কূটনীতিতেও কোণঠাসা ভারত
দিল্লিতে ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে রাশিয়া ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার সাবেক ডেপুটি গভর্নর মাইকেল দেবাব্রাতা পাত্র মত দিয়েছেন যে, ভারতকে নিরাপদ অবস্থানে থাকতে হলে রিজার্ভ বাড়িয়ে অন্তত ১ লাখ কোটি ডলারে নিতে হবে।

তার মতে, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সম্ভাব্য অর্থ প্রত্যাহারের ধাক্কা সামাল দিতে বড় রিজার্ভ অত্যন্ত জরুরি।

পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের প্রভাব ভারতের মুদ্রাবাজারেও পড়েছে। ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির মান দ্রুত কমেছে।

সংঘাত শুরুর সময় যেখানে ১ ডলারের জন্য ৯১ রুপি লাগত, বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৯৫ রুপিতে পৌঁছেছে। এর ফলে আমদানির খরচ আরও বেড়েছে এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নাগরিকদের জ্বালানি সাশ্রয়ের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি মানুষকে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ কমাতে,  গণপরিবহন ব্যবহার করতে,  বাড়ি থেকে কাজ করতে,  ভোজ্য তেল ও সোনা কেনা কমাতে উৎসাহিত করেছেন।

মোদীর বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্বের বড় অংশের তেল সরবরাহকারী অঞ্চল বর্তমানে যুদ্ধ ও সংঘাতে জড়িয়ে পড়ায় ভারতকে সতর্কভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।

ভারতের জ্বালানি নীতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন রাশিয়া ও আমেরিকার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা হবে।

বাড়ল পেট্রোল-ডিজেলের দাম, কূটনীতিতেও কোণঠাসা ভারত
মুম্বাইয়ের একটি তেল শোধনাগার

যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দেশকে রাশিয়ার তেল কেনা কমানোর জন্য চাপ দিয়ে আসছে। কিন্তু ভারতের জন্য রাশিয়ার তেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ  বলেছেন, ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক দুর্বল হবে না এবং রাশিয়া ভারতের জ্বালানি স্বার্থ রক্ষা করবে।

তিনি দাবি করেন, কিছু শক্তি ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক নষ্ট করার চেষ্টা করলেও তা সফল হবে না।

গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের প্রধান অজয় শ্রীবাস্তব মনে করেন, ভারত কার্যত জ্বালানি জরুরি অবস্থার মুখে রয়েছে। তার মতে:

  • উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল সরবরাহ অনিশ্চিত,
  • রাশিয়ার তেলও মার্কিন চাপের কারণে ঝুঁকিতে,
  • যুক্তরাষ্ট্র এখনো পর্যাপ্ত বিকল্প সরবরাহ দিতে সক্ষম নয়।

তিনি বলেন, পশ্চিম এশিয়া ও রাশিয়া দুই অঞ্চলই ভারতের “লাইফলাইন”।

অন্যদিকে সাংবাদিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষক স্মিতা শর্মা মনে করেন, ভারত এখন এমন অবস্থায় নেই যে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা করতে পারে।

বাড়ল পেট্রোল-ডিজেলের দাম, কূটনীতিতেও কোণঠাসা ভারত
হরমুজ প্রণালী পার করে মুম্বাই বন্দরে আসা তেলবাহী জাহাজ ‘দেশ গরিমা’

তার মতে:

  • মার্কিন শুল্ক ভারতের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে,
  • বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপের মধ্যে,
  • বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে,
  • ফলে ভারত প্রকাশ্যে আমেরিকার বিরুদ্ধে যেতে চাইবে না।

বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বর্তমানে ব্রিকস জোটের ভেতরেও ভারত কিছুটা কূটনৈতিক চাপে রয়েছে।

রাশিয়া, চীন ও ইরানের ঘনিষ্ঠ অবস্থানের বিপরীতে ভারতকে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছাকাছি অবস্থান নিতে দেখছেন। ফলে ইরানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কেও এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে পর্যবেক্ষকদের মত।

বর্তমান পরিস্থিতি ভারতের জন্য একসঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক—দুই ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

একদিকে:

  • তেলের দাম বৃদ্ধি,
  • রুপির অবমূল্যায়ন,
  • বৈদেশিক মুদ্রার চাপ,
  • মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি

অন্যদিকে:

  • রাশিয়া-আমেরিকা ভারসাম্য,
  • পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত,
  • ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ,
  • আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থান

সব মিলিয়ে ভারত এখন এমন এক সময় পার করছে, যেখানে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং পররাষ্ট্রনীতি পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

বাড়ল পেট্রোল-ডিজেলের দাম, কূটনীতিতেও কোণঠাসা ভারত

আপডেট সময় : ০৪:২২:১৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬

ভারতে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থান, এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে বর্তমানে দেশটির অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বড় ধরনের আলোচনা শুরু হয়েছে।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে পেট্রোল-ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি যেমন সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলছে, তেমনি ভারতের বৈদেশিক নির্ভরতা ও কূটনৈতিক ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

শুক্রবার, (১৫ মে) ভারত সরকার পেট্রোল ও ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৩ টাকা করে বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে সিএনজির দামও কেজিপ্রতি ২ টাকা বাড়ানো হয়েছে।

ভারতে দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল রাখা হয়েছিল। ২০২২ সালের এপ্রিলের পর বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি হয়নি। বরং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে সরকার পেট্রোল ও ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২ টাকা কমিয়েছিল।

কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবার সরকার আর মূল্য নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেনি।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভারত গড়ে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল প্রায় ৬৯ ডলারে আমদানি করছিল। পরে সেই দাম বেড়ে ১১৩-১১৪ ডলারে পৌঁছে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি বাজারে।

  • কলকাতায় পেট্রোলের দাম বেড়ে হয়েছে লিটারপ্রতি ১০৮.৭৪ টাকা।
  • দিল্লিতে পেট্রোলের দাম ৯৭.৭৭ টাকা এবং ডিজেল ৯০.৬৭ টাকা।
  • মুম্বাইয়ে পেট্রোল ১০৬.৬৮ টাকা এবং ডিজেল ৯৩.১৪ টাকা।
  • চেন্নাইয়ে পেট্রোল ১০৩.৬৭ টাকা ও ডিজেল ৯৫.২৫ টাকা।

ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ। দেশটির মোট জ্বালানি চাহিদার বিশাল অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেই ভারতের অর্থনীতির ওপর চাপ পড়ে।

বাড়ল পেট্রোল-ডিজেলের দাম, কূটনীতিতেও কোণঠাসা ভারত
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদ হায়দরাবাদের একজন ব্যক্তির

২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত অপরিশোধিত তেল আমদানিতে ব্যয় করেছে প্রায় ১৭ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। এটি দেশের সবচেয়ে বড় আমদানি খাত। এরপর রয়েছে ইলেকট্রনিক পণ্য ও স্বর্ণ আমদানি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ ও অস্থিরতার কারণে জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ইরান সংকট এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা বিশ্ববাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হলো হরমুজ প্রণালি। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে বিশ্ববাজারে যায়। ভারতের আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের প্রায় অর্ধেক এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের দুই-তৃতীয়াংশ আসে এই অঞ্চল থেকে।

সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো সতর্ক করেছে, হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বজুড়ে গ্যাসোলিন ও জেট ফুয়েলের মজুদ বিপজ্জনকভাবে কমে যেতে পারে।

কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী আমিন নাসের জানান, ইরান যুদ্ধের পর বিশ্ব ইতোমধ্যে প্রায় ১০০ কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ হারিয়েছে। হরমুজে সমস্যা চলতে থাকলে প্রতি সপ্তাহে আরও বিপুল ঘাটতি তৈরি হতে পারে।

বর্তমানে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৬৯ হাজার কোটি ডলার। তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, এটি পর্যাপ্ত নয়।

বাড়ল পেট্রোল-ডিজেলের দাম, কূটনীতিতেও কোণঠাসা ভারত
দিল্লিতে ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে রাশিয়া ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার সাবেক ডেপুটি গভর্নর মাইকেল দেবাব্রাতা পাত্র মত দিয়েছেন যে, ভারতকে নিরাপদ অবস্থানে থাকতে হলে রিজার্ভ বাড়িয়ে অন্তত ১ লাখ কোটি ডলারে নিতে হবে।

তার মতে, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সম্ভাব্য অর্থ প্রত্যাহারের ধাক্কা সামাল দিতে বড় রিজার্ভ অত্যন্ত জরুরি।

পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের প্রভাব ভারতের মুদ্রাবাজারেও পড়েছে। ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির মান দ্রুত কমেছে।

সংঘাত শুরুর সময় যেখানে ১ ডলারের জন্য ৯১ রুপি লাগত, বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৯৫ রুপিতে পৌঁছেছে। এর ফলে আমদানির খরচ আরও বেড়েছে এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নাগরিকদের জ্বালানি সাশ্রয়ের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি মানুষকে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ কমাতে,  গণপরিবহন ব্যবহার করতে,  বাড়ি থেকে কাজ করতে,  ভোজ্য তেল ও সোনা কেনা কমাতে উৎসাহিত করেছেন।

মোদীর বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্বের বড় অংশের তেল সরবরাহকারী অঞ্চল বর্তমানে যুদ্ধ ও সংঘাতে জড়িয়ে পড়ায় ভারতকে সতর্কভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।

ভারতের জ্বালানি নীতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন রাশিয়া ও আমেরিকার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা হবে।

বাড়ল পেট্রোল-ডিজেলের দাম, কূটনীতিতেও কোণঠাসা ভারত
মুম্বাইয়ের একটি তেল শোধনাগার

যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দেশকে রাশিয়ার তেল কেনা কমানোর জন্য চাপ দিয়ে আসছে। কিন্তু ভারতের জন্য রাশিয়ার তেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ  বলেছেন, ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক দুর্বল হবে না এবং রাশিয়া ভারতের জ্বালানি স্বার্থ রক্ষা করবে।

তিনি দাবি করেন, কিছু শক্তি ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক নষ্ট করার চেষ্টা করলেও তা সফল হবে না।

গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের প্রধান অজয় শ্রীবাস্তব মনে করেন, ভারত কার্যত জ্বালানি জরুরি অবস্থার মুখে রয়েছে। তার মতে:

  • উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল সরবরাহ অনিশ্চিত,
  • রাশিয়ার তেলও মার্কিন চাপের কারণে ঝুঁকিতে,
  • যুক্তরাষ্ট্র এখনো পর্যাপ্ত বিকল্প সরবরাহ দিতে সক্ষম নয়।

তিনি বলেন, পশ্চিম এশিয়া ও রাশিয়া দুই অঞ্চলই ভারতের “লাইফলাইন”।

অন্যদিকে সাংবাদিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষক স্মিতা শর্মা মনে করেন, ভারত এখন এমন অবস্থায় নেই যে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা করতে পারে।

বাড়ল পেট্রোল-ডিজেলের দাম, কূটনীতিতেও কোণঠাসা ভারত
হরমুজ প্রণালী পার করে মুম্বাই বন্দরে আসা তেলবাহী জাহাজ ‘দেশ গরিমা’

তার মতে:

  • মার্কিন শুল্ক ভারতের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে,
  • বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপের মধ্যে,
  • বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে,
  • ফলে ভারত প্রকাশ্যে আমেরিকার বিরুদ্ধে যেতে চাইবে না।

বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বর্তমানে ব্রিকস জোটের ভেতরেও ভারত কিছুটা কূটনৈতিক চাপে রয়েছে।

রাশিয়া, চীন ও ইরানের ঘনিষ্ঠ অবস্থানের বিপরীতে ভারতকে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছাকাছি অবস্থান নিতে দেখছেন। ফলে ইরানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কেও এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে পর্যবেক্ষকদের মত।

বর্তমান পরিস্থিতি ভারতের জন্য একসঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক—দুই ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

একদিকে:

  • তেলের দাম বৃদ্ধি,
  • রুপির অবমূল্যায়ন,
  • বৈদেশিক মুদ্রার চাপ,
  • মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি

অন্যদিকে:

  • রাশিয়া-আমেরিকা ভারসাম্য,
  • পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত,
  • ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ,
  • আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থান

সব মিলিয়ে ভারত এখন এমন এক সময় পার করছে, যেখানে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং পররাষ্ট্রনীতি পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে।