দেশে চিনির ব্যবহার প্রায় ৩৩ শতাংশ কমেছে সক্ষমতার অর্ধেক উৎপাদনে বেসরকারি মিল
- আপডেট সময় : ০৫:৫৩:০১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ২০ বার পড়া হয়েছে
২৭ লাখ ৬৭ হাজার টন, ২০২৫-২৬ মৌসুমে তা কমে ১৮ লাখ ৬৩ হাজার টনে দাঁড়াতে পারে
ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার ও মূল্যস্ফীতির প্রভাব; সক্ষমতার অর্ধেক উৎপাদন করছে বেসরকারি মিল
বাংলাদেশে গত পাঁচ বছরে চিনির ব্যবহার কমেছে প্রায় ৩৩ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) হিসাবে, ২০২১-২২ বিপণন মৌসুমে দেশে চিনির ব্যবহার ছিল ২৭ লাখ ৬৭ হাজার টন। ২০২৫-২৬ মৌসুমে তা কমে ১৮ লাখ ৬৩ হাজার টনে দাঁড়াতে পারে। স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও ফ্যাটি লিভারের মতো অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি এবং দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতিকে এ প্রবণতার প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রধান চিনি ভোক্তা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে চিনির ব্যবহার কমার হার সবচেয়ে বেশি।
আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (আইডিএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে বাংলাদেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ছিল ৮৪ লাখ। ২০২৪ সালে তা বেড়ে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখে দাঁড়িয়েছে, যা প্রায় ৬৫ শতাংশ বেশি। বর্তমানে ২০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের ১৩ দশমিক ২ শতাংশ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। তাদের মধ্যে ৩৯ দশমিক ১ শতাংশ বা প্রায় ৫৪ লাখ ২৬ হাজার মানুষের রোগ শনাক্ত হয়নি। চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ২০ হাজার শিশু ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।
ডায়াবেটিস শনাক্ত হওয়ার পর খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করছেন অনেকেই। রাজধানীর মধ্য বাড্ডার বাসিন্দা ও একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী শ্রেয়সী মজুমদারের ডায়াবেটিস ধরা পড়ে ২০২৫ সালে। এরপর থেকে তিনি চিনি এড়িয়ে চলা, আঁশসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ এবং হাঁটাচলার অভ্যাস গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এমএস জহিরুল হক চৌধুরী বলেন, দেশে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের রোগী বাড়ছে। এসব রোগের সঙ্গে স্থূলতার সম্পর্ক রয়েছে। অতিরিক্ত চিনি ও পরিশোধিত শর্করা গ্রহণে শরীরে চর্বি জমা এবং স্থূলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এসব রোগের ঝুঁকি কমাতে প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অতিরিক্ত চিনি-লবণ গ্রহণ কমানোর পাশাপাশি শারীরিক পরিশ্রম ও ওজন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দিতে হবে।
ডায়াবেটিসের পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ ও ফ্যাটি লিভারের প্রকোপও বাড়ছে। বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপের (বিডিএইচএস) ২০১৭-১৮ সালের প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তের হার প্রায় ৪০ শতাংশ। ২০১১ সালে এ হার ছিল ২৬ শতাংশ। ২০১৭-১৮ সালের জরিপে নারীদের মধ্যে এ হার ৪৫ শতাংশ এবং পুরুষদের মধ্যে ৩৪ শতাংশ। ২০১১ সালে যথাক্রমে এ হার ছিল ৩২ ও ১৯ শতাংশ। জরিপের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৪০ সালের মধ্যে দেশে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৬০ লাখে পৌঁছতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে হৃদরোগজনিত অসুস্থতায় ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এসব মৃত্যুর ৫২ শতাংশের জন্য উচ্চ রক্তচাপ দায়ী বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ হেপাটোলজি সোসাইটির গবেষণা অনুযায়ী, দেশে প্রতি তিনজনের একজন ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত। তাদের মধ্যে প্রায় এক কোটি মানুষ সিরোসিসের ঝুঁকিতে রয়েছেন। অতিরিক্ত ওজন, পেটের মেদ, ডায়াবেটিস, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও শরীরচর্চার অভাব এ ঝুঁকি বাড়ায়।
পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুষ্টিবিদ নিশাত শারমিন নিশি বলেন, অতিরিক্ত চিনি ও পরিশোধিত শর্করা গ্রহণে ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ছে। প্রক্রিয়াজাত ও রেস্তোরাঁর খাবারে অতিরিক্ত ক্যালরি এবং সরাসরি চিনির পাশাপাশি লুকানো চিনিও থাকতে পারে। তাই চা বা রান্নায় চিনি কমানোর পাশাপাশি বিস্কুট, বেকারি পণ্য, কোমল পানীয় ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের দিকেও নজর দিতে হবে।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক এ কে আজাদ খান বলেন, এসব রোগ নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে কাজ করছে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি। সরকারও বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন জরুরি।
স্বাস্থ্যসচেতনতার প্রভাব পড়েছে চায়ের সঙ্গে চিনির ব্যবহারেও। টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও ইস্পাহানি গ্রুপের চা বিভাগের প্রধান শাহ মঈনুদ্দিন হাসান বলেন, স্বাস্থ্যগত কারণে চায়ে চিনি না মেশানোর প্রবণতা বেড়েছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের মধ্যে চিনি ছাড়া লিকার চা পান করার অভ্যাস বাড়ছে। বাংলাদেশীয় চা সংসদের সভাপতি কামরান তানভিরুর রহমানের মতে, দেশে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক কাপ চা পান করা হয়। প্রতি কাপ চায়ে চিনির ব্যবহার সামান্য কমলেও বছর শেষে মোট ভোগে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে চিনির ব্যবহার কমার পেছনে শুধু স্বাস্থ্যগত কারণই নয়, মূল্যস্ফীতির প্রভাবও রয়েছে। বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, কভিড-১৯ মহামারীর পর বিশ্ববাজারে চিনির মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং আখ থেকে জৈব জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধির প্রভাব বাংলাদেশের বাজারেও পড়েছে। একই সময়ে চাল, ডাল, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। ফলে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো মিষ্টি ও অন্যান্য চিনিজাতীয় খাবারে ব্যয় কমিয়েছে।
ইউএসডিএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ মৌসুমে দেশে চিনির ব্যবহার ছিল ২২ লাখ ৩৭ হাজার টন। ২০২৩-২৪ মৌসুমে তা কমে ২০ লাখ ৪৫ হাজার টন এবং ২০২৪-২৫ মৌসুমে ১৮ লাখ ৯০ হাজার টনে দাঁড়ায়। ২০২৫-২৬ মৌসুমে ব্যবহার আরও কমে ১৮ লাখ ৬৩ হাজার টন হতে পারে।
চিনির চাহিদা কমার পাশাপাশি সরকারি চিনিকলগুলো উৎপাদন সংকট ও লোকসানে রয়েছে। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) তথ্য অনুযায়ী, একসময় রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোতে বছরে প্রায় দুই লাখ টন চিনি উৎপাদিত হতো। ২০১৯-২০ মৌসুমে ১৫টি চিনিকলে উৎপাদন হয়েছিল ৮২ হাজার টনের বেশি। ২০২২-২৩ মৌসুমে তা কমে ২১ হাজার ৩১৪ টনে নেমে আসে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ মৌসুমে নয়টি মিলে উৎপাদন হয়েছে ৪৩ হাজার ৩২৬ টন।
বিএসএফআইসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লোকসান হয়েছে প্রায় ৪৭৭ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এ লোকসান ছিল প্রায় ৫৫৫ কোটি টাকা। কারখানার অদক্ষতা ও নির্ধারিত সময়ে আখ কেনার অর্থ ছাড়ে বিলম্বকে লোকসানের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারি কারখানাগুলোতে প্রতি কেজি চিনির উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৩০০ টাকা, যেখানে খুচরা বিক্রয়মূল্য প্রায় ১২৫ টাকা।
অন্যদিকে দেশের প্রায় ৯৭ শতাংশ চিনির সরবরাহ আসে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে। গত এক দশকে চাহিদা বৃদ্ধির প্রত্যাশায় এসব প্রতিষ্ঠান উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ালেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চাহিদা কমায় উৎপাদন কমাতে হচ্ছে।
বেসরকারি চিনি উৎপাদক মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের উপমহাব্যবস্থাপক তাসলিম শাহরিয়ার বলেন, স্বাস্থ্যগত সচেতনতা ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় চিনির ব্যবহার হ্রাস পেয়েছে। ডায়াবেটিসের মতো রোগের হার বৃদ্ধি এবং চায়ে চিনি না খাওয়ার প্রবণতার পাশাপাশি মিষ্টিজাতীয় পণ্য কেনা কমে যাওয়ায় চিনির বহুমুখী ব্যবহারে প্রভাব পড়ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার টন হলেও বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় আড়াই হাজার টন।
সব মিলিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ও ক্রয়ক্ষমতার সংকোচন দেশের চিনির বাজারে বড় পরিবর্তন আনছে। এতে একদিকে অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ কমানোর স্বাস্থ্যগত প্রবণতা দৃশ্যমান হচ্ছে, অন্যদিকে উৎপাদন সক্ষমতা, বাজারের চাহিদা ও শিল্পের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।



















