পাকা জুম ধানে সোনালি হাসি, ফসল ঘরে তুলতে ব্যস্ত রাঙামাটির জুমিয়ারা
- আপডেট সময় : ০৪:৩৮:২৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে
সবুজ পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে যেন প্রকৃতি এঁকেছে সোনালি ফসলের অপূর্ব ক্যানভাস। পাহাড়ের ঢালে ঢালে পেকে ওঠা জুম ধানের শীষে দুলছে নতুন স্বপ্ন, ঘরে ঘরে জানান দিচ্ছে ফসল তোলার আনন্দ। ধানের পাশাপাশি জুমে শোভা পাচ্ছে নানা জাতের সাথি ফসল, মরিচ, তিল, ভুট্টা, শাকসবজি আর পাহাড়ি ফলমূল।
প্রকৃতির সঙ্গে মিতালি করে জীবন গড়া জুমিয়ারা এখন ব্যস্ত পাকা ধান কাটতে। কারও হাতে কাস্তে, কারও কাঁধে ধানের বোঝা। পাহাড়ের বুকজুড়ে কর্মচাঞ্চল্য আর সোনালি ফসলের মিতালি। যেন পাহাড়ের প্রতিটি ঢাল আজ কবির ভাষায় বলে চলেছে পরিশ্রম, প্রকৃতি আর জীবনের এক অনন্য গল্প।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ১৩টি ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠীর বসবাস। তিন পার্বত্য জেলায় বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের প্রাচীনতম পেশা এই জুম চাষ। তাই তাদের জুমিয়া বলা হয়। যুগ যুগ ধরে পাহাড়িরা সনাতন পদ্ধতিতে জুম চাষ করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে আসছে।
পাহাড়ের ঢালে ফসল চাষের এই পদ্ধতিকে চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় জুম, ত্রিপুরা ভাষায় ‘হুঁ’, মারমা ভাষায় ‘ইয়া’, পাংখোয়া ও লুসাই ভাষায় ‘ইকপ্রা’,খেয়াং ভাষায় ‘লউ’ এবং খুমি ভাষায় ‘ল’ বলা হয়ে থাকে। তবে পাহাড়ে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ছাড়া অন্য ভাষাভাষীদের কাছে এটি জুম চাষ নামেই পরিচিত।
রাঙামাটির আসাম বস্তি-কাপ্তাই-মোরঘোনা সড়কের পাশের জুম চাষি ননা চাকমা বাসসকে বলেন, পাহাড়ের ঢালু এলাকায় প্রথমে চাষের জন্য উপযোগী জমি নির্বাচন করা হয়। পরে নির্ধারিত স্থানে জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করা হয়। চাষের জমি পরিষ্কার করে চৈত্র মাসে নির্ধারিত জমির জঙ্গল একমাসের বেশি সময় ধরে রোদে শুকানোর পর তা আগুনে পোড়ানো হয়। এরপর চৈত্রের শেষ থেকে বৈশাখের শুরু পর্যন্ত জমির আগাছা পরিষ্কার করে সেখানে ধানসহ নানা প্রজাতির ফসলের বীজ বপন করা হয়।
রাঙামাটির বরাদম এলাকার জুম চাষি আনন্দ চাকমা বলেন, জুম চাষে ধানের পাশাপাশি পাহাড়ের মাটিতে দা দিয়ে গর্ত খুঁড়ে সাথি ফসল হিসেবে কলা, ভূট্টা, মারফা, মরিচ, ঢ্যাঁড়স, কাঁ

করোল, আদা, মিষ্টি কুমড়া, তুলা, তিল, ভুট্টাসহ একসাথে বিভিন্ন প্রজাতির বীজ বপন করা হয়।
পাহাড়ে বিভিন্ন জাতের জুম ধান চাষ হয়ে থাকে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে; হরিণ বিনি, পাধাতটারা, আমেই, কালা কবরক, লঙ লঙ, মেলে (কুকী), কামারাঙ, তোর্গী, বাধেইয়া, কবরক, লেঙদাচিকন, গেলঙ, পাত্তেগী, গুরি, বিনি, কবাবিনি ও লোবাবিনি।
তিনি জানান, আষাঢ়-শ্রাবণ মাসেই জুমের ধান পাকা শুরু হয়। ভাদ্র -আশ্বিন মাস থেকেই ঘরে তোলা শুরু হয় জুমের সোনালি ফসল। এ বছর জুমে পোকামাকড়ের উপদ্রব না থাকায় জুমের ফলন ভালো হয়েছে বলে জানান তিনি।
রাঙামাটির কাপ্তাই ছাড়াও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পাহাড়ে পাহাড়ে শোভা পাচ্ছে জুমের সোনালি ফসলের রঙিন আভা।
রাঙামাটি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বাসসকে বলেন, চলতি বছর রাঙামাটি জেলায় ৫ হাজার হেক্টর জমিতে জুম চাষ হয়েছে। এতে ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১২ হাজার মেট্রিক টন আর অন্যান্য সবজির উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৫ হাজার মেট্রিক টন।
পাহাড়ের একই জমিতে বারবার জুম চাষ না করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ঘনঘন জুম চাষে সামগ্রিক ফলন কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই কৃষি বিভাগের পরামর্শ নিয়ে জুম চাষের আহ্বান জানান তিনি।



















