তিস্তা মহাপরিকল্পনা নতুন করে আলোচনা, চীন সফরে গুরুত্ব পাচ্ছে ইস্যুটি
- আপডেট সময় : ০১:৫৮:৩৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬ ৩০ বার পড়া হয়েছে
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার আড়াই মাসের মাথায় প্রথমবারের মতো চীন সফরে গেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তিন দিনের এই রাষ্ট্রীয় সফরে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা থাকলেও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তিস্তার পানি বণ্টন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অমীমাংসিত একটি ইস্যু। ২০১১ সালে দুই দেশ একটি চুক্তির খসড়ায় একমত হলেও সেটি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে শুষ্ক মৌসুমে ভারত পানি আটকে রাখায় বাংলাদেশের তিস্তা অংশে খরা দেখা দেয়। অন্যদিকে বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেওয়ায় বন্যা ও নদীভাঙনের মতো সমস্যা তৈরি হয়। রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারীসহ তিস্তা তীরবর্তী অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এ নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ কয়েক বছর আগে চীনের সহায়তায় ‘কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট’ নামে একটি মহাপরিকল্পনা হাতে নেয়। ২০১৬ সালে প্রকল্পটির প্রাথমিক সমীক্ষা শুরু হয় এবং ২০২৩ সালে মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।
মহাপরিকল্পনার মূল অংশ হচ্ছে বাংলাদেশ অংশের উজানে একটি বহুমুখী ব্যারেজ নির্মাণ। পাশাপাশি ১০২ কিলোমিটার নদী খনন করে গভীরতা বৃদ্ধি, নদীর দুই তীরে ২০৩ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ, ১৭১ বর্গকিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধার এবং নদীতীরকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

এছাড়া স্যাটেলাইট শহর, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও ১৫০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কথাও বলা হয়েছে। প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশ ঋণ সহায়তার মাধ্যমে আসার কথা।
চীন শুরু থেকেই প্রকল্পটিতে অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তার আগ্রহ দেখিয়ে আসছে। বাংলাদেশের পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পাওয়ার চায়না যৌথভাবে প্রায় তিন বছর ধরে সমীক্ষা পরিচালনা করে। তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ সামনে এগোতে থাকলে ভারতও এতে আগ্রহ দেখায়।
২০২৪ সালের মে মাসে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কোয়াত্রা ঢাকা সফর করেন। পরে শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় তিস্তা প্রকল্প নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়। তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জানিয়েছিলেন, ভারতের একটি কারিগরি দল দ্রুত বাংলাদেশ সফর করবে।

শেখ হাসিনাও বলেছিলেন, ভারত যদি তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন করে, তাহলে বাংলাদেশের জন্য সেটি সহজ সমাধান হবে।
কিন্তু গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফরের সময় সরকার জানায়, তিস্তা মহাপরিকল্পনা চীনের সহায়তায় বাস্তবায়নের দিকেই তারা এগোচ্ছে।
এদিকে নির্বাচনের আগে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেন। বর্তমান সরকার সেই প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবেই চীনের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানী বলেন, শুধু মহাপরিকল্পনা নয়, তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যাও নিশ্চিত করতে হবে। তার মতে, আন্তর্জাতিক নদী হিসেবে বাংলাদেশের প্রাপ্য পানি আদায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো জরুরি।

বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা প্রকল্পে চীন ও ভারতের আগ্রহের পেছনে ভূরাজনৈতিক কারণও রয়েছে। চীন তাদের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। অন্যদিকে ভারত চীনের প্রভাব ঠেকাতে নিজেও প্রকল্পটিতে যুক্ত হতে আগ্রহী।
তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন, এটি মূলত বাংলাদেশের প্রকল্প এবং চীন এখানে কেবল অর্থায়ন করতে চায়।
চুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও বাংলাদেশ সরকার এখন আর অপেক্ষা করতে চায় না। চীন সফরের আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, চুক্তির বিষয়ে প্রত্যাশা থাকবে। তবে সে জন্য বসে থাকা চলবে না, আমাদের কাজ আমাদেরই করতে হবে। সূত্র বিবিসি
Top of Form
Bottom of Form


















