ঢাকা ০১:২৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
সুরের মায়ায় সুজাতা সোম রাগসংগীত থেকে লোকগান, শৈশবের আসর পেরিয়ে সংগীত শিক্ষার বিস্তৃত ভুবনে বিশ্ববাজারে কমল তেলের দাম যুক্তরাষ্ট্রে মজুত বৃদ্ধির প্রভাব এশিয়ান গেমস উপলক্ষে জাপান সফরে সেনাবাহিনী প্রধান ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঋণ বিতরণে ধীরগতি  বন্ধ শিল্প পুনরায় চালুর চ্যালেঞ্জ নিরাপদ প্রজননের লক্ষ্যে ৮ অক্টোবর ২২ দিন দেশজুড়ে ইলিশ আহরণ বন্ধ নিষিদ্ধ আ.লীগের ৭ নেতার মৃত্যুদন্ড সম্পত্তির অর্ধেক জুলাইযোদ্ধাদের একটানে জালে ওঠে আসে ২৬ লাখ টাকার ২ হাজার ২০০টি কাঙ্খিত  ইলিশ  কৃষিপণ্যের আমদানি কমিয়ে উৎপাদন  বাড়ানোর তাগিদ  প্রধানমন্ত্রীর সংযুক্ত আরব  আমিরাতে ৪,৮০০ বাংলাদেশির ভিসা বাতিল ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রিসেট চায় বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় সফর হওয়া উচিত হুমায়ুন

সুরের মায়ায় সুজাতা সোম রাগসংগীত থেকে লোকগান, শৈশবের আসর পেরিয়ে সংগীত শিক্ষার বিস্তৃত ভুবনে

আমিনুল হক ভূইয়া
  • আপডেট সময় : ০১:১৪:৫৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২৬ বার পড়া হয়েছে

রাগভিত্তিক সংগীত থেকে লোকগান শৈশবের গানের আসর থেকে সংগীত শিক্ষার বিস্তৃত পরিসর

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

এক পাশে ভারতীয় উপমহাদেশের সশস্ত্র বিপ্লবের অন্যতম নায়ক মাস্টারদা সূর্যসেন। অন্য পাশে ভারতের স্বাধীনতার জন্য আত্মোৎসর্গকারী অমর বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু। ইতিহাসের দুই কালজয়ী ব্যক্তিত্বের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন এক নারী। মুখে তাঁর স্মিত হাসি। পেছনে ত্রিপুরার রাজবাড়ির ঐতিহাসিক প্রবেশমুখ। কয়েক বছর আগের সেই দৃশ্যটি যেন একই সঙ্গে ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির এক প্রতীকী ছবি।

সেই মুহূর্তে সুজাতা সোম বলেছিলেন, দেখুন, গান করি মনের তাগিদে।

কথাটি ছোট, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে তাঁর দীর্ঘ সংগীতযাত্রার গল্প। গান তাঁর কাছে শুধু পরিবেশনের বিষয় নয়, গান তাঁর অনুভব, তাঁর ভালোবাসা, তাঁর শৈশবের স্মৃতি এবং জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সুজাতার সংগীতের সঙ্গে পরিচয় শৈশব থেকেই। পারিবারিকভাবেই তিনি পেয়েছেন সাংস্কৃতিক পরিবেশ। বাবা-মা দুজনই ছিলেন সাংস্কৃতিক ভুবনের মানুষ। ফলে তাঁদের বাড়িতে প্রায়ই বসত গানের আসর। শিল্পী, সংস্কৃতিপ্রেমী ও সংগীতানুরাগীদের আনাগোনায় মুখর থাকত সেই আয়োজন।

আর সেই আসরের এক পাশে বসে মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতার মতো গান শুনতেন ছোট্ট সুজাতা।

গানের সুর তাঁকে টেনে নিয়ে যেত অন্য এক জগতে। কখনো রাগের গভীরতা, কখনো লোকগানের মাটির গন্ধ, কখনো আধুনিক গানের আবেগ, সবকিছুই শিশুমনে তৈরি করত বিস্ময়ের ঢেউ। মনে উঁকি দিত অসংখ্য প্রশ্ন একদিন কি আমিও এমন করে গান গাইতে পারব? আমার কণ্ঠ থেকেও কি এমন সুর বের হবে, যা অন্য কারও মন ছুঁয়ে যাবে?

শৈশবের সেই স্বপ্নই ধীরে ধীরে বাস্তবতার পথ ধরে এগিয়েছে।

সময়ের সঙ্গে সুজাতা সোমের সংগীতচর্চার পরিধিও বিস্তৃত হয়েছে। রাগভিত্তিক সংগীতের পাশাপাশি আধুনিক গান ও লোকসংগীতের বিভিন্ন ধারাকে সঙ্গী করে তিনি এগিয়ে চলেছেন। সংগীতের বৈচিত্র্যের মধ্যে নিজের অনুভব ও প্রকাশভঙ্গি খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা তাঁর সাধনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

তবে শুধু নিজে গান গেয়ে থেমে থাকতে চান না তিনি। সংগীতকে ছড়িয়ে দিতে চান নতুন প্রজন্মের মধ্যেও। সে কারণেই বর্তমানে সংগীত শিক্ষায় বিশেষভাবে মনোনিবেশ করেছেন সুজাতা। তাঁর কাছে সংগীত শেখানো মানে শুধু তাল-লয়-সুর শেখানো নয়, বরং একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে সৌন্দর্যবোধ, মননশীলতা, শৃঙ্খলা ও সাংস্কৃতিক চেতনা গড়ে তোলারও একটি প্রক্রিয়া।

রাগভিত্তিক সংগীত থেকে লোকগান শৈশবের গানের আসর থেকে সংগীত শিক্ষার বিস্তৃত পরিসর

আগরতলা তাঁর আত্মিক ঠিকানা

ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা সুজাতা সোমের বর্তমান ঠিকানা। কিন্তু শহরটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেবল বসবাসের নয়, এ এক আত্মিক যোগাযোগ।

বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল থেকে খুব বেশি দূরে নয় আগরতলা। ভৌগোলিকভাবে দুটি ভূখণ্ড আলাদা হলেও ভাষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, সংগীত, উৎসব ও জীবনাচরণের নানা ক্ষেত্রে রয়েছে গভীর মিল। সীমান্তের কাঁটাতার মানুষের চলাচলকে আলাদা করতে পারে, কিন্তু সংস্কৃতির স্বাভাবিক প্রবাহকে থামিয়ে দিতে পারে না।

আগরতলার সাংস্কৃতিক পরিবেশে তাই সুজাতা খুঁজে পান নিজের পরিচিত এক জগৎ। তাঁর চোখে এখানকার শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি, আচার-আচরণ এবং মানুষের জীবনযাত্রায় বাঙালিয়ানার একটি স্বতন্ত্র আবহ রয়েছে। এই সাংস্কৃতিক আবহই তাঁকে আরও অনুপ্রাণিত করে।

দুই বাংলার মানুষের মধ্যে যে ভাষা ও সংস্কৃতির আত্মিক সম্পর্ক, সুজাতা সোম সেই সম্পর্ককে অত্যন্ত কাছ থেকে অনুভব করেন। তাঁর সংগীতচর্চার মধ্যেও যেন সেই অভিন্ন সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের ছাপ রয়েছে।

রাগভিত্তিক সংগীত থেকে লোকগান শৈশবের গানের আসর থেকে সংগীত শিক্ষার বিস্তৃত পরিসর

সংস্কৃতির সেতুবন্ধনে সংগীত

সুজাতার কাছে গান কোনো সীমারেখার বিষয় নয়। সংগীত মানুষের হৃদয়ের কথা বলে। সে কারণেই তাঁর ভবিষ্যৎ ভাবনায় সংগীতের পাশাপাশি রয়েছে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা।

নতুন প্রজন্মকে সংগীতের সঙ্গে যুক্ত করা, হারিয়ে যেতে বসা লোকজ সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ তৈরি করা, শুদ্ধ সংগীতচর্চার পরিবেশ গড়ে তোলা এবং শিল্প-সাহিত্যের প্রতি তরুণদের ভালোবাসা বাড়ানো, এসব কাজের সঙ্গে নিজেকে আরও সম্পৃক্ত করার প্রত্যাশা রয়েছে তাঁর।

বিশেষ করে দুই বাংলার সাংস্কৃতিক যোগাযোগ আরও দৃঢ় করার ক্ষেত্রেও সংগীত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন তিনি। কারণ একই ভাষায় কথা বলা মানুষের হৃদয়ের অনুভূতিও অনেক ক্ষেত্রে একই সুরে বাঁধা।

বাংলাদেশ ও ত্রিপুরার মানুষের সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বহু পুরোনো। গান, কবিতা, নাটক, সাহিত্য ও লোকঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে এই সম্পর্ক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়েছে। সেই ধারাকে আরও সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে শিল্পীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সুজাতা সোম সেই দায়িত্ববোধ থেকেই নিজের সংগীতসাধনাকে আরও বিস্তৃত করতে চান।

রাগভিত্তিক সংগীত থেকে লোকগান শৈশবের গানের আসর থেকে সংগীত শিক্ষার বিস্তৃত পরিসর

শৈশবের শ্রোতা থেকে আজকের সংগীতসাধক

একসময় যিনি বাবা-মায়ের সাংস্কৃতিক আসরের এক কোণে বসে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে অন্যদের গান শুনতেন, আজ তিনি নিজেই সংগীতের একজন নিবেদিতপ্রাণ মানুষ। শৈশবের সেই কৌতূহল আজ পরিণত হয়েছে সাধনায়। যে প্রশ্ন একদিন ছোট্ট সুজাতার মনে ঘুরপাক খেত আমি কি কোনোদিন গান গাইতে পারব? জীবন তার উত্তর দিয়েছে নিজের মতো করে।

আজ তাঁর সামনে নতুন অধ্যায়। নিজের গান, সংগীত শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এই তিনটি পথকে একসঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে চান সুজাতা সোম। তাঁর প্রত্যাশা, আগামী দিনের প্রজন্ম শুধু গান শুনবে না, গানের ভেতরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মানবিকতাকেও বুঝবে। কারণ একটি গান কখনো শুধু গান নয়। একটি সুরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের স্মৃতি, মাটি, ভাষা, প্রেম, বিরহ, সংগ্রাম এবং স্বপ্ন।

মাস্টারদা সূর্যসেন ও ক্ষুদিরাম বসুর স্মৃতিবাহী ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে সুজাতা সোমের সেই স্মিত হাসি তাই যেন অন্য এক বার্তা বহন করে, ইতিহাস আমাদের শিকড়ের কথা মনে করায়, আর সংস্কৃতি সেই শিকড়কে বাঁচিয়ে রাখে।

একই আকাশের নিচে, একই বাতাসে, একই ভাষার মায়ায় আগরতলা ও বাংলার মানুষের এই সাংস্কৃতিক আত্মীয়তা আরও গভীর হোক। আর সেই সেতুবন্ধনে সুজাতা সোমের সংগীতসাধনা হয়ে উঠুক একটি নিবেদিত কণ্ঠ।

গান তাঁর কাছে মনের তাগিদে শুরু হয়েছিল। এখন সেই গানই যেন হয়ে উঠছে মানুষের সঙ্গে মানুষের, এক সংস্কৃতির সঙ্গে আরেক সংস্কৃতির এবং অতীতের সঙ্গে ভবিষ্যতের এক অনন্ত সেতুবন্ধন।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

সুরের মায়ায় সুজাতা সোম রাগসংগীত থেকে লোকগান, শৈশবের আসর পেরিয়ে সংগীত শিক্ষার বিস্তৃত ভুবনে

আপডেট সময় : ০১:১৪:৫৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এক পাশে ভারতীয় উপমহাদেশের সশস্ত্র বিপ্লবের অন্যতম নায়ক মাস্টারদা সূর্যসেন। অন্য পাশে ভারতের স্বাধীনতার জন্য আত্মোৎসর্গকারী অমর বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু। ইতিহাসের দুই কালজয়ী ব্যক্তিত্বের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন এক নারী। মুখে তাঁর স্মিত হাসি। পেছনে ত্রিপুরার রাজবাড়ির ঐতিহাসিক প্রবেশমুখ। কয়েক বছর আগের সেই দৃশ্যটি যেন একই সঙ্গে ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির এক প্রতীকী ছবি।

সেই মুহূর্তে সুজাতা সোম বলেছিলেন, দেখুন, গান করি মনের তাগিদে।

কথাটি ছোট, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে তাঁর দীর্ঘ সংগীতযাত্রার গল্প। গান তাঁর কাছে শুধু পরিবেশনের বিষয় নয়, গান তাঁর অনুভব, তাঁর ভালোবাসা, তাঁর শৈশবের স্মৃতি এবং জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সুজাতার সংগীতের সঙ্গে পরিচয় শৈশব থেকেই। পারিবারিকভাবেই তিনি পেয়েছেন সাংস্কৃতিক পরিবেশ। বাবা-মা দুজনই ছিলেন সাংস্কৃতিক ভুবনের মানুষ। ফলে তাঁদের বাড়িতে প্রায়ই বসত গানের আসর। শিল্পী, সংস্কৃতিপ্রেমী ও সংগীতানুরাগীদের আনাগোনায় মুখর থাকত সেই আয়োজন।

আর সেই আসরের এক পাশে বসে মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতার মতো গান শুনতেন ছোট্ট সুজাতা।

গানের সুর তাঁকে টেনে নিয়ে যেত অন্য এক জগতে। কখনো রাগের গভীরতা, কখনো লোকগানের মাটির গন্ধ, কখনো আধুনিক গানের আবেগ, সবকিছুই শিশুমনে তৈরি করত বিস্ময়ের ঢেউ। মনে উঁকি দিত অসংখ্য প্রশ্ন একদিন কি আমিও এমন করে গান গাইতে পারব? আমার কণ্ঠ থেকেও কি এমন সুর বের হবে, যা অন্য কারও মন ছুঁয়ে যাবে?

শৈশবের সেই স্বপ্নই ধীরে ধীরে বাস্তবতার পথ ধরে এগিয়েছে।

সময়ের সঙ্গে সুজাতা সোমের সংগীতচর্চার পরিধিও বিস্তৃত হয়েছে। রাগভিত্তিক সংগীতের পাশাপাশি আধুনিক গান ও লোকসংগীতের বিভিন্ন ধারাকে সঙ্গী করে তিনি এগিয়ে চলেছেন। সংগীতের বৈচিত্র্যের মধ্যে নিজের অনুভব ও প্রকাশভঙ্গি খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা তাঁর সাধনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

তবে শুধু নিজে গান গেয়ে থেমে থাকতে চান না তিনি। সংগীতকে ছড়িয়ে দিতে চান নতুন প্রজন্মের মধ্যেও। সে কারণেই বর্তমানে সংগীত শিক্ষায় বিশেষভাবে মনোনিবেশ করেছেন সুজাতা। তাঁর কাছে সংগীত শেখানো মানে শুধু তাল-লয়-সুর শেখানো নয়, বরং একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে সৌন্দর্যবোধ, মননশীলতা, শৃঙ্খলা ও সাংস্কৃতিক চেতনা গড়ে তোলারও একটি প্রক্রিয়া।

রাগভিত্তিক সংগীত থেকে লোকগান শৈশবের গানের আসর থেকে সংগীত শিক্ষার বিস্তৃত পরিসর

আগরতলা তাঁর আত্মিক ঠিকানা

ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা সুজাতা সোমের বর্তমান ঠিকানা। কিন্তু শহরটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেবল বসবাসের নয়, এ এক আত্মিক যোগাযোগ।

বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল থেকে খুব বেশি দূরে নয় আগরতলা। ভৌগোলিকভাবে দুটি ভূখণ্ড আলাদা হলেও ভাষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, সংগীত, উৎসব ও জীবনাচরণের নানা ক্ষেত্রে রয়েছে গভীর মিল। সীমান্তের কাঁটাতার মানুষের চলাচলকে আলাদা করতে পারে, কিন্তু সংস্কৃতির স্বাভাবিক প্রবাহকে থামিয়ে দিতে পারে না।

আগরতলার সাংস্কৃতিক পরিবেশে তাই সুজাতা খুঁজে পান নিজের পরিচিত এক জগৎ। তাঁর চোখে এখানকার শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি, আচার-আচরণ এবং মানুষের জীবনযাত্রায় বাঙালিয়ানার একটি স্বতন্ত্র আবহ রয়েছে। এই সাংস্কৃতিক আবহই তাঁকে আরও অনুপ্রাণিত করে।

দুই বাংলার মানুষের মধ্যে যে ভাষা ও সংস্কৃতির আত্মিক সম্পর্ক, সুজাতা সোম সেই সম্পর্ককে অত্যন্ত কাছ থেকে অনুভব করেন। তাঁর সংগীতচর্চার মধ্যেও যেন সেই অভিন্ন সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের ছাপ রয়েছে।

রাগভিত্তিক সংগীত থেকে লোকগান শৈশবের গানের আসর থেকে সংগীত শিক্ষার বিস্তৃত পরিসর

সংস্কৃতির সেতুবন্ধনে সংগীত

সুজাতার কাছে গান কোনো সীমারেখার বিষয় নয়। সংগীত মানুষের হৃদয়ের কথা বলে। সে কারণেই তাঁর ভবিষ্যৎ ভাবনায় সংগীতের পাশাপাশি রয়েছে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা।

নতুন প্রজন্মকে সংগীতের সঙ্গে যুক্ত করা, হারিয়ে যেতে বসা লোকজ সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ তৈরি করা, শুদ্ধ সংগীতচর্চার পরিবেশ গড়ে তোলা এবং শিল্প-সাহিত্যের প্রতি তরুণদের ভালোবাসা বাড়ানো, এসব কাজের সঙ্গে নিজেকে আরও সম্পৃক্ত করার প্রত্যাশা রয়েছে তাঁর।

বিশেষ করে দুই বাংলার সাংস্কৃতিক যোগাযোগ আরও দৃঢ় করার ক্ষেত্রেও সংগীত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন তিনি। কারণ একই ভাষায় কথা বলা মানুষের হৃদয়ের অনুভূতিও অনেক ক্ষেত্রে একই সুরে বাঁধা।

বাংলাদেশ ও ত্রিপুরার মানুষের সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বহু পুরোনো। গান, কবিতা, নাটক, সাহিত্য ও লোকঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে এই সম্পর্ক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়েছে। সেই ধারাকে আরও সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে শিল্পীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সুজাতা সোম সেই দায়িত্ববোধ থেকেই নিজের সংগীতসাধনাকে আরও বিস্তৃত করতে চান।

রাগভিত্তিক সংগীত থেকে লোকগান শৈশবের গানের আসর থেকে সংগীত শিক্ষার বিস্তৃত পরিসর

শৈশবের শ্রোতা থেকে আজকের সংগীতসাধক

একসময় যিনি বাবা-মায়ের সাংস্কৃতিক আসরের এক কোণে বসে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে অন্যদের গান শুনতেন, আজ তিনি নিজেই সংগীতের একজন নিবেদিতপ্রাণ মানুষ। শৈশবের সেই কৌতূহল আজ পরিণত হয়েছে সাধনায়। যে প্রশ্ন একদিন ছোট্ট সুজাতার মনে ঘুরপাক খেত আমি কি কোনোদিন গান গাইতে পারব? জীবন তার উত্তর দিয়েছে নিজের মতো করে।

আজ তাঁর সামনে নতুন অধ্যায়। নিজের গান, সংগীত শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এই তিনটি পথকে একসঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে চান সুজাতা সোম। তাঁর প্রত্যাশা, আগামী দিনের প্রজন্ম শুধু গান শুনবে না, গানের ভেতরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মানবিকতাকেও বুঝবে। কারণ একটি গান কখনো শুধু গান নয়। একটি সুরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের স্মৃতি, মাটি, ভাষা, প্রেম, বিরহ, সংগ্রাম এবং স্বপ্ন।

মাস্টারদা সূর্যসেন ও ক্ষুদিরাম বসুর স্মৃতিবাহী ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে সুজাতা সোমের সেই স্মিত হাসি তাই যেন অন্য এক বার্তা বহন করে, ইতিহাস আমাদের শিকড়ের কথা মনে করায়, আর সংস্কৃতি সেই শিকড়কে বাঁচিয়ে রাখে।

একই আকাশের নিচে, একই বাতাসে, একই ভাষার মায়ায় আগরতলা ও বাংলার মানুষের এই সাংস্কৃতিক আত্মীয়তা আরও গভীর হোক। আর সেই সেতুবন্ধনে সুজাতা সোমের সংগীতসাধনা হয়ে উঠুক একটি নিবেদিত কণ্ঠ।

গান তাঁর কাছে মনের তাগিদে শুরু হয়েছিল। এখন সেই গানই যেন হয়ে উঠছে মানুষের সঙ্গে মানুষের, এক সংস্কৃতির সঙ্গে আরেক সংস্কৃতির এবং অতীতের সঙ্গে ভবিষ্যতের এক অনন্ত সেতুবন্ধন।