অস্ত্রোপচারের পর যক্ষ্মা সংক্রমণ, প্রশ্নের মুখে হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা
- আপডেট সময় : ১০:২৩:১২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৯ বার পড়া হয়েছে
পাবনার ফরিদপুরে একটি বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের পর অন্তত ১২ রোগীর শরীরে যক্ষ্মার জীবাণু শনাক্ত হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে ১১ জনই সন্তান প্রসবের জন্য সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করিয়েছিলেন। অন্য একজনের গলব্লাডারে অস্ত্রোপচার হয়েছিল। অস্ত্রোপচারের পর দীর্ঘদিন ক্ষতস্থান না শুকানো, পুঁজ ও রস বের হওয়া এবং নানা ধরনের জটিলতার পর পরীক্ষায় তাঁদের ক্ষতস্থানে যক্ষ্মা শনাক্ত হয়। ঘটনাটি তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। একই সঙ্গে সংক্রমণের উৎস ও কারণ অনুসন্ধানে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছে পাবনার ফরিদপুর উপজেলা সদরের তেঁতুলতলা এলাকার মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে ভাড়ায় পরিচালিত আল-মদিনা ল্যাব অ্যান্ড হসপিটালে। হাসপাতালটি ১০ শয্যার হলেও সেখানে প্রতি মাসে ৬০ থেকে ৭০টি অস্ত্রোপচার করা হয় বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সংখ্যাই বেশি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে তিনজন প্রসূতির অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করানো হয়।
আক্রান্ত রোগীদের স্বজনদের অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের পর স্বাভাবিক সময়ের মধ্যে ক্ষতস্থান শুকায়নি। বরং ক্ষতস্থানে পুঁজ জমা, রস বের হওয়া এবং দীর্ঘদিন ব্যথাসহ নানা জটিলতা দেখা দেয়। প্রথমে এসব সমস্যাকে অস্ত্রোপচার-পরবর্তী সাধারণ জটিলতা হিসেবে চিকিৎসা করা হলেও পরে উন্নত চিকিৎসা ও পরীক্ষায় ক্ষতস্থানে যক্ষ্মার জীবাণু শনাক্ত হয়।
এরকম একজন রোগী জয়া রানী দাস। উপজেলা সদরের থানাপাড়া এলাকার এই তরুণী গত ২২ মে আল-মদিনা হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ওই দিনই সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর সন্তানের জন্ম হয়। দুই দিন পর সন্তানসহ তিনি বাড়ি ফিরে যান। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন এবং ক্ষতস্থানের পরিচর্যা করলেও কয়েক সপ্তাহ পরও তাঁর পেটের অস্ত্রোপচারের জায়গা শুকায়নি। বরং ক্ষতস্থান থেকে পুঁজ ও রস বের হতে থাকে।
পরবর্তীতে ক্ষতস্থান থেকে মাংসের নমুনা সংগ্রহ করে রাজশাহীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা করা হয়। জুলাইয়ের শেষ দিকে পরীক্ষার ফলাফলে ক্ষতস্থানে যক্ষ্মা শনাক্ত হয়। এরপর জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির মাধ্যমে জয়া রানীর চিকিৎসা শুরু হয়। নথি অনুযায়ী, ২৫ জুলাই থেকে তিনি যক্ষ্মার ওষুধ সেবন করছেন।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, মে ও জুন মাসে ওই হাসপাতালে অস্ত্রোপচার হওয়া অন্তত ১২ রোগীর পরবর্তী সময়ে ক্ষতস্থানে যক্ষ্মা শনাক্ত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১১ জন প্রসূতি এবং একজন গলব্লাডারে অস্ত্রোপচার করিয়েছিলেন। আক্রান্তদের মধ্যে কয়েকজনের চিকিৎসা এখন অন্য হাসপাতালেও চলছে। এতে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।
হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনার পর হাসপাতালটির অবকাঠামো ও অস্ত্রোপচার-পরবর্তী জীবাণুমুক্তকরণ ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী, ১০ শয্যার একটি হাসপাতাল পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স, লেবার রুম, অপারেশন থিয়েটার, জরুরি বিভাগ এবং নির্ধারিত আয়তনের ওয়ার্ড থাকার কথা। কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালটিতে এসব শর্তের সবগুলো যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না।
হাসপাতালে ৮০০ বর্গফুট আয়তনের কোনো ওয়ার্ড নেই। অস্ত্রোপচারকক্ষটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন দেখা গেলেও সেখানে থাকা দুটি অটোক্লেভ যন্ত্র পুরোনো। সম্প্রতি একটি নতুন অটোক্লেভ যন্ত্র আনা হলেও সেটি তখনও ব্যবহার করা হয়নি। অস্ত্রোপচারকক্ষের পাশে স্বাভাবিক প্রসবের জন্য একটি কক্ষ থাকলেও সেখানে প্রয়োজনীয় শয্যা বা পর্যাপ্ত সরঞ্জাম দেখা যায়নি।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অস্ত্রোপচারের পর যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত করার দাবি করলেও এ বিষয়ে কোনো লিখিত প্রটোকল বা প্রমাণ দেখাতে পারেনি। প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্তান প্রসবের অস্ত্রোপচারসহ যেকোনো সার্জারির ক্ষেত্রে সংক্রমণ প্রতিরোধে নির্ধারিত প্রটোকল কঠোরভাবে অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি।
হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাসুদ রানা বলেন, সংক্রমণের উৎস হিসেবে কোনো রোগী কিংবা অপারেশন থিয়েটার দুই সম্ভাবনাই তাঁরা বিবেচনা করছেন। তাঁর ধারণা, কয়েক মাস আগে হার্নিয়ার অস্ত্রোপচার করানো এক প্রবীণ রোগীর শরীরে পরে যক্ষ্মার জীবাণু শনাক্ত হয়েছিল। সেখান থেকেই অপারেশন থিয়েটারে জীবাণু ছড়িয়ে থাকতে পারে। বিষয়টি জানার পর অপারেশন থিয়েটার জীবাণুমুক্ত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, ঘটনাটি তাঁদের জন্য অত্যন্ত গুরুতর এবং সংক্রমণের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
তদন্ত কমিটি, বন্ধ অস্ত্রোপচার
ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর ফরিদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন। নোটিশের জবাবও দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ফরিদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসারকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে। কমিটিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
এরই মধ্যে হাসপাতালটির অস্ত্রোপচার কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। সংক্রমণের প্রকৃত উৎস ও বিস্তারের কারণ অনুসন্ধানে আইইডিসিআরকেও চিঠি দেওয়া হয়েছে। জেলা সিভিল সার্জনের পক্ষ থেকেও জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।
পাবনার সিভিল সার্জন মো. আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, তদন্তের পর দাপ্তরিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংক্রমণের কারণ অনুসন্ধান চলছে। কোনো ধরনের গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আক্রান্ত রোগীদের সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলার পাশাপাশি তাঁদের অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয়ের বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে বলে তিনি জানান।
এর আগেও ঘটেছে এমন ঘটনা
পাবনার ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। এর আগে শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার একটি বেসরকারি ক্লিনিকেও অস্ত্রোপচারের পর রোগীদের ক্ষতস্থানে যক্ষ্মার সংক্রমণের ঘটনা ধরা পড়ে। ওই ঘটনায় আইইডিসিআর ও জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি যৌথভাবে তদন্ত করে সংক্রমণের সত্যতা পায়। সেখানে অস্ত্রোপচার হওয়া ৫১ জন রোগীর শরীরে যক্ষ্মা শনাক্ত হয়েছিল। পরে ক্লিনিকটির অস্ত্রোপচারকক্ষ ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অস্ত্রোপচারের সময় যক্ষ্মার জীবাণু সংক্রমিত হওয়ার ঘটনা চিকিৎসাবিজ্ঞানে একেবারে নতুন নয়। তবে একই হাসপাতালে অল্প সময়ের মধ্যে এতজন রোগীর ক্ষতস্থানে যক্ষ্মা শনাক্ত হওয়া অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। যক্ষ্মা শুধু ফুসফুসে নয়, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ও ক্ষতস্থানেও হতে পারে। একে ফুসফুসবহির্ভূত বা এক্সট্রা-পালমোনারি টিবি বলা হয়।
যক্ষ্মা বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্ত্রোপচারকক্ষ, অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতি এবং রোগীর ক্ষতস্থানের পরিচ্ছন্নতা ও জীবাণুমুক্তকরণে সামান্য অবহেলাও বড় ধরনের সংক্রমণের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে একই অপারেশন থিয়েটারে নিয়মিতভাবে বিপুলসংখ্যক অস্ত্রোপচার হলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের প্রটোকল যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনা জরুরি।
বিশিষ্ট বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্ত্রোপচারের আগে ও পরে অপারেশন থিয়েটার এবং ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি যথাযথ পদ্ধতিতে জীবাণুমুক্ত করা হচ্ছে কি না, স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো নির্ধারিত জনবল, অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি এবং সংক্রমণ প্রতিরোধের নিয়ম মেনে পরিচালিত হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
বাংলাদেশ যক্ষ্মাপ্রবণ দেশগুলোর একটি। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ নতুন করে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হন এবং হাজারো মানুষ এ রোগে মারা যান। এমন পরিস্থিতিতে অস্ত্রোপচারের মতো চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে নতুন করে যক্ষ্মা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুতর বার্তা বহন করে।
ফরিদপুরের আল-মদিনা হাসপাতালের ঘটনায় তাই শুধু ১২ রোগীর সংক্রমণের কারণ অনুসন্ধান করাই যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে দেশের বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর অস্ত্রোপচারকক্ষের জীবাণুমুক্তকরণ, চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যন্ত্রপাতির স্টেরিলাইজেশন এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর তা নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তদন্তে যদি অবহেলা বা নিয়মভঙ্গের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন ও প্রথম আলো


















