বিশ্বজুড়ে প্রবৃদ্ধি কমার পূর্বাভাস, মূল্যস্ফীতি ৪.৭ শতাংশে ওঠার শঙ্কা আইএমএফের
- আপডেট সময় : ১১:২২:৪০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ২১ বার পড়া হয়েছে
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি সংকট ও বাণিজ্য উত্তেজনায় বাড়ছে অনিশ্চয়তা; ২০২৭ সালে প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়ার আশা
বিশ্ব অর্থনীতিতে চলতি বছর প্রবৃদ্ধির গতি কমে ৩ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। একই সময়ে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা করছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে উত্তেজনা এবং সরকারি ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপ বিশ্ব অর্থনীতির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। তবে ২০২৭ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতিও কমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
আইএমএফের অক্টোবর ২০২৬-এর ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে বিশ্ব অর্থনীতির এমন চিত্র উঠে এসেছে। ‘রেজিলিয়েন্স আন্ডার স্ট্রেইন, আর্জেন্ট চয়েসেস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ১ শতাংশে সীমিত থাকতে পারে। পরের বছর তা বেড়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, চলতি বছরের ৪ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ২০২৭ সালে কমে ৪ দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
আইএমএফের মূল্যায়নে, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও বিশ্ব অর্থনীতি এখন পর্যন্ত স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে। প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ, সরবরাহব্যবস্থার অভিযোজন এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে ভূমিকা রাখছে। তবে এই স্থিতিস্থাপকতার সুফল সব দেশ সমানভাবে পাচ্ছে না। প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের সুবিধা পাওয়া অর্থনীতিগুলো তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকলেও জ্বালানি আমদানিনির্ভর ও প্রযুক্তি খাতে কম সম্পৃক্ত দেশগুলোকে বাড়তি চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলেও দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের ও আর্থিকভাবে দুর্বল দেশগুলোতে জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বড় ঝুঁকি
বিশ্ব অর্থনীতির সামনে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত। আইএমএফের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সংঘাতের পূর্ণ প্রভাব এখনো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হয়নি। বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ, সরবরাহব্যবস্থায় পরিবর্তন, মজুতের ব্যবহার এবং জ্বালানির কার্যকর ব্যবস্থাপনা তাৎক্ষণিক চাপ সামলাতে সহায়তা করেছে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি ধরে রাখতে ভূমিকা রাখছে।
তবে এই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে কিংবা জ্বালানি উৎপাদন ও পরিবহনে নতুন করে বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যেতে পারে। এতে শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও পণ্য সরবরাহের ব্যয় বাড়বে। উৎপাদন খরচের এই বৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত পণ্য ও সেবার বাজারদরে প্রতিফলিত হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। জ্বালানি কিনতে অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হলে এসব দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ও মুদ্রার বিনিময় হারের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে সরকারের ভর্তুকি ও অন্যান্য ব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং জনকল্যাণমূলক খাতে অর্থ বরাদ্দের ওপর।
নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে বাড়বে চাপ
জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে নিম্ন আয়ের ও অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ওপর। এসব দেশের মানুষের আয়ের বড় অংশ খাদ্য, পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনায় ব্যয় হয়। ফলে এসব পণ্যের দাম বাড়লে পরিবারের অন্যান্য খাতে ব্যয় করার সক্ষমতা কমে যায়।
একই সঙ্গে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতেও চাপ তৈরি হতে পারে। এতে ব্যবসার খরচ বাড়বে, বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যেতে পারে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফলও সীমিত হয়ে পড়তে পারে।
আর্থিক সক্ষমতা সীমিত এমন দেশগুলোর সরকারের জন্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়া আরও কঠিন। একদিকে জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়বে, অন্যদিকে ভর্তুকি ও সামাজিক সহায়তা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের মতো জ্বালানি ও বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল আমদানিনির্ভর অর্থনীতির ক্ষেত্রেও এ ধরনের বৈশ্বিক পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে আমদানি ব্যয়, উৎপাদন খরচ এবং অভ্যন্তরীণ বাজারদরে চাপ তৈরি হতে পারে। তবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে জ্বালানির আন্তর্জাতিক মূল্য, সরবরাহ পরিস্থিতি, বিনিময় হার এবং নীতিগত ব্যবস্থাপনার ওপর।
বিশ্ব বাণিজ্যেও মন্দার আশঙ্কা
বিশ্ব অর্থনীতির আরেকটি বড় উদ্বেগের জায়গা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যবিরোধ, শুল্ক বৃদ্ধি এবং উৎপাদনব্যবস্থায় পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধির গতি ধীর হতে পারে। ২০২৭ সালে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও বাণিজ্য উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে পণ্য উৎপাদন, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বাড়লে রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। বিদেশি বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, শুল্কের কারণে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া এবং সরবরাহব্যবস্থায় পরিবর্তন রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। এতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সরকারি ঋণ বাড়াচ্ছে উদ্বেগ
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বড় অর্থনীতিগুলোতে ঋণ নেওয়ার ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি বয়স্ক জনগোষ্ঠীর পেছনে ব্যয়, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো খাতে সরকারের অর্থের চাহিদা বাড়ছে।
এ অবস্থায় নতুন কোনো অর্থনৈতিক বা ভূরাজনৈতিক সংকট দেখা দিলে তা মোকাবিলায় অনেক সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়তে পারে। ঋণের সুদ পরিশোধে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হলে উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যয়ের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা, দুই ক্ষেত্রেই সরকারকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা, সাইবার আক্রমণ ও চরম আবহাওয়ার ঘটনাও বৈশ্বিক অর্থনীতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে সতর্ক করেছে আইএমএফ। এসব কারণে উৎপাদন ও পরিবহনব্যবস্থা ব্যাহত হলে সরবরাহ কমে গিয়ে পণ্যের দাম বাড়তে পারে। এতে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
নীতিগত সিদ্ধান্তই হবে গুরুত্বপূর্ণ
আইএমএফের পূর্বাভাসে ২০২৭ সালে প্রবৃদ্ধি বাড়া ও মূল্যস্ফীতি কমার সম্ভাবনা থাকলেও তা নিশ্চিত নয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্যনীতি ও আর্থিক বাজারের পরিস্থিতির ওপর বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে।
এ পরিস্থিতিতে দেশগুলোর জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, সরকারি ঋণের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে জ্বালানির বিকল্প উৎস, সরবরাহব্যবস্থার সক্ষমতা ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
সব মিলিয়ে, বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা সামলে এগিয়ে চললেও প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ২০২৭ সালে পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা কাটবে কি না, তার ওপরই নির্ভর করবে সেই পূর্বাভাসের বাস্তবায়ন।



















