ঢাকা ১০:৩৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বগুড়া কৃষকের হাসি কেড়ে নিয়েছে সবজির দরপতন বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার ও বিকল্প অর্থায়নে গুরুত্ব এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগ প্রস্তাবসহ ২৩ সমঝোতায় এগোল বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হাটে ঢুকেই গুলি, বের হওয়ার সময় বলল ‘আজ স্বাধীন পুষ্পপাড়া ’ পাবনায় বিলে বজ্রপাতে ছয়জনের মৃত্যু আহত আরও কয়েকজন পাকা জুম ধানে সোনালি হাসি, ফসল ঘরে তুলতে ব্যস্ত রাঙামাটির জুমিয়ারা সংসদীয় কূটনীতিতে বাংলাদেশ-ব্রিটেন সহযোগিতা বাড়ানোর প্রত্যয় চন্দ্রনাথ পাহাড়ে সবুজ প্রকৃতি, নজরুল ও বন্ধুত্বের অমলিন স্মৃতি শনিবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ

বগুড়া কৃষকের হাসি কেড়ে নিয়েছে সবজির দরপতন

বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ১০:৩৫:০৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে

কৃষকের হাসি কেড়ে নিয়েছে সবজির দরপতন

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

মহাস্থান মোকামে সরবরাহ বেড়ে ফুলকপির দাম অর্ধেকে, কেজি মাত্র ২ টাকা, উৎপাদন খরচ ও পরিবহন ব্যয় তুলতে না পেরে দিশেহারা চাষিরা

 মাঠে ফসল ফলিয়েও যদি কৃষককে লোকসান গুনতে হয়, তবে সেই সবুজ ফসলের প্রাচুর্য শেষ পর্যন্ত কৃষকের ঘরে হাসি নয়, বরং দীর্ঘশ্বাসই বয়ে আনবে

মাঠজুড়ে সবুজের সমারোহ, খেতভরা ফুলকপি, মুলা, বাঁধাকপিসহ নানা জাতের শীতকালীন সবজি। ভালো ফলন পেয়ে কৃষকের মুখে যে হাসি ফুটেছিল, বাজারে দরপতনে তা এখন ম্লান হয়ে গেছে।

একদিকে চাহিদার তুলনায় বাজারে সবজির বিপুল সরবরাহ, অন্যদিকে উৎপাদন খরচের তুলনায় অস্বাভাবিক কম দাম, এই দুইয়ের চাপে বগুড়ার কৃষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশা ও উদ্বেগ। বিশেষ করে জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার মহাস্থান পাইকারি মোকামে ফুলকপির দামে বড় ধরনের ধস নেমেছে।

এক দিনের ব্যবধানে প্রতি মণ ফুলকপির দাম ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা থেকে কমে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় নেমে এসেছে। অর্থাৎ মাত্র এক দিনের ব্যবধানে অর্ধেকে নেমেছে ফুলকপির দাম।

গত শুক্রবার বগুড়ার বিভিন্ন বাজারে প্রতি কেজি ফুলকপি ১০ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। তবে পাইকারি বাজারে দাম আরও কম। কোথাও কোথাও কৃষকেরা উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক কম দামে ফুলকপি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে লাভ তো দূরের কথা, খেত থেকে সবজি তুলে বাজারে নেওয়ার পরিবহন খরচটুকু তুলতেও হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা।

কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মতামত, শীতের আগাম সবজি হিসেবে এবার ফুলকপির আবাদ ভালো হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও হয়েছে আশানুরূপ। কিন্তু একই সময়ে বিপুল পরিমাণ ফুলকপি ও অন্যান্য শীতকালীন সবজি বাজারে চলে আসায় সরবরাহ বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি হওয়ায় পাইকারি বাজারে ক্রেতার সংকটের কারণে  কম দামে সবজি বিক্রি করছেন কৃষকেরা।

কৃষকের হাসি কেড়ে নিয়েছে সবজির দরপতন

এর আগে গত বছরের ডিসেম্বর মাসেও বগুড়ার মহাস্থান হাটে শীতকালীন সবজির দামে বড় ধরনের পতন দেখা গিয়েছিল। তখন পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি ফুলকপি ও মুলা মাত্র দুই টাকায় বিক্রি হয়েছিল। একই সঙ্গে নতুন পেঁয়াজের ফুলকিও বিক্রি হয়েছিল কেজিপ্রতি চার টাকায়। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে বিভিন্ন সবজির দাম তিন থেকে চার গুণ কমে যাওয়ায় কৃষকদের উৎপাদন খরচ তোলাই কঠিন হয়ে পড়েছিল।

সেই সময় মহাস্থান হাটে প্রতি কেজি শিম ২০ টাকা, টমেটো ৪০ টাকা, বেগুন ২৫ টাকা, করলা ৪০ টাকা, পেঁপে ২০ টাকা, কাঁচা মরিচ ৩০ টাকা, গাজর ৩০ টাকা এবং নতুন দেশি আলু ৪৫ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। অথচ দুই সপ্তাহ আগেও ফুলকপি ২২ টাকা, মুলা ১২ টাকা, শিম ৪০ টাকা, টমেটো ৬৫ টাকা ও নতুন পেঁয়াজ ৭৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছিল। বাজারে একসঙ্গে সবজির সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

মহাস্থান হাট কাঁচা ও পাকা মাল আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলামের মতে, এবার কৃষকেরা ব্যাপকভাবে শীতকালীন সবজির চাষ করেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও ভালো হয়েছে। কিন্তু খেত থেকে সবজি তুলে অনেক কৃষক একই সময়ে হাটে নিয়ে আসছেন। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি হওয়ায় দাম কমে যাচ্ছে। সামনে আলুর সরবরাহ বাড়লে সবজির বাজারে আরও চাপ তৈরি হতে পারে।

দরপতনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে প্রান্তিক কৃষকদের। শিবগঞ্জ উপজেলার উথলি গ্রামের কৃষক তরিকুল ইসলাম এক বিঘা জমিতে ফুলকপির আবাদ করতে প্রায় ২৬ হাজার টাকা খরচ করেছেন। তাঁর খেতে ফুলকপির ফলন হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ কেজি। কিন্তু বাজারে সেই ফুলকপি বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, পরিবহন ব্যয় তুলতেই তাঁকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

কৃষকের হাসি কেড়ে নিয়েছে সবজির দরপতন

তরিকুল ইসলামের ভাষ্য, খেত থেকে ফুলকপি তুলে হাটে নিয়ে আসতে প্রতি কেজিতে গড়ে দুই টাকা পরিবহন খরচ পড়ে। অথচ হাটে এসে সেই ফুলকপি কেজিপ্রতি দুই টাকা দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে পরিবহন খরচ কোনোভাবে উঠে এলেও জমি চাষ, বীজ, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের পেছনে ব্যয় করা টাকা পুরোটাই লোকসানে পরিণত হচ্ছে। এক বিঘা জমিতে ২৬ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে এখন সেই টাকা ফেরত পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা দেখছেন না এই কৃষক।

শুধু ফুলকপি নয়, অন্যান্য শীতকালীন সবজির দামেও বড় ধরনের ওঠানামা দেখা যাচ্ছে। পাইকারি বাজারে দাম কমলেও খুচরা বাজারে সেই অনুপাতে দাম কমছে না। ফলে একদিকে উৎপাদনকারী কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, অন্যদিকে সাধারণ ভোক্তারাও পাইকারি বাজারের দরপতনের পুরো সুফল পাচ্ছেন না।

এর আগে মহাস্থান হাটে পাইকারি পর্যায়ে ফুলকপি ও মুলা দুই টাকা কেজিতে বিক্রি হলেও বগুড়া শহরের ফতেহ আলী বাজারে ফুলকপি বিক্রি হয়েছে ১২ টাকা এবং মুলা ১৬ টাকা কেজিতে। একইভাবে পাইকারি বাজারে কম দামে বিক্রি হওয়া অন্যান্য সবজিও খুচরা বাজারে তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। এতে কৃষক ও ভোক্তার মাঝখানে পাইকারি ও খুচরা বাজারের ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

কৃষকের কাছ থেকে সবজি কেনার পর তা ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত কয়েকটি ধাপ পার হতে হয়। এ সময় পরিবহন, শ্রমিক ও বাজারজাতকরণের খরচ যুক্ত হয়। তবে পাইকারি বাজারে সবজির দাম ব্যাপকভাবে কমলেও খুচরা বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ফলে একদিকে কৃষক উৎপাদিত সবজির ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, অন্যদিকে ভোক্তারাও কম দামে সবজি কেনার সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পাইকারি ও খুচরা বাজারের এই বড় দামের ব্যবধানের কারণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

কৃষকের হাসি কেড়ে নিয়েছে সবজির দরপতন

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মতলুবর রহমান জানান, বগুড়ায় এবার আলু ও শীতকালীন সবজির ব্যাপক আবাদ হয়েছে। জেলায় ৫৫ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আলু এবং ১৩ হাজার হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজির চাষ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার সবজির উৎপাদন রেকর্ড পরিমাণ হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে কৃষকেরা বিভিন্ন সবজি ভালো দামে বিক্রি করার সুযোগ পেয়েছেন। তবে একসঙ্গে বেশি পরিমাণ সবজি বাজারে আসায় বর্তমানে দাম কমেছে।

সব মিলিয়ে বগুড়ার সবজির বাজারে এখন এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। একদিকে বাজারে সবজির প্রাচুর্য, অন্যদিকে উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে কৃষকের চোখে-মুখে হতাশা। ক্রেতারা কম দামে সবজি পাওয়ার আশা করলেও পাইকারি ও খুচরা বাজারের ব্যবধান সেই স্বস্তিতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

কৃষকের উৎপাদিত সবজির ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, বাজারজাতকরণে সমন্বয় আনা এবং সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ বাড়ানো না গেলে প্রতিবছর মৌসুমের শুরুতে ভালো দাম আর পরে দরপতনের এই চক্র থেকে কৃষকদের মুক্তি পাওয়া কঠিন হবে।

মাঠে ফসল ফলিয়েও যদি কৃষককে লোকসান গুনতে হয়, তবে সেই সবুজ ফসলের প্রাচুর্য শেষ পর্যন্ত কৃষকের ঘরে হাসি নয়, বরং দীর্ঘশ্বাসই বয়ে আনবে।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

বগুড়া কৃষকের হাসি কেড়ে নিয়েছে সবজির দরপতন

আপডেট সময় : ১০:৩৫:০৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

মহাস্থান মোকামে সরবরাহ বেড়ে ফুলকপির দাম অর্ধেকে, কেজি মাত্র ২ টাকা, উৎপাদন খরচ ও পরিবহন ব্যয় তুলতে না পেরে দিশেহারা চাষিরা

 মাঠে ফসল ফলিয়েও যদি কৃষককে লোকসান গুনতে হয়, তবে সেই সবুজ ফসলের প্রাচুর্য শেষ পর্যন্ত কৃষকের ঘরে হাসি নয়, বরং দীর্ঘশ্বাসই বয়ে আনবে

মাঠজুড়ে সবুজের সমারোহ, খেতভরা ফুলকপি, মুলা, বাঁধাকপিসহ নানা জাতের শীতকালীন সবজি। ভালো ফলন পেয়ে কৃষকের মুখে যে হাসি ফুটেছিল, বাজারে দরপতনে তা এখন ম্লান হয়ে গেছে।

একদিকে চাহিদার তুলনায় বাজারে সবজির বিপুল সরবরাহ, অন্যদিকে উৎপাদন খরচের তুলনায় অস্বাভাবিক কম দাম, এই দুইয়ের চাপে বগুড়ার কৃষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশা ও উদ্বেগ। বিশেষ করে জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার মহাস্থান পাইকারি মোকামে ফুলকপির দামে বড় ধরনের ধস নেমেছে।

এক দিনের ব্যবধানে প্রতি মণ ফুলকপির দাম ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা থেকে কমে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় নেমে এসেছে। অর্থাৎ মাত্র এক দিনের ব্যবধানে অর্ধেকে নেমেছে ফুলকপির দাম।

গত শুক্রবার বগুড়ার বিভিন্ন বাজারে প্রতি কেজি ফুলকপি ১০ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। তবে পাইকারি বাজারে দাম আরও কম। কোথাও কোথাও কৃষকেরা উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক কম দামে ফুলকপি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে লাভ তো দূরের কথা, খেত থেকে সবজি তুলে বাজারে নেওয়ার পরিবহন খরচটুকু তুলতেও হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা।

কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মতামত, শীতের আগাম সবজি হিসেবে এবার ফুলকপির আবাদ ভালো হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও হয়েছে আশানুরূপ। কিন্তু একই সময়ে বিপুল পরিমাণ ফুলকপি ও অন্যান্য শীতকালীন সবজি বাজারে চলে আসায় সরবরাহ বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি হওয়ায় পাইকারি বাজারে ক্রেতার সংকটের কারণে  কম দামে সবজি বিক্রি করছেন কৃষকেরা।

কৃষকের হাসি কেড়ে নিয়েছে সবজির দরপতন

এর আগে গত বছরের ডিসেম্বর মাসেও বগুড়ার মহাস্থান হাটে শীতকালীন সবজির দামে বড় ধরনের পতন দেখা গিয়েছিল। তখন পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি ফুলকপি ও মুলা মাত্র দুই টাকায় বিক্রি হয়েছিল। একই সঙ্গে নতুন পেঁয়াজের ফুলকিও বিক্রি হয়েছিল কেজিপ্রতি চার টাকায়। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে বিভিন্ন সবজির দাম তিন থেকে চার গুণ কমে যাওয়ায় কৃষকদের উৎপাদন খরচ তোলাই কঠিন হয়ে পড়েছিল।

সেই সময় মহাস্থান হাটে প্রতি কেজি শিম ২০ টাকা, টমেটো ৪০ টাকা, বেগুন ২৫ টাকা, করলা ৪০ টাকা, পেঁপে ২০ টাকা, কাঁচা মরিচ ৩০ টাকা, গাজর ৩০ টাকা এবং নতুন দেশি আলু ৪৫ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। অথচ দুই সপ্তাহ আগেও ফুলকপি ২২ টাকা, মুলা ১২ টাকা, শিম ৪০ টাকা, টমেটো ৬৫ টাকা ও নতুন পেঁয়াজ ৭৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছিল। বাজারে একসঙ্গে সবজির সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

মহাস্থান হাট কাঁচা ও পাকা মাল আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলামের মতে, এবার কৃষকেরা ব্যাপকভাবে শীতকালীন সবজির চাষ করেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও ভালো হয়েছে। কিন্তু খেত থেকে সবজি তুলে অনেক কৃষক একই সময়ে হাটে নিয়ে আসছেন। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি হওয়ায় দাম কমে যাচ্ছে। সামনে আলুর সরবরাহ বাড়লে সবজির বাজারে আরও চাপ তৈরি হতে পারে।

দরপতনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে প্রান্তিক কৃষকদের। শিবগঞ্জ উপজেলার উথলি গ্রামের কৃষক তরিকুল ইসলাম এক বিঘা জমিতে ফুলকপির আবাদ করতে প্রায় ২৬ হাজার টাকা খরচ করেছেন। তাঁর খেতে ফুলকপির ফলন হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ কেজি। কিন্তু বাজারে সেই ফুলকপি বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, পরিবহন ব্যয় তুলতেই তাঁকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

কৃষকের হাসি কেড়ে নিয়েছে সবজির দরপতন

তরিকুল ইসলামের ভাষ্য, খেত থেকে ফুলকপি তুলে হাটে নিয়ে আসতে প্রতি কেজিতে গড়ে দুই টাকা পরিবহন খরচ পড়ে। অথচ হাটে এসে সেই ফুলকপি কেজিপ্রতি দুই টাকা দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে পরিবহন খরচ কোনোভাবে উঠে এলেও জমি চাষ, বীজ, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের পেছনে ব্যয় করা টাকা পুরোটাই লোকসানে পরিণত হচ্ছে। এক বিঘা জমিতে ২৬ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে এখন সেই টাকা ফেরত পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা দেখছেন না এই কৃষক।

শুধু ফুলকপি নয়, অন্যান্য শীতকালীন সবজির দামেও বড় ধরনের ওঠানামা দেখা যাচ্ছে। পাইকারি বাজারে দাম কমলেও খুচরা বাজারে সেই অনুপাতে দাম কমছে না। ফলে একদিকে উৎপাদনকারী কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, অন্যদিকে সাধারণ ভোক্তারাও পাইকারি বাজারের দরপতনের পুরো সুফল পাচ্ছেন না।

এর আগে মহাস্থান হাটে পাইকারি পর্যায়ে ফুলকপি ও মুলা দুই টাকা কেজিতে বিক্রি হলেও বগুড়া শহরের ফতেহ আলী বাজারে ফুলকপি বিক্রি হয়েছে ১২ টাকা এবং মুলা ১৬ টাকা কেজিতে। একইভাবে পাইকারি বাজারে কম দামে বিক্রি হওয়া অন্যান্য সবজিও খুচরা বাজারে তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। এতে কৃষক ও ভোক্তার মাঝখানে পাইকারি ও খুচরা বাজারের ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

কৃষকের কাছ থেকে সবজি কেনার পর তা ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত কয়েকটি ধাপ পার হতে হয়। এ সময় পরিবহন, শ্রমিক ও বাজারজাতকরণের খরচ যুক্ত হয়। তবে পাইকারি বাজারে সবজির দাম ব্যাপকভাবে কমলেও খুচরা বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ফলে একদিকে কৃষক উৎপাদিত সবজির ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, অন্যদিকে ভোক্তারাও কম দামে সবজি কেনার সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পাইকারি ও খুচরা বাজারের এই বড় দামের ব্যবধানের কারণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

কৃষকের হাসি কেড়ে নিয়েছে সবজির দরপতন

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মতলুবর রহমান জানান, বগুড়ায় এবার আলু ও শীতকালীন সবজির ব্যাপক আবাদ হয়েছে। জেলায় ৫৫ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আলু এবং ১৩ হাজার হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজির চাষ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার সবজির উৎপাদন রেকর্ড পরিমাণ হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে কৃষকেরা বিভিন্ন সবজি ভালো দামে বিক্রি করার সুযোগ পেয়েছেন। তবে একসঙ্গে বেশি পরিমাণ সবজি বাজারে আসায় বর্তমানে দাম কমেছে।

সব মিলিয়ে বগুড়ার সবজির বাজারে এখন এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। একদিকে বাজারে সবজির প্রাচুর্য, অন্যদিকে উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে কৃষকের চোখে-মুখে হতাশা। ক্রেতারা কম দামে সবজি পাওয়ার আশা করলেও পাইকারি ও খুচরা বাজারের ব্যবধান সেই স্বস্তিতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

কৃষকের উৎপাদিত সবজির ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, বাজারজাতকরণে সমন্বয় আনা এবং সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ বাড়ানো না গেলে প্রতিবছর মৌসুমের শুরুতে ভালো দাম আর পরে দরপতনের এই চক্র থেকে কৃষকদের মুক্তি পাওয়া কঠিন হবে।

মাঠে ফসল ফলিয়েও যদি কৃষককে লোকসান গুনতে হয়, তবে সেই সবুজ ফসলের প্রাচুর্য শেষ পর্যন্ত কৃষকের ঘরে হাসি নয়, বরং দীর্ঘশ্বাসই বয়ে আনবে।