কর ফাঁকির চেষ্টায় কোনো কমতি রাখেনি গ্রামীণ কল্যাণ: হাই কোর্ট
- আপডেট সময় : ১০:২৪:১৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ২৭ বার পড়া হয়েছে
রায়ের পর্যবেক্ষণে কর্মকাণ্ডকে প্রতিষ্ঠানটির এমন কর্মকাণ্ডকে ‘কর ফাঁকি দেওয়ার ধ্রুপদী নজির’ (ক্লাসিক কেস অব ইভেডিং ট্যাক্সেস) হিসেবে অভিহিত করেছেন
বকেয়া করের পরিমাণ প্রায় ৬৬৭ কোটি টাকা
গ্রামীণ টেলিকমের কাছ থেকে পাওয়া অর্থকে লভ্যাংশ বা ডিভিডেন্ড হিসেবে দেখিয়ে সরকারকে ন্যায্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টায় কোনো কমতি রাখেনি গ্রামীণ কল্যাণ। পূর্ণাঙ্গ রায়ে এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাই কোর্ট। আদালত প্রতিষ্ঠানটির এ কর্মকাণ্ডকে ‘কর ফাঁকি দেওয়ার ধ্রুপদী নজির’ (ক্লাসিক কেস অব ইভেডিং ট্যাক্সেস) হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সোমবার প্রকাশিত রায়ের পর্যবেক্ষণে এসব কথা বলা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আব্দুস সামাদ আজাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ-সংক্রান্ত কর বিরোধে পাঁচ করবর্ষে মোট ৬৬৬ কোটি ৯১ লাখ ৫২ হাজার ৩৭০ টাকা বকেয়া কর দাবি করা হয়েছে।
২০১২-১৩ করবর্ষে ১৮৯ কোটি ২৫ লাখ ২৫ হাজার ৪৬৬ টাকা, ২০১৩-১৪ করবর্ষে ১৩২ কোটি ৭৭ লাখ ৪৬ হাজার ১২ টাকা, ২০১৪-১৫ করবর্ষে ১১৪ কোটি ২ লাখ ৮২ হাজার ৫৭৪ টাকা, ২০১৫-১৬ করবর্ষে ১১৫ কোটি ২২ লাখ ৯৬ হাজার ৬২৫ টাকা এবং ২০১৬-১৭ করবর্ষে ১১৫ কোটি ৬৩ লাখ ১ হাজার ৬৯৩ টাকা কর দাবি করা হয়েছে।
প্রকাশিত ৩২ ও ১৫ পৃষ্ঠার পৃথক দুটি রায়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) বকেয়া কর আদায়ে ডিমান্ড নোটিস জারি করে তা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে এ বিষয়ে আগে দেওয়া স্থগিতাদেশও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
গত ১০ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। রায় দুটি লিখেছেন বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া।
১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ কল্যাণ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ পরিবারের একটি প্রতিষ্ঠান। মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিষ্ঠানটির সাবেক চেয়ারম্যান।
মামলার নথি অনুযায়ী, গ্রামীণ কল্যাণ কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ২৮ ধারার অধীনে গঠিত একটি প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে অনুদান ও ঋণ হিসেবে পাওয়া ৩২০ কোটি ১৮ লাখ ৫৪ হাজার ৪০৪ টাকার তহবিল নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি গঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে গ্রামীণ টেলিকমের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগ চুক্তিতে যায় প্রতিষ্ঠানটি।
রায়ের পর্যবেক্ষণে হাই কোর্ট বলেছেন, ২০১১ সালের চুক্তি অনুযায়ী গ্রামীণ কল্যাণ গ্রামীণফোনের কোনো শেয়ারহোল্ডার নয়। ফলে গ্রামীণফোনের শেয়ারে বিনিয়োগের বিপরীতে গ্রামীণ টেলিকমের কাছ থেকে পাওয়া ৪২ দশমিক ৬৫ শতাংশ অর্থকে লভ্যাংশ হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই।
২০১১ সালের ১৩ এপ্রিল গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ টেলিকমের মধ্যে স্বাক্ষরিত ইক্যুইটি পার্টিসিপেশন এগ্রিমেন্টের দ্বিতীয় শর্তের উল্লেখ করে আদালত বলেন, গ্রামীণ কল্যাণ গ্রামীণফোনের কোনো শেয়ার দাবি করতে পারবে না। তাই চুক্তির আওতায় পাওয়া অর্থকে গ্রামীণ কল্যাণের ‘অন্যান্য খাতের আয়’ হিসেবে বিবেচনা করে সাধারণ হারে কর আরোপ করা আইনসম্মত।
রায়ে আরও বলা হয়, গ্রামীণ টেলিকমের দেওয়া অর্থের ওপর গ্রামীণ কল্যাণের নামে উৎসে কর কর্তনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একইভাবে গ্রামীণ কল্যাণের নামে সরকারি কোষাগারে কর জমা দেওয়ার বৈধ চালানও পাওয়া যায়নি। গ্রামীণ টেলিকমের নামে থাকা চালান দেখিয়ে গ্রামীণ কল্যাণ নিজেদের কর পরিশোধের দাবি করতে পারে না।
গ্রামীণ কল্যাণের দায়ের করা আগের একটি মামলার প্রসঙ্গও রায়ে তুলে ধরেছেন হাই কোর্ট। আদালত বলেন, ২০১৭-১৮ করবর্ষের ক্ষেত্রেও কর কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট অর্থকে ‘অন্যান্য খাতের আয়’ হিসেবে নির্ধারণ করেছিল। এর বিরুদ্ধে গ্রামীণ কল্যাণ হাই কোর্টে রেফারেন্স মামলা করলেও পরে তা আর পরিচালনা না করার আবেদন করে। ওই মামলা ২০২৩ সালের ৯ নভেম্বর খারিজ হয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ করবর্ষে সংশ্লিষ্ট আয়কে অন্যান্য খাতের আয় হিসেবে মেনে নেওয়ার পরও আগের করবর্ষগুলোর কর দিতে না চাওয়ার বিষয়টি সাংঘর্ষিক।
রায়ে বলা হয়েছে, এটি গ্রামীণ কল্যাণের কর ফাঁকি দেওয়ার একটি ধ্রুপদী উদাহরণ। প্রতিষ্ঠানটি মীমাংসিত একটি বিষয়কে দীর্ঘায়িত করে সরকারকে তার ন্যায্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টায় কোনো কমতি রাখেনি।
আদালত আরও বলেছেন, নথিপত্র ও প্রতিষ্ঠিত আইনের আলোকে গ্রামীণ কল্যাণের পক্ষে দাঁড়ানোর মতো কোনো যুক্তি নেই।
এদিকে, গ্রামীণ কল্যাণের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, হাই কোর্টের রায়ের পরপরই তা স্থগিত চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। রায়ের প্রত্যায়িত অনুলিপির জন্যও আবেদন করা হয়েছে। অনুলিপি পাওয়ার পর লিভ টু আপিল দায়ের করা হবে।

















