তবু চিকিৎসাসেবা অচল অপরিকল্পিত কেনাকাটা কোটি কোটি টাকার যন্ত্র
- আপডেট সময় : ০৯:২৭:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১ অগাস্ট ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে
জনবল সংকট ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সরকারি হাসপাতালে পড়ে আছে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম
গত ১৫ বছরে অপরিকল্পিতভাবে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা, দুর্নীতি এবং সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে দেশের অনেক সরকারি হাসপাতালে কোটি কোটি টাকার চিকিৎসা যন্ত্রপাতি অচল অবস্থায় পড়ে আছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত।
দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবার আধুনিকায়নে বছরের পর বছর বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে সরকার। কেনা হয়েছে অত্যাধুনিক নানা ধরনের চিকিৎসা যন্ত্রপাতি। নির্মাণ করা হয়েছে নতুন ভবন, বাড়ানো হয়েছে হাসপাতালের সক্ষমতা। কিন্তু এসব উদ্যোগের বড় একটি অংশই কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না। কারণ, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা অনেক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি এখনো বাক্সবন্দি, কোনোটি নষ্ট হয়ে পড়ে আছে, আবার কোনোটি জনবল, রিএজেন্ট কিংবা প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিতের বক্তব্যে সরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনার এমন চিত্রই সামনে এসেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে অপরিকল্পিতভাবে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা, দুর্নীতি এবং সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে কোটি কোটি টাকার চিকিৎসা যন্ত্রপাতি অচল অবস্থায় পড়ে আছে।
শনিবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, গত দেড় দশকে স্বাস্থ্য খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও পরিকল্পনার অভাব ও দুর্নীতির কারণে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায়নি। শত শত কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা হলেও তার একটি বড় অংশ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—কিছু হাসপাতালে ১০ বছর আগে কেনা যন্ত্রপাতির মোড়ক পর্যন্ত খোলা হয়নি। অর্থাৎ যে যন্ত্র রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসায় ব্যবহার করার কথা, সেটিই বছরের পর বছর পড়ে থেকে একসময় অচল হয়ে যাচ্ছে। এতে সরকারের বিপুল অর্থ যেমন অপচয় হচ্ছে, তেমনি রোগীদেরও বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
যন্ত্র আছে, নেই চালানোর লোক
চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে শুধু অর্থ বরাদ্দ ও যন্ত্র কেনাই যথেষ্ট নয়। যন্ত্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজন দক্ষ জনবল। কিন্তু বাস্তবে অনেক হাসপাতালেই এই মৌলিক বিষয়টি উপেক্ষিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, কোনো হাসপাতালে যন্ত্র আছে, কিন্তু তা পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নেই। আবার কোথাও যন্ত্র থাকলেও প্রয়োজনীয় রিএজেন্ট বা এক্স-রে প্লেটের অভাবে সেটি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
অর্থাৎ একটি যন্ত্র কেনার পর সেটিকে সচল রাখার জন্য যে ধারাবাহিক ব্যয় ও ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন, অনেক ক্ষেত্রেই তা নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা যন্ত্র কয়েক বছর পরেই ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি কেনার আগে রোগীর চাপ, সংশ্লিষ্ট রোগের প্রকোপ, চিকিৎসক ও টেকনোলজিস্টের সংখ্যা, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো সুবিধা, যন্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিয়মিত কনজ্যুমেবলস সরবরাহ—এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। কিন্তু এসব বিষয় সমন্বিতভাবে বিবেচনা না করে শুধু বাজেট বরাদ্দ ও কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে যন্ত্রপাতি অচল হয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
চিকিৎসক সংকটেও রোগীর চাপ
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উদাহরণ পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে প্রায় ২০০ অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকের পদ শূন্য রয়েছে। অথচ প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার রোগী সেখানে চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। হাসপাতালটির ধারণক্ষমতা মাত্র ২ হাজার ২০০।
অর্থাৎ নির্ধারিত সক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে। এর সঙ্গে রয়েছে শিক্ষক ও চিকিৎসক সংকট। ফলে একদিকে রোগীর চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে চিকিৎসা শিক্ষার মানও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে বেসিক সায়েন্সের শিক্ষক সংকটের কথাও তুলে ধরেছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী। তাঁর মতে, আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে চিকিৎসক, নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টের সমন্বিত টিম প্রয়োজন। শুধু হাসপাতালের ভবন ও দামি যন্ত্রপাতি থাকলেই উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
কেনাকাটায় চাই প্রয়োজনভিত্তিক পরিকল্পনা
স্বাস্থ্য খাতে সরকারের বিপুল বিনিয়োগের সুফল পেতে হলে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার পুরো প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। কোনো হাসপাতালের জন্য কী যন্ত্র প্রয়োজন, সেটি কতজন রোগীর কাজে আসবে, কে পরিচালনা করবেন, রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কার, প্রয়োজনীয় রিএজেন্ট ও অন্যান্য উপকরণ নিয়মিত পাওয়া যাবে কি না, কেনার আগেই এসব প্রশ্নের উত্তর থাকা জরুরি।
একই সঙ্গে যন্ত্রপাতি কেনার পর নিয়মিত ব্যবহার ও কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কোনো যন্ত্র দীর্ঘদিন পড়ে থাকলে কেন ব্যবহার হচ্ছে না, সেটির কারণ চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
ভবন নয়, কার্যকর ব্যবস্থাপনাই মূল চাবিকাঠি
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীও স্পষ্ট করেছেন, শুধু নতুন ভবন নির্মাণ বা নতুন মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতের সংকট দূর করা যাবে না। প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, দক্ষ জনবল ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা।
কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা একটি যন্ত্র যদি বাক্সবন্দি পড়ে থাকে, তাহলে সেটি সরকারি সম্পদ নয়—বরং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের প্রতীক। আবার যন্ত্র সচল থাকলেও যদি প্রয়োজনীয় জনবল বা রিএজেন্ট না থাকে, তবু রোগীর কোনো উপকার হয় না।
তাই ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে ‘কত টাকা খরচ হলো’ এই হিসাবের পাশাপাশি ‘কতজন রোগী সেবা পেলেন’ এবং ‘কেনা যন্ত্র কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হলো’ এই প্রশ্নও সামনে আনতে হবে। একই সঙ্গে কেনাকাটায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, প্রয়োজনভিত্তিক পরিকল্পনা এবং নিয়মিত অডিট নিশ্চিত করা জরুরি।
স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ তখনই সফল হবে, যখন হাসপাতালের ভবন, চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট, ওষুধ ও আধুনিক যন্ত্রপাতিসবকিছু একটি সমন্বিত ব্যবস্থার অধীনে কার্যকরভাবে কাজ করবে। অন্যথায় কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা যন্ত্রপাতি পড়ে থাকবে, আর চিকিৎসার জন্য সাধারণ মানুষকে ছুটতে হবে বেসরকারি হাসপাতালের দরজায়।









