একটানে জালে ওঠে আসে ২৬ লাখ টাকার ২ হাজার ২০০টি কাঙ্খিত ইলিশ
- আপডেট সময় : ১২:১২:১৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে
ছয়দিন পর ভাগ্যের সূতোয় টান
নোনা জলে জেলের জীবন ক্ষয়, ইলিশের জালে ভাগ্য ফেরার অপেক্ষা
একদিনে ৫০ হাজার টাকা মানে অনেক। এই টাকা দিয়ে হয়তো ঘরের চাল উঠবে, সন্তানের পড়াশোনার খরচ মিটবে,
দোকানের বাকি শোধ হবে। হয়তো কয়েক দিনের জন্য ধারদেনার কাঁটা একটু নরম হবে
ভয়ংকর বিষয় হলো, মাছের ডিম ও পোনা ধ্বংসকারী ক্ষতিকর জালের ব্যবহার
অর্থাৎ আমরা শুধু সাগর থেকে মাছ তুলছি না, মাছের ভবিষ্যৎটাও তুলে ফেলছি
ছয় দিন ধরে সাগরে জাল ফেলেছেন। একবার, দুবার নয়, দিনের পর দিন। জাল উঠেছে, কিন্তু ইলিশ ওঠেনি। কখনো দু-একটি মাছ, কখনো অন্য সামুদ্রিক মাছ। ততক্ষণে ট্রলারের ডিজেল খরচ হয়েছে, বরফ গলেছে, খাবার ফুরিয়েছে, শরীর ভেঙেছে। তবু জেলেদের চোখ ছিল সাগরের দিকে। কারণ নোনা জলের এই জীবনে আশা বলতে তো ওই জালই।
ষষ্ঠ দিনে এসে ভাগ্য যেন একটু নড়েচড়ে বসে। একটানে জাল তুলতেই রুপালি ঝিলিক। একটার পর একটা ইলিশ। শেষ পর্যন্ত গুনে দেখা গেল, ২ হাজার ২০০টি। ওজন ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রামের মধ্যে। ফিশারিঘাটে বিক্রি হলো ২৬ লাখ ৪০ হাজার টাকায়।
এই রূপালী গল্প কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর নুনিয়াছটা ঘাটের। ইলিশ বোঝাই করেই ঘাটে ফেরে এফভি কুলসুমা। সাত দিনের সাগরযাত্রা শেষে সোমবার সকালে ট্রলারটি ঘাটে ভিড়তেই জেলেদের মুখে ক্লান্তির সঙ্গে মিশে ছিল স্বস্তি। ডেকজুড়ে ইলিশ, পোপা, মাইট্যা, রুপচাঁদাসহ নানা সামুদ্রিক মাছ। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো মাছ নামানোর ব্যস্ততা।
ইলিশগুলো ঝুড়িতে উঠল। সেখান থেকে গেল ফিশারিঘাটের পাইকারি বাজারে। ব্যবসায়ীরা কিনে নিলেন ২ হাজার ২০০ ইলিশ। বরফমেশানো কার্টনে মাছগুলো তোলা হলো ট্রাকে। দুপুরেই ট্রাক ছুটল ঢাকার পথে।

কিন্তু এই গল্প শুধু ২৬ লাখ ৪০ হাজার টাকার মাছ বিক্রির গল্প নয়। এই গল্পের ভেতরে আছে নোনা জলে মানুষের জীবন ক্ষয়ের গল্প। আছে সাগরে গিয়ে খালি হাতে ফেরার আতঙ্ক। আছে ধারদেনার বোঝা। আছে একেকটি মাছের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি পরিবারের হাঁড়ির আগুন।
এফভি কুলসুমার ১২ জেলের প্রত্যেকে মাছ বিক্রির পর খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ৫০ হাজার টাকা করে পাবেন। এক মৌসুমের সংসার চালানোর জন্য এই টাকা হয়তো সামান্য। কিন্তু জেলের কাছে একদিনে ৫০ হাজার টাকা মানে অনেক। এই টাকা দিয়ে হয়তো ঘরের চাল উঠবে, সন্তানের পড়াশোনার খরচ মিটবে, দোকানের বাকি শোধ হবে। হয়তো কয়েক দিনের জন্য ধারদেনার কাঁটা একটু নরম হবে।
জেলে মো. আলমগীরের কথায় সেই স্বস্তির সঙ্গে মিশে আছে দীর্ঘ হতাশা। টানা পাঁচ দিন সাগরের বিভিন্ন এলাকায় জাল ফেলেও তাঁরা ইলিশের দেখা পাননি। ষষ্ঠ দিনে মহেশখালী উপকূলে জাল ফেলতেই বদলে গেল দৃশ্য। একটানেই জালে ওঠে এলো ২ হাজার ২০০ ইলিশ।
জেলেদের ভাষায়-ভাগ্য ফিরেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ভাগ্য কি এখন আর নিয়মিত ফিরে আসে?
ইলিশ কোথায় গেল?
কক্সবাজারের জেলেদের বক্তব্য, গত কয়েক মাস ধরে ইলিশের প্রাপ্যতা আশঙ্কাজনকভাবে কম। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নিম্নচাপ, লঘুচাপসহ নানা কারণে দীর্ঘ সময় সাগরে নামতেই পারেননি তাঁরা। যখন সাগর কিছুটা শান্ত হয়েছে, তখনও প্রত্যাশামতো মাছ মেলেনি।
ফিশারিঘাটের ব্যবসায়ীদের হিসাবে, গত কয়েক দিনে কয়েক শ ট্রলার ঘাটে এসেছে। অনেক ট্রলারের জালে ২০০ থেকে ৩০০টি করে ইলিশ ধরা পড়েছে। কিন্তু সাত দিনের একটি ট্রিপে একটি ট্রলারের খরচ যেখানে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা, সেখানে মাছ বিক্রি করে আয় হচ্ছে কখনো ১ থেকে ৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ সাগরে যাওয়াই অনেক সময় লোকসানের সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই লোকসান শুধু ট্রলারমালিকের নয়। লোকসানের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগে জেলের ঘরে।
সাগরে মাছ কম মানে জেলের হাতে টাকা কম। টাকা কম মানে বাজারের বাকি বাড়ে। ধার বাড়ে। ঘরের চুলায় আগুন জ্বালানো কঠিন হয়। সন্তানকে স্কুলে পাঠানো কঠিন হয়। অসুস্থ হলে চিকিৎসা করানো কঠিন হয়।
নোনা জলে শুধু জাল ভাসে না, ভাসে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎও।

ইলিশের উৎপাদন কি সত্যিই সাড়ে পাঁচ লাখ টন?
এখানেই বড় প্রশ্ন
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দেশে ইলিশ উৎপাদন সাড়ে পাঁচ লাখ মেট্রিক টনের কাছাকাছি, এমন দাবি ও পরিসংখ্যান বহুবার সামনে এসেছে। ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির সাফল্যকে তখন বাংলাদেশের মৎস্য খাতের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে।
কিন্তু মাঠের বাস্তবতা কি সেই হিসাবের সঙ্গে মেলে?
কক্সবাজারের জেলে যখন পাঁচ-ছয় দিন জাল ফেলেও ইলিশ পান না, যখন হাজার হাজার ট্রলার ঘাটে পড়ে থাকে, যখন একটি সাত দিনের ট্রিপের খরচ ওঠানো কঠিন হয়ে পড়ে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে উৎপাদনের সেই বিপুল হিসাবের ইলিশ যাচ্ছে কোথায়?
এটি কি বাস্তব উৎপাদনের হিসাব, নাকি বিভিন্ন উৎসের তথ্য, অনুমান ও প্রশাসনিক পরিসংখ্যান মিলিয়ে তৈরি একটি কাগুজে হিসাব?
এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। কারণ দেশের মোট ইলিশ উৎপাদনের হিসাব শুধু কক্সবাজারের ঘাটের মাছ দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। নদী, মোহনা, উপকূল ও সাগরের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ইলিশ ধরা পড়ে। ফলে একটি ঘাটে মাছ কমে যাওয়া মানেই জাতীয় উৎপাদন একই হারে কমে যাওয়া নয়।
তবু মাঠের চিত্রকে উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই।
কক্সবাজার মৎস্য অবতরণকেন্দ্রের হিসাব বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেখানে মোট মাছ অবতরণ হয়েছিল ৫ হাজার ৬৫৮ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ইলিশ ছিল ১ হাজার ৬২৮ টন। পরের অর্থবছরে মোট মাছ অবতরণ নেমে এসেছে ২ হাজার ৩৯ টনে, ইলিশ ৫২২ টন।
অর্থাৎ একটি বড় অবতরণকেন্দ্রের হিসাবেই এক বছরের ব্যবধানে মাছ ও ইলিশ অবতরণে বড় পতন দেখা যাচ্ছে।
আর জেলা মৎস্য বিভাগের হিসাবে, আগের অর্থবছরে কক্সবাজারে ২০ হাজার মেট্রিক টনের বেশি ইলিশ আহরণ হয়েছিল। কিন্তু চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই থেকে আড়াই মাসে ৫০০ মেট্রিক টনও ইলিশ আহরণ হয়নি।
তাহলে সাড়ে পাঁচ লাখ টনের জাতীয় উৎপাদনের সঙ্গে এই বাস্তবতার সম্পর্ক কোথায়?
প্রশ্নটি তাই থাকছেই।

শুধু জলবায়ু নয়, দায় কি মানুষেরও?
সমুদ্রবিজ্ঞানী ও মৎস্য গবেষকদের মতে, ইলিশের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ছে। বাড়ছে সামুদ্রিক দূষণ। নদী ও উপকূলে জমছে প্লাস্টিক। সাগরে ছড়িয়ে পড়ছে ছেঁড়া জাল।
আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, মাছের ডিম ও পোনা ধ্বংসকারী ক্ষতিকর জালের ব্যবহার।
অর্থাৎ আমরা শুধু সাগর থেকে মাছ তুলছি না, মাছের ভবিষ্যৎটাও তুলে ফেলছি।
একটি ছোট ইলিশ ধরা পড়লে হয়তো আজকের বাজারে কয়েক শ টাকা আয় হয়। কিন্তু সেই মাছটি যদি বড় হওয়ার সুযোগ পেত, তাহলে তার মূল্য কয়েক গুণ হতে পারত। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, একটি প্রজননক্ষম মাছের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ভবিষ্যতের অসংখ্য ইলিশের সম্ভাবনা।
অতিরিক্ত আহরণ তাই শুধু আজকের বাজারের ক্ষতি নয়, আগামী দিনের জেলের জালও ফাঁকা করে দিতে পারে।
ঘাটে ইলিশ, তবু স্বস্তি নেই
ফিশারিঘাটে এখন ইলিশ এসেছে। ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রামের ইলিশ পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৭০০ টাকায়। এক কেজির ইলিশ ২ হাজার থেকে ২ হাজার ১০০ টাকা। ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রামের ইলিশ ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা।
ব্যবসায়ীরা ব্যস্ত। শ্রমিকেরা বরফ দিচ্ছেন। কার্টন উঠছে ট্রাকে। ট্রাক যাচ্ছে ঢাকার দিকে।
বাজারের এই ব্যস্ততার আড়ালে কিন্তু জেলেদের জীবনে নিশ্চয়তা নেই।
আজ মাছ আছে, কাল নেই।
আজ জাল ভরা, কাল জাল ফাঁকা।
আজ ৫০ হাজার টাকা, কাল হয়তো পাঁচ হাজারও নয়।
এই অনিশ্চয়তাই নোনা জলের মানুষের নিয়তি।
কুলসুমার জেলেরা ভাগ্যবান। ছয় দিনের অপেক্ষার পর তাঁদের জাল ভরে উঠেছে। ২ হাজার ২০০ ইলিশ তাঁদের কাছে শুধু মাছ নয়, একটি স্বস্তির নিঃশ্বাস। কিন্তু কক্সবাজারের হাজার হাজার জেলের কাছে প্রশ্নটি আরও বড়।
আগামী জালে কী উঠবে?
ইলিশ, নাকি শুধু নোনা জল?
কারণ সাগর থেকে যখন মাছ কমে যায়, তখন জেলের জীবনও ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়। নোনা জল শরীর ভেজায়, রোদ চামড়া পোড়ায়, ঢেউ বুক কাঁপায়। আর খালি জাল মানুষের ভেতরটা ফাঁকা করে দেয়।
তাই ২ হাজার ২০০ ইলিশের এই গল্প আনন্দের হলেও, এর ভেতরেই লুকিয়ে আছে একটি সতর্কবার্তা, সাগরকে বাঁচাতে না পারলে, একদিন হয়তো কুলসুমার মতো একটি ট্রলারও জালভরা ইলিশ নিয়ে ফিরবে না।
তখন ভাগ্যের সূতোয় টান দিলেও জালে উঠবে না কাঙ্ক্ষিত রুপালি মাছ।
উঠবে শুধু সমুদ্রের লোনা জল।


















