বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৮:৪৩ অপরাহ্ন

সিরিজ বোমা বিস্ফোরণ এবং জামায়াতের রাজনীতি

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)
  • Update Time : মঙ্গলবার, ১৭ আগস্ট, ২০২১
  • ২২ Time View

একটা মৌলিক প্রশ্নের উত্তর সম্পর্কে অনেক ভেবেও আমি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছি না। বিএনপির হাত ধরে বাংলাদেশে জামায়াতের জন্ম, নাকি জামায়াতের মস্তিষ্ক থেকে বিএনপির জন্ম? জামায়াতের জন্ম আবুল আলা মওদুদীর হাত ধরে ভারতবর্ষে ১৯৪১ সালে। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর মওদুদী পাকিস্তানে এসে জামায়াত-ই-ইসলাম পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেন। অনেক ক্রিটিক মনে করেন, মওদুদী ছিলেন একজন সুপারক্লাস ইভিল জিনিয়াস। তাঁর লিখিত প্রবন্ধ ও বই পড়ে অনেক উচ্চ ডিগ্রিধারী শিক্ষিত মানুষ সুপারধর্মীয় অন্ধত্ববরণ করেছেন। নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির আড়ালে ভায়োলেন্স ও  হত্যাযজ্ঞকেই রাজনীতির মৌলিক অনুষঙ্গ ও নীতি হিসেবে গ্রহণ করেন মওদুদী। ১৯৫৩ সালে মওদুদীর হুকুমে করাচি ও আশপাশের এলাকায়

৫০ হাজার কাদিয়ানিকে হত্যা করা হয়। পাকিস্তানের হাইকোর্ট তখন মওদুদীকে ফাঁসির দণ্ড দেন। কিন্তু সৌদি আরবের কৃপায় সেবার তিনি বেঁচে যান। একাত্তরে জামায়াত-ই-ইসলাম পূর্ব পাকিস্তান শাখার সভাপতি ছিলেন গোলাম আযম। ১৯৭১ সালের শেষ দিকে গোলাম আযম পাকিস্তানে পালিয়ে যান। বাহাত্তরের সংবিধানের মৌলিক আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষতা এবং তার রক্ষাকবচ হিসেবে সংবিধানের ১২ ও ৩৮ অনুচ্ছেদের শর্তানুযায়ী জামায়াতের রাজনীতি বাংলাদেশে চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু মওদুদীর পরামর্শে গোলাম আযম পূর্ব পাকিস্তান

পুনরুদ্ধার আন্দোলন শুরু করেন। ১৯৭৮ সালে পাকিস্তানের পাসপোর্ট নিয়ে গোলাম আযমকে বাংলাদেশে আসার অনুমতি দেন জিয়াউর রহমান। গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণীয় বিষয় হলো পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার আন্দোলন বাতিল না করে তিনি বাংলাদেশে আসতে পারলেন। গোলাম আযম আসার কয়েক মাসের মাথায় সংবিধান থেকে মৌলিক আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষতা, অনুচ্ছেদ ১২ ও ৩৮ এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, দর্শন, চেতনা বলতে যা বোঝায় তার সব কিছু জিয়াউর রহমান সামরিক আদেশ দ্বারা বাতিল করে দিলেন, যেটি পরে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে সন্নিবেশিত করেন।

রাষ্ট্র ও রাজনীতি সম্পর্কিত এই কাজগুলো যখন করলেন, অথবা তার আগে রাজনীতি ও জনগণের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের কোনো সম্পর্ক ছিল না। তাহলে জনগণ রচিত সংবিধান থেকে তিনি সামরিক আদেশ দ্বারা সব কিছু বাতিল করে দিলেন কেন? নিশ্চয় কোনো পক্ষ অথবা কেউ তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, এরা কারা? গোলাম আযম আসার কয়েক মাসের মধ্যে জিয়াউর রহমান বিএনপি গঠনসহ ত্বরিতগতিতে কাজগুলো করে ফেললেন। পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে যে অজুহাতেই গোলাম আযম বাংলাদেশে আসুক না কেন, তা যে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা

আইএসআইয়ের পরামর্শে করেছেন তা বোধ করি বলার অপেক্ষা রাখে না। নতুন নামে একটা দল আবির্ভূত হওয়ায় মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সব পক্ষ, গোষ্ঠী ও ব্যক্তি নতুন প্রাণ পেয়ে বিএনপিতে ঝাঁপিয়ে যোগদান করলেন। রেডিমেড একটা জনসমর্থন বিএনপি সঙ্গে সঙ্গে পেয়ে গেল। সঙ্গে সমান্তরালভাবে জামায়াতও রাজনীতি করার সুযোগ পেল। গোলাম আযম যে লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন তার প্রধান ও প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জিত হয়ে গেল। মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের হাত দিয়ে সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশকে হত্যা করাসহ এক ঢিলে অনেক শিকার করে নিল। গোলাম আযম ভালো করে জানতেন, জামায়াত নামটির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের

প্রচণ্ড ঘৃণা ও অ্যালার্জি রয়েছে। সুতরাং মিশন বাস্তবায়নে নতুন নামের রাজনৈতিক দল প্রয়োজন, যা তিনি সহজেই জিয়াউর রহমানের মাধ্যমে পেয়ে যান। অপকর্মের দায় যাবে বিএনপির বিরুদ্ধে, তবে তার ষোলো আনা ফসল উঠবে জামায়াতের ঘরে। এই কৌশলের অংশ হিসেবে ২০০১-০৬ মেয়াদে জামায়াতের দুই প্রধান নেতা নিজামী আর মুজাহিদ মন্ত্রী হয়ে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শসংবলিত রাজনীতি বাংলাদেশ থেকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা এবং এক পর্যায়ে তাদের মূল এজেন্ডা বাংলাদেশকে পুনরায় পাকিস্তানের সঙ্গে সংযুক্ত করার মিশন নিয়ে মাঠে নেমে পড়েন এই মিশন বাস্তবায়নে তারা চারটি লক্ষ্য নির্ধারণ করে।

এক. আওয়ামী লীগকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে। দুই. হিন্দু সম্প্রদায়ের সব মানুষকে দেশছাড়া করতে হবে। তিন. মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে নিবেদিত বুদ্ধিজীবী, লেখক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের হত্যা এবং তার মাধ্যমে ভয়-ভীতি ও ত্রাস সৃষ্টি করতে হবে, যাতে সবাই লেখালেখি ও কথাবার্তা বন্ধ করে দেয়। চার. সশস্ত্র জঙ্গিদের গ্রেনেড-বোমা দিয়ে মাঠে নামাতে হবে, তাতে উপরোক্ত তিন লক্ষ্য যেমন বাস্তবায়িত হবে, তেমনি বৃহত্তর জনমানুষ ভয়ে নিশ্চুপ হয়ে গেলে তাদের সামনে আর কোনো বাধা থাকবে না।

উপরোক্ত বক্তব্যের পক্ষে কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরি। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড আক্রমণ এবং আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় নেতা আহসানউল্লাহ মাস্টার, মনঞ্জুরুল ইসলাম, মমতাজউদ্দিন ও সাবেক অর্থমন্ত্রী শামস কিবরিয়াকে হত্যা করার লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগকে শেষ করে দেওয়া। উপরোক্ত তৃতীয় লক্ষ্য অর্জনের অংশ হিসেবে অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদকে

আক্রমণ ও হত্যা করা হয়। দেশের একটি ইংরেজি দৈনিকে ২০০১ সালের ১৩ নভেম্বর খবর ছাপা হয়, অক্টোবরের নির্বাচনের পরপর ভোলার চরফ্যাশনে এক রাতে ২০০ হিন্দু মহিলাকে গণধর্ষণ করা হয়। বিশ্বের সেরা পত্রিকা দ্য ইকোনমিস্ট ২০০৩ সালের ২৩ নভেম্বর শিরোনাম করে  ‘In Bangladesh religious minorities are safe only in the departure lounge.’ বাংলাদেশের মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়, বিএনপির কাঁধে চড়ে জামায়াত অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে। একই সময়ে তারা জোরেশোরে প্রচার শুরু করে, বাংলাদেশে কোনো মুক্তিযুদ্ধ হয়নি; ওটা ছিল ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। মানুষের মনে ভয়-ভীতি সৃষ্টি করতে জঙ্গিরা ২০০৫ সালের ১৭

আগস্ট একযোগে এবং প্রায় একই সময়ে দেশব্যাপী ৬৩টি জেলায় ৫২৫টি স্থানে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। বোমা বিস্ফোরিত স্থানে চিরকুট পাওয়া যায়, সেখানে লেখা জেএমবি (জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ), যেটি জামায়াতের গোপনীয় নিজস্ব সশস্ত্র সংগঠন। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পরবর্তী সময়ে যারা গ্রেপ্তার হয়েছে তাদের বেশির ভাগই ছাত্রশিবিরের

সদস্য। একবার ভেবে দেখুন, একযোগে একই সময়ে ৫২৫ স্থানে বোমা স্থাপন এবং তার বিস্ফোরণ ঘটানো চাট্টিখানি কথা নয়, বিশাল কর্মযজ্ঞ। কত লোক এর সঙ্গে জড়িত হতে হয়; তার সমন্বয় সাধন, শলাপরামর্শ, বিস্ফোরক দ্রব্য বহন ও স্থাপন ইত্যাদি কর্মযজ্ঞ রাষ্ট্রের এত গোয়েন্দা সংস্থার নজর কিভাবে এড়িয়ে গেল।

জামায়াত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় না থাকলে এটা কি সম্ভব হতো? নিজামী ও মুজাহিদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন। নিজামী প্রথমে কৃষি ও পরে শিল্পমন্ত্রী ছিলেন। আর মুজাহিদ ছিলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। এই দুটি মন্ত্রণালয়ের বিস্তৃতি ও নেটওয়ার্ক রয়েছে তৃণমূল পর্যন্ত। রাষ্ট্রীয় এই নেটওয়ার্কের সহায়তা ছাড়া এত স্থানে একযোগে বোমা বিস্ফোরণ এত নির্বিঘ্নে

ঘটানো সম্ভব হতো না। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্টের ঘটনাসহ আরো অনেকগুলো গ্রেনেড আক্রমণের ফলে বিশ্বের বড় বড় পত্রিকা শঙ্কিত হয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বাংলাদেশ সম্পর্কে সতর্ক করার জন্য একের পর এক প্রতিবেদন ছাপতে থাকে। ২০০২ সালের ২ এপ্রিল

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রতিবেদন ছাপে, যার শিরোনাম ছিল—‘পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশেও ভয়ংকর হয়ে উঠছে ইসলামিস্ট জঙ্গিগোষ্ঠী’। ২০০২ সালের ৪ এপ্রিল ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউতে বার্টিন লিন্টনের বিশাল প্রতিবেদন ছাপা হয়, যার শিরোনাম ছিল—‘বাংলাদেশ থেকে সাবধান, সেখানে এখন জঙ্গিগোষ্ঠীর আস্তানা’। তারপর ২০০২ সালের ১৪ অক্টোবর টাইম ম্যাগাজিনে ছাপা হয় আলেক্স পেরির প্রতিবেদন—‘উবধফষু পধত্মড়’. যার সূত্রে বিশ্বের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেন, বাংলাদেশ হবে পরবর্তী আফগানিস্তান। তখন বিএনপির প্রভাবশালী শরিক ইসলামী ঐক্যজোটের নেতাকর্মীরা স্লোগান দেওয়া শুরু করে,

‘আমরা সবাই তালেবান, বাংলা হবে আফগান’। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্টে আশকারা পাওয়ার পর জঙ্গিগোষ্ঠী আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একের পর এক আদালতের ওপর আক্রমণ চালায়। স্লোগান দিতে থাকে, তাগদি অর্থাৎ মানুষের তৈরি আইন তারা মানবে না। ২০০৫ সালের ৩ অক্টোবর প্রায় একই সময়ে লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর ও

চট্টগ্রাম জেলা আদালতে জেএমবি আক্রমণ চালায়। ২৯ নভেম্বর গাজীপুর আইনজীবী সমিতির হলঘরের ভেতরে বোমা ও গ্রেনেড হামলা হয়। ১৪ নভেম্বর ঝালকাঠি আদালত প্রাঙ্গণে আক্রমণ হয়। তাতে সোহেল চৌধুরী ও জগন্নাথ পাঁড়ে নামের দুজন বিচারক নিহত হন। মানুষের মনে প্রশ্ন

ওঠে, আদালত প্রাঙ্গণ একটি সুরক্ষিত এলাকা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত এলাকা, সেখানে জঙ্গিরা কী করে প্রবেশ করে এবং গ্রেনেড-বোমা আক্রমণ চালিয়ে নির্বিঘ্নে চলে যায়। রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ বিচারালয়ের ওপর এতগুলো রক্তাক্ত আক্রমণ হওয়ার পর পুলিশ বাহিনীসহ রাষ্ট্রের কোনো সংস্থাই জঙ্গিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর কোনো অ্যাকশনে গেল না। পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র নিশ্চুপ থাকল। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তখনকার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর প্রিয় উত্তর ছিল—‘উই আর লুকিং ফর শত্রুজ।’

২০০৫ সালের ১৭ আগস্টের সিরিজ বোমা বিস্ফোরণ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে হত্যা করার যে নীলনকশা তারা তৈরি করেছে, তারই অংশ হিসেবে সেদিন ৫২৫ স্থানে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। ২০০৫ সাল থেকে আজ ২০২১—এই ১৬ বছরে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির চিত্রেও অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু বাংলাদেশকে হত্যা করার নেক্সাসের সঙ্গে

জড়িত তিন পক্ষের লক্ষ্যগত অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই, জামায়াত ও বিএনপি আজও একই অক্ষে আছে। তারা বহু ষড়যন্ত্রের জাল পাতার চেষ্টা অব্যাহতভাবে করে যাচ্ছে। তবে তারা কতটুকু কী করতে পারবে তা নির্ভর করছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকা রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক শক্তিগুলো কতটা সতর্ক থাকছে এবং দূরদৃষ্টি দেখাতে পারছে তার ওপর। ঋণি স্বীকার কালের কন্ঠ

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

sikder52@gmail.com

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2017 voiceekattor
কারিগরি সহযোগিতায়: সোহাগ রানা
11223