ঢাকা ০৮:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১০ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
দেশের স্বার্থে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনায় প্রস্তুত সরকার: তারেক রহমান সোনার ভরিতে ৩২৬৫ ও রুপার ভরিতে ৩৫০ টাকা কমলো জাতীয় মহিলা পার্টির আহ্বায়ক নুরুন নাহার বেগম সদস্য সচিব জেসমীন নূর প্রিয়াংকা পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন প্রথম দফায় ১৫২ আসনে ভোটগ্রহণ চলছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান অবরোধে অচলাবস্থা, আলোচনায় চাপ বাড়াচ্ছে পাকিস্তান হরমুজে নৌ-সংঘাত: ইরানের হামলায় তিন জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত, আটক দুটি ১০ বছর পর তনু হত্যা রহস্যে অগ্রগতি, সাবেক সেনা সদস্য রিমান্ডে পাচারের অর্থ উদ্ধারে ১০ দেশের সঙ্গে চুক্তি প্রক্রিয়াধীন: সংসদে প্রধানমন্ত্রী ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারে টান: প্যাট্রিয়ট ও থাডের অর্ধেক প্রায় শেষ ভারত-শাসিত কাশ্মীরে যাত্রীবাহী বাস খাদে পড়ে অন্তত ২১ জনের প্রাণহানি

palanquin : ইতিহাস-ঐতিহ্যে পালকি

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১০:১৫:০২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩১ অক্টোবর ২০২২ ২৯৬ বার পড়া হয়েছে

বিলাসবহুল বাহন হিসেবেই পালকি পরিচিতি  ছিল : ছবি সংগ্রহ 

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

আঠারো শতকে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে পালকির প্রচলন শুরু হয়। ক্রমেই তা বাঙালি সমাজে যানবাহনের অন্যতম মাধ্যমে রূপ নেয়। সেসময় বিহার, উড়িষ্যা, ছোটনাগপুর এবং মধ্যদেশ থেকে পালকি বাহকরা শুষ্ক মৌসুমে বাংলায় চলে আসতে থাকে। বাংলায় আসার পর এরা বর-কনে, অভিজাত ব্যক্তিবর্গ কিংবা অসুস্থ রোগীকে চিকিৎসালয়ে বহনের কাজ নিয়োজিত হতো থাকে। এক পর্যায়ে কাহাররা এই অঞ্চলে স্থায়ী হয়। কাহার সম্প্রদায়ের পাশাপাশি বহু সাঁওতালও পালকি বাহকের কাজ করতেন, উনিশ শতকের চতুর্থ দশকে দাসপ্রথার বিলোপ ঘটে’

 

ড. বিরাজলক্ষী ঘোষ, শিক্ষাবিদ-গবেষক

আধুনিককালে পালকির ব্যবহার নেই বললেই চলে। ভারতীয় উপমহাদেশে বিবাহ অনুষ্ঠান, তীর্থযাত্রা এসব অনুষ্ঠানে পালকির ব্যবহার সীমিত আকারে দেখা যায়। প্রথমদিকে পালকিতে করে দেব-দেবীকে আরোহণ কিংবা দেবমূর্তি বহনের উদ্দেশ্যে এরূপ যানবাহন তৈরি হয় বলে ধারণা।
ভারতে প্রাচীন মন্দিরের দেওয়ালে পালকিতে দেবতাদের বহনের দৃশ্য ভাস্কর্য আকারে চিত্রিত হয়েছে। ভারত উপমহাদেশে রেলগাড়ি প্রবর্তনের আগে পর্যন্ত ইউরোপীয় উচ্চ শ্রেণির সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ও মহিলাগণ পালকিতে চলাফেরা করতেন। তবে পালকির ব্যবহার ইউরোপ, চীন ও এশিয়ার অন্যান্য দেশেও প্রচলন ছিলো।

পালকি নামটির উৎপত্তি ফারসি ও সংস্কৃত উভয় ইন্দো ভারতীয় ভাষা থেকে আর সেই সাথে ফরাসি থেকেও। পালকি সংস্কৃতে ‘পলাঙ্কিকা’। পালকির কাঠামো হচ্ছে অনেকটা কাঠের বাক্সের। দৈর্ঘ্য ৬ ফুট প্রস্থ তার অর্ধেক। লম্বাটে কাঠামোর দুপাশে বাঁশ বা কাঠের হাত লাগানো। পালকির সাইজ অনুযায়ী হাতের আকার। পালকির বাহককেই বলা হতো কাহার তথা বেহারা। আজ যারা অতীত।

বাংলার জনপ্রিয় বাহন পালকি , এখন তা হারিয়ে গিয়েছে ছবি সংগ্রহ

কাহার

কাহার পালকি বাহক। বেহারা ও কাহার একে অপরের পরিপূরক। বেহারা শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো, পালকি-বাহক, কাহার। ইংরেজি বিয়ারার (নবধৎবৎ) শব্দ থেকে বেহারা নামের উদ্ভব হয়েছে। তাছাড়া কাহার আরবী শব্দ। ফারসী ভাষায়ও শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। যার আভিধানিক অর্থ জবরদস্তকারী, জুলুমবাজ। আর হিন্দু ধর্মের তত্ত্বমতে, কাহারদের উৎপত্তি হয়েছে নিম্নবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায় থেকে এবং এই শ্রেণি ব্রাহ্মণ পিতা ও চণ্ডাল মাতার বংশোদ্ভূত এক মিশ্রবর্ণের প্রতিনিধিত্বকারী। মূলত ‘কাহার’ সম্প্রদায় অনেকটা লম্বা সময় থেকেই ইতিহাসের অংশ।

গবেষণায় পাওয়া যায়, উনিশ শতকের চতুর্থ দশকে দাসপ্রথার বিলোপ ঘটে। সেসময় বিহার, উড়িষ্যা, ছোটনাগপুর এবং মধ্যদেশ থেকে পালকি বাহকরা শুষ্ক মৌসুমে বাংলায় চলে আসতে থাকে। বাংলায় আসার পর এরা বর-কনে, অভিজাত ব্যক্তিবর্গ কিংবা অসুস্থ রোগীকে চিকিৎসালয়ে বহনের কাজ নিয়োজিত হতো থাকে। এক পর্যায়ে কাহাররা এই অঞ্চলে স্থায়ী হয়। কাহার সম্প্রদায়ের পাশাপাশি বহু সাঁওতালও পালকি বাহকের কাজ করতেন।

বাংলাদেশের সাতক্ষীরা অঞ্চলে এককালে এমন সাজানো পালকি করে নববধূকে বহন করার রীতি ছিল : ছবি সংগ্রহ

পালকির আকার ও কাহার সম্প্রদায়

বিভিন্ন আকারের পালকি নানা সাজে সজ্জিত করনা হতো। এর দুই প্রান্তে লম্বা হাত লাগানো। মাঝখানে বাক্স আকারের কাঠামোতে বর-কনে, অভিজাত কোন ব্যক্তি বা রোগীকে বহন করে নিয়ে যাওয়া হতো। পালকির আকার অনুসারে চার, ছয়, আট, বারো অথবা ষোল জন কাহার থাকতো। তারাই কাঁধে করে একটা চন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশেষ ধরণের শব্দ তুলে দ্রুত পথ অতিক্রম করতো। লম্বা পথ হলে মাঝখানে কিছুটা সময় জিরিয়ে নিতের। পালকির সরোয়ারিরাও নেমে একটু হাটাহাটি করে নিতেন। বর বা কনের পালকি বহনকারী কাহারদের উচ্চহারে পারিশ্রমিক প্রদান করা হতো। জমিদার এবং ধনবান ভূম্যধিকারীরাও বিশেষভাবে সুসজ্জিত পালকিতে চড়ে ভ্রমণে যেতেন।

যাযাবর সম্প্রদায়ের মতো কাহাররাও বাদক দলসহ দূর-দূরান্তে চলাচল করে। কখনও তাদের বর ও কনের সহগামী, আবার কখনও গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যক্তির সফরসঙ্গী হিসেবে গণ্য করা হতো। একটা সময়ে বর-কনকে পালকি ছাড়া চলাচল ভাবা যেতো না। সামাজিক মর্যাদার দিক থেকে অন্যান্য বর্ণের অনুসৃত ধর্মের মতোই কাহারদের ধর্ম। তাদের অধিকাংশই শিব বা শক্তির পূজারী। সামাজিক বিচারে কাহারগণ কুর্মি ও গোয়ালা বর্ণের সমকক্ষ।

শিল্পীর তুলিতে পালকি ও কাহারদের ছবি , সংগ্রহ

গবেষণায় দেখা যায়, অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে কাহার সম্প্রদায়ের সন্ধান পাওয়া হেলেও সংখ্যায় তা নগণ্য। ইতিহাস বলছে, জীবন-জীবিকার তাগিদে স্বপেশা ত্যাগ করে স্বচ্ছল জীবনযাপনের লক্ষে এ সম্প্রদায়ের লোকেরা বিভিন্ন পেশা জড়িয়ে গিয়েছে। কাহারদের এই প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হয়েছে।

নীহাররঞ্জন রায় প্রণীত বাঙালির ইতিহাস আদিপর্ব গ্রন্থে কাহারদের পালকি বহনের বর্ণনা পাওয়া যায়। অতীতে কনের বাড়ি থেকে বরের বাড়ি অথবা বরের বাড়ি থেকে কনের বাড়ি যাতায়াতের জন্য বেহারাদের প্রয়োজনীয়তা ছিল অনস্বীকার্য। এছাড়াও জমিদার, তালুকদার, ভূস্বামী, রাজা-বাদশা ও উচ্চবিত্তদের নিজস্ব পালকি ছিল যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম।

পথে পথে নৃত্য

সকল সম্প্রদায়ের মানুষেরই নিজস্ব বলয়ে কোন সাংস্কৃতিক প্রথা অনুসরণ করে থাকে। কাহার সম্প্রদায়ও এর ব্যতিক্রম নয়। জানা যায়, কাহারদের রয়েছে। যা কিনা নিজস্ব সংস্কৃতি-যা বাংলার সংস্কৃতির ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। এর মধ্যে পালকি নৃত্য অন্যতম। নব দম্পতিকে পালকিতে বহন করার সময় পথে পথে বেহারা পালকির হাতল কাঁধে করেই চলার পথে গা দুলিয়ে বিশেষ নৃত্য পরিবেশন করতো।

পথে পথে সেই নৃত্য শাস্ত্রীয় বর্হিভূত নৃত্য হলেও ছিলো মনোমুগ্ধকর। যা দেখতে সাধারণ মানুষ ভীড় করতো। মানুষের উপস্থিতি বেড়ে গেলে কাহারদের নৃত্যও দ্বিগুন ছন্দ পেতো। তখন পালকি বহনের কথা সে ভুলে যেতো এবং মানুষকে আনন্দ নিতে কাহার দল আরও জোরসে নৃত্য ও হাঁটা বাড়িয়ে দিতো। গায়ের পথে হলো বাড়ির বউ-ঝিরা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে যতদূর দেখা যেতা তাকিয়ে থাকতো। কাহারদের নৃত্যের আকর্ষণ শিশু-কিশোরদের অনেকটা পথ টেনে নিয়ে যেতো। আজ অতীত।

এককালে পালকি ছাড়া বিয়ে করাটা অসম্পন্ন  থাকতো, বিয়ের পর নববধূকে পালকিতে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে , এটি যেন আবহমান বাংলার রূপ :  ছবি সংগ্রহ

দেশে দেশে পালকির প্রচলন

পালকি অঞ্চল ভিত্তিক নাম এবং নক্সা ছিল। যেমন লন্ডনে পালকির পরিচয় ‘সিড্যান চেয়ার’ নামে। এধরণের পালকি একজন ব্যক্তির জন্যে একটি চেয়ার অথবা জানালা সহযোগে ক্যাবিন রাখার উপযোগী করে তৈরী করা হতো। এটি বহনে দুই বা চারজন বয়ে নিয়ে যেতো। মর্যাদাসম্পন্ন পরিবহন হিসাবে কয়েক শতক পালকির ব্যবহার ছিল এবং তাতে অবরুদ্ধ নারীগণ যাত্রী হতেন। ঊনবিংশ শতকে এসে সেই বাহন বিলুপ্ত প্রায়। রাতের বেলায়ও পালকি বহন করা হতো। সেই ক্ষেত্রে মশাল নিয়ে একজন আগে আগে পথ নির্দেশনা দিতেন। ৭০-এর দশকে উদ্যোক্তা এবং বাথউইকের অধিবাসী জন কানিংহ্যাম সংক্ষিপ্তকালের জন্য সিড্যান চেয়ারের পুণঃপ্রচলন ঘটিয়েছিলেন।

পালকি ও কাহারদের ভুলে যেতে পারেনি মানুষ, বাংলাদেশের কুষ্টিয়ায় এমন নজিরই পাওয়া গেলো, যা কিনা  শিল্পীর তুলিতে স্পষ্ট হয়ে আছে ; ছবি সংগ্রহ

চীনে পালকি

চীনে সনাতনী ধারায় সিড্যান চেয়ারের প্রচলন ছিলো। যা কিনা ভাড়া করে বিয়ের অনুষ্ঠানে ব্যবহার করা হয়। লাল সিল্ক দিয়ে মোড়ানো অবস্থায় কনেকে নিয়ে আসা হতো। হংকংয়েও সিড্যান চেয়ার ব্যবহৃত হতো। সাধারণ মানুষ এটি ব্যবহারে নিবন্ধনের প্রচলন এবং করও দিতে হতো। ব্যক্তিগত চেয়ার বা পালকি ব্যবহারকারীকে সমাজের উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হতো। সরকারী কর্মকর্তারা এ পালকিতে কত জন বেহারার দরকার হতে পারে তা নির্ধারণ করতেন।

দক্ষিণ এশিয়ায় পালকি

দক্ষিণ এশিয়ায় পালকি শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ পালঙ্ক থেকে। যার অর্থ বিছানা বা খাঁট। আনুমানিক খ্রীষ্ট-পূর্ব ২৫০ সালে রামায়ণে পালকির কথা তুলে ধরা হয়েছে। ৩০’র দশকে চাকাঁচালিত রিকশার প্রচলন ঘঠলে পালকি গুরুত্ব হারায়। ইন্দোনেশিয়ার জাভা সম্প্রদায়ে পালকির প্রচলন ছিল এবং অর্থের বিনিময়ে যাত্রীরা পালকিতে করে ভ্রমণ করতেন।

ড. বিরাজলক্ষী ঘোষ, শিক্ষাবিদ, গবেষক, লেখক, পরিবেশ সংগঠক ইসিএম ও সৌহার্দ্যরে সাধারণ সম্পাদক

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

palanquin : ইতিহাস-ঐতিহ্যে পালকি

আপডেট সময় : ১০:১৫:০২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩১ অক্টোবর ২০২২

আঠারো শতকে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে পালকির প্রচলন শুরু হয়। ক্রমেই তা বাঙালি সমাজে যানবাহনের অন্যতম মাধ্যমে রূপ নেয়। সেসময় বিহার, উড়িষ্যা, ছোটনাগপুর এবং মধ্যদেশ থেকে পালকি বাহকরা শুষ্ক মৌসুমে বাংলায় চলে আসতে থাকে। বাংলায় আসার পর এরা বর-কনে, অভিজাত ব্যক্তিবর্গ কিংবা অসুস্থ রোগীকে চিকিৎসালয়ে বহনের কাজ নিয়োজিত হতো থাকে। এক পর্যায়ে কাহাররা এই অঞ্চলে স্থায়ী হয়। কাহার সম্প্রদায়ের পাশাপাশি বহু সাঁওতালও পালকি বাহকের কাজ করতেন, উনিশ শতকের চতুর্থ দশকে দাসপ্রথার বিলোপ ঘটে’

 

ড. বিরাজলক্ষী ঘোষ, শিক্ষাবিদ-গবেষক

আধুনিককালে পালকির ব্যবহার নেই বললেই চলে। ভারতীয় উপমহাদেশে বিবাহ অনুষ্ঠান, তীর্থযাত্রা এসব অনুষ্ঠানে পালকির ব্যবহার সীমিত আকারে দেখা যায়। প্রথমদিকে পালকিতে করে দেব-দেবীকে আরোহণ কিংবা দেবমূর্তি বহনের উদ্দেশ্যে এরূপ যানবাহন তৈরি হয় বলে ধারণা।
ভারতে প্রাচীন মন্দিরের দেওয়ালে পালকিতে দেবতাদের বহনের দৃশ্য ভাস্কর্য আকারে চিত্রিত হয়েছে। ভারত উপমহাদেশে রেলগাড়ি প্রবর্তনের আগে পর্যন্ত ইউরোপীয় উচ্চ শ্রেণির সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ও মহিলাগণ পালকিতে চলাফেরা করতেন। তবে পালকির ব্যবহার ইউরোপ, চীন ও এশিয়ার অন্যান্য দেশেও প্রচলন ছিলো।

পালকি নামটির উৎপত্তি ফারসি ও সংস্কৃত উভয় ইন্দো ভারতীয় ভাষা থেকে আর সেই সাথে ফরাসি থেকেও। পালকি সংস্কৃতে ‘পলাঙ্কিকা’। পালকির কাঠামো হচ্ছে অনেকটা কাঠের বাক্সের। দৈর্ঘ্য ৬ ফুট প্রস্থ তার অর্ধেক। লম্বাটে কাঠামোর দুপাশে বাঁশ বা কাঠের হাত লাগানো। পালকির সাইজ অনুযায়ী হাতের আকার। পালকির বাহককেই বলা হতো কাহার তথা বেহারা। আজ যারা অতীত।

বাংলার জনপ্রিয় বাহন পালকি , এখন তা হারিয়ে গিয়েছে ছবি সংগ্রহ

কাহার

কাহার পালকি বাহক। বেহারা ও কাহার একে অপরের পরিপূরক। বেহারা শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো, পালকি-বাহক, কাহার। ইংরেজি বিয়ারার (নবধৎবৎ) শব্দ থেকে বেহারা নামের উদ্ভব হয়েছে। তাছাড়া কাহার আরবী শব্দ। ফারসী ভাষায়ও শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। যার আভিধানিক অর্থ জবরদস্তকারী, জুলুমবাজ। আর হিন্দু ধর্মের তত্ত্বমতে, কাহারদের উৎপত্তি হয়েছে নিম্নবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায় থেকে এবং এই শ্রেণি ব্রাহ্মণ পিতা ও চণ্ডাল মাতার বংশোদ্ভূত এক মিশ্রবর্ণের প্রতিনিধিত্বকারী। মূলত ‘কাহার’ সম্প্রদায় অনেকটা লম্বা সময় থেকেই ইতিহাসের অংশ।

গবেষণায় পাওয়া যায়, উনিশ শতকের চতুর্থ দশকে দাসপ্রথার বিলোপ ঘটে। সেসময় বিহার, উড়িষ্যা, ছোটনাগপুর এবং মধ্যদেশ থেকে পালকি বাহকরা শুষ্ক মৌসুমে বাংলায় চলে আসতে থাকে। বাংলায় আসার পর এরা বর-কনে, অভিজাত ব্যক্তিবর্গ কিংবা অসুস্থ রোগীকে চিকিৎসালয়ে বহনের কাজ নিয়োজিত হতো থাকে। এক পর্যায়ে কাহাররা এই অঞ্চলে স্থায়ী হয়। কাহার সম্প্রদায়ের পাশাপাশি বহু সাঁওতালও পালকি বাহকের কাজ করতেন।

বাংলাদেশের সাতক্ষীরা অঞ্চলে এককালে এমন সাজানো পালকি করে নববধূকে বহন করার রীতি ছিল : ছবি সংগ্রহ

পালকির আকার ও কাহার সম্প্রদায়

বিভিন্ন আকারের পালকি নানা সাজে সজ্জিত করনা হতো। এর দুই প্রান্তে লম্বা হাত লাগানো। মাঝখানে বাক্স আকারের কাঠামোতে বর-কনে, অভিজাত কোন ব্যক্তি বা রোগীকে বহন করে নিয়ে যাওয়া হতো। পালকির আকার অনুসারে চার, ছয়, আট, বারো অথবা ষোল জন কাহার থাকতো। তারাই কাঁধে করে একটা চন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশেষ ধরণের শব্দ তুলে দ্রুত পথ অতিক্রম করতো। লম্বা পথ হলে মাঝখানে কিছুটা সময় জিরিয়ে নিতের। পালকির সরোয়ারিরাও নেমে একটু হাটাহাটি করে নিতেন। বর বা কনের পালকি বহনকারী কাহারদের উচ্চহারে পারিশ্রমিক প্রদান করা হতো। জমিদার এবং ধনবান ভূম্যধিকারীরাও বিশেষভাবে সুসজ্জিত পালকিতে চড়ে ভ্রমণে যেতেন।

যাযাবর সম্প্রদায়ের মতো কাহাররাও বাদক দলসহ দূর-দূরান্তে চলাচল করে। কখনও তাদের বর ও কনের সহগামী, আবার কখনও গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যক্তির সফরসঙ্গী হিসেবে গণ্য করা হতো। একটা সময়ে বর-কনকে পালকি ছাড়া চলাচল ভাবা যেতো না। সামাজিক মর্যাদার দিক থেকে অন্যান্য বর্ণের অনুসৃত ধর্মের মতোই কাহারদের ধর্ম। তাদের অধিকাংশই শিব বা শক্তির পূজারী। সামাজিক বিচারে কাহারগণ কুর্মি ও গোয়ালা বর্ণের সমকক্ষ।

শিল্পীর তুলিতে পালকি ও কাহারদের ছবি , সংগ্রহ

গবেষণায় দেখা যায়, অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে কাহার সম্প্রদায়ের সন্ধান পাওয়া হেলেও সংখ্যায় তা নগণ্য। ইতিহাস বলছে, জীবন-জীবিকার তাগিদে স্বপেশা ত্যাগ করে স্বচ্ছল জীবনযাপনের লক্ষে এ সম্প্রদায়ের লোকেরা বিভিন্ন পেশা জড়িয়ে গিয়েছে। কাহারদের এই প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হয়েছে।

নীহাররঞ্জন রায় প্রণীত বাঙালির ইতিহাস আদিপর্ব গ্রন্থে কাহারদের পালকি বহনের বর্ণনা পাওয়া যায়। অতীতে কনের বাড়ি থেকে বরের বাড়ি অথবা বরের বাড়ি থেকে কনের বাড়ি যাতায়াতের জন্য বেহারাদের প্রয়োজনীয়তা ছিল অনস্বীকার্য। এছাড়াও জমিদার, তালুকদার, ভূস্বামী, রাজা-বাদশা ও উচ্চবিত্তদের নিজস্ব পালকি ছিল যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম।

পথে পথে নৃত্য

সকল সম্প্রদায়ের মানুষেরই নিজস্ব বলয়ে কোন সাংস্কৃতিক প্রথা অনুসরণ করে থাকে। কাহার সম্প্রদায়ও এর ব্যতিক্রম নয়। জানা যায়, কাহারদের রয়েছে। যা কিনা নিজস্ব সংস্কৃতি-যা বাংলার সংস্কৃতির ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। এর মধ্যে পালকি নৃত্য অন্যতম। নব দম্পতিকে পালকিতে বহন করার সময় পথে পথে বেহারা পালকির হাতল কাঁধে করেই চলার পথে গা দুলিয়ে বিশেষ নৃত্য পরিবেশন করতো।

পথে পথে সেই নৃত্য শাস্ত্রীয় বর্হিভূত নৃত্য হলেও ছিলো মনোমুগ্ধকর। যা দেখতে সাধারণ মানুষ ভীড় করতো। মানুষের উপস্থিতি বেড়ে গেলে কাহারদের নৃত্যও দ্বিগুন ছন্দ পেতো। তখন পালকি বহনের কথা সে ভুলে যেতো এবং মানুষকে আনন্দ নিতে কাহার দল আরও জোরসে নৃত্য ও হাঁটা বাড়িয়ে দিতো। গায়ের পথে হলো বাড়ির বউ-ঝিরা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে যতদূর দেখা যেতা তাকিয়ে থাকতো। কাহারদের নৃত্যের আকর্ষণ শিশু-কিশোরদের অনেকটা পথ টেনে নিয়ে যেতো। আজ অতীত।

এককালে পালকি ছাড়া বিয়ে করাটা অসম্পন্ন  থাকতো, বিয়ের পর নববধূকে পালকিতে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে , এটি যেন আবহমান বাংলার রূপ :  ছবি সংগ্রহ

দেশে দেশে পালকির প্রচলন

পালকি অঞ্চল ভিত্তিক নাম এবং নক্সা ছিল। যেমন লন্ডনে পালকির পরিচয় ‘সিড্যান চেয়ার’ নামে। এধরণের পালকি একজন ব্যক্তির জন্যে একটি চেয়ার অথবা জানালা সহযোগে ক্যাবিন রাখার উপযোগী করে তৈরী করা হতো। এটি বহনে দুই বা চারজন বয়ে নিয়ে যেতো। মর্যাদাসম্পন্ন পরিবহন হিসাবে কয়েক শতক পালকির ব্যবহার ছিল এবং তাতে অবরুদ্ধ নারীগণ যাত্রী হতেন। ঊনবিংশ শতকে এসে সেই বাহন বিলুপ্ত প্রায়। রাতের বেলায়ও পালকি বহন করা হতো। সেই ক্ষেত্রে মশাল নিয়ে একজন আগে আগে পথ নির্দেশনা দিতেন। ৭০-এর দশকে উদ্যোক্তা এবং বাথউইকের অধিবাসী জন কানিংহ্যাম সংক্ষিপ্তকালের জন্য সিড্যান চেয়ারের পুণঃপ্রচলন ঘটিয়েছিলেন।

পালকি ও কাহারদের ভুলে যেতে পারেনি মানুষ, বাংলাদেশের কুষ্টিয়ায় এমন নজিরই পাওয়া গেলো, যা কিনা  শিল্পীর তুলিতে স্পষ্ট হয়ে আছে ; ছবি সংগ্রহ

চীনে পালকি

চীনে সনাতনী ধারায় সিড্যান চেয়ারের প্রচলন ছিলো। যা কিনা ভাড়া করে বিয়ের অনুষ্ঠানে ব্যবহার করা হয়। লাল সিল্ক দিয়ে মোড়ানো অবস্থায় কনেকে নিয়ে আসা হতো। হংকংয়েও সিড্যান চেয়ার ব্যবহৃত হতো। সাধারণ মানুষ এটি ব্যবহারে নিবন্ধনের প্রচলন এবং করও দিতে হতো। ব্যক্তিগত চেয়ার বা পালকি ব্যবহারকারীকে সমাজের উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হতো। সরকারী কর্মকর্তারা এ পালকিতে কত জন বেহারার দরকার হতে পারে তা নির্ধারণ করতেন।

দক্ষিণ এশিয়ায় পালকি

দক্ষিণ এশিয়ায় পালকি শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ পালঙ্ক থেকে। যার অর্থ বিছানা বা খাঁট। আনুমানিক খ্রীষ্ট-পূর্ব ২৫০ সালে রামায়ণে পালকির কথা তুলে ধরা হয়েছে। ৩০’র দশকে চাকাঁচালিত রিকশার প্রচলন ঘঠলে পালকি গুরুত্ব হারায়। ইন্দোনেশিয়ার জাভা সম্প্রদায়ে পালকির প্রচলন ছিল এবং অর্থের বিনিময়ে যাত্রীরা পালকিতে করে ভ্রমণ করতেন।

ড. বিরাজলক্ষী ঘোষ, শিক্ষাবিদ, গবেষক, লেখক, পরিবেশ সংগঠক ইসিএম ও সৌহার্দ্যরে সাধারণ সম্পাদক