সোমবার, ১৬ মে ২০২২, ১১:০৩ পূর্বাহ্ন

World Voice Day : বিশ্বকণ্ঠ দিবস : ‘আপনার কন্ঠস্বরকে উন্নত করুন’ পরামর্শ নিয়ে হাজির

Reporter Name
  • প্রকাশ: শুক্রবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২২
  • ১৫০

অধ্যাপক ডা.মনিলাল আইচ লিটু

‘যুক্তরাষ্ট্রে ২৯ ভাগ বা প্রায় ৭৫ লাখ মানুষ জীবনে কোনও না কোনও সময় কণ্ঠের সমস্যায় ভুগে থাকেন। এতে যে কর্মক্ষমতা নষ্ট হয় তার অর্থমূল্য প্রায় ২বিলিয়ন ডলার। বছরে প্রতি ১৩জনে ১জন এই সমস্যায় পড়েন। নারীরাএবং ছেলেশিশুরা এই সমস্যায় বেশি আক্রান্ত হন। যুক্তরাষ্ট্রের শিশুদের ৮-৯ ভাগ শিশু কণ্ঠের সমস্যায় ভুগে। এদের মধ্যে পাঁচ ভাগ শিশুর উচ্চারণের জটিলতা রয়েছে। অন্যান্য জরিপে দেখা যায়, দেশটির ৪৬ দশমিক শূন্য ৯ ভাগ কণ্ঠশিল্পী, ৪৫ভাগ কলসেন্টারের কর্মী কণ্ঠের সমস্যার কারণে কর্মক্ষেত্রে ক্ষতি গ্রস্ত হন’

অধ্যাপক ডা.মনিলাল আইচ লিটু

দেখা যায়না মোটেও, অথচ এর অস্তিত্ব ছাড়া অসম্পূর্ণ জীবন। অতি গুরুত্বপূর্ণ এই যোগাযোগ যন্ত্রটির নাম কণ্ঠ। মানুষে মানুষে যোগাযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম এটি।একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব কেমন তার অনেকটা নির্ভর করে কণ্ঠের স্বরের ওপরে। মনের ভাব প্রকাশে সবচেয়ে কার্যকরী মাধ্যম এই কণ্ঠকে যে যতটা কাজে লাগাতে সক্ষম হন তার সাফল্যও আসেত তটাই। তাই নিজের সুস্থ থাকার পাশাপাশি প্রতিদিন কণ্ঠস্বরেরও যত্ন প্রয়োজন।

অকারণ চিৎকার

অকারণ চিৎকার যেমন কণ্ঠস্বরকে নষ্ট করে দেয় তেমনই গলার যত্ন না নিলে বাসা বাঁধতে পারে রোগব্যাধিও। কণ্ঠের এই যত্ন নেওয়ার বিষয়টিকে সামনে আনতে প্রতিবছর ১৬ এপ্রিল বিশ্বজুড়ে পালন করা হয়ে থাকে ‘বিশ্বকণ্ঠদিবস’। সচেতনতা বাড়াতে বাংলাদেশেও দিনটি পালন হয় গুরুত্ব দিয়ে।

ভোরের আজানের শব্দে ঘুম ভাঙে অনেকের। কারও ঘুম ভাঙে ফেরিওয়ালার ডাকে। অনেকেই যেখানেই থাকেন সময় পেলেই গান শুনতে চান।বাসায় বাবা-মায়ের আদেশ উপদেশ, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের পড়ানো, কর্মক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের কাজ উপস্থাপনা (প্রেজেন্টেশন), বিশেষ করে কারো মনোযোগ আকর্ষণ ইত্যাদি সারাদিনে যত ধরনের কাজ রয়েছে, সংসারে-কর্মক্ষেত্রে যত বিনোদন, যতো প্রার্থনা, যত অভিব্যক্তি, যত উপভোগ তার বেশিরভাগই শব্দনির্দেশিত। রাগ, হাসি, ক্ষোভ, কান্না সব কিছুর সঙ্গে মিশে আছে শব্দ। আর শব্দের উৎসস্থল হচ্ছে কণ্ঠ।

যুক্তরাষ্ট্রে ২৯ ভাগ মানুষ কণ্ঠের সমস্যায়

যুক্তরাষ্ট্রে ২৯ ভাগ বা প্রায় ৭৫ লাখ মানুষ জীবনে কোনও না কোনও সময় কণ্ঠের সমস্যায় ভুগে থাকেন। এতে যে কর্মক্ষমতা নষ্ট হয় তার অর্থমূল্য প্রায় ২বিলিয়ন ডলার। বছরে প্রতি ১৩জনে ১জন এই সমস্যায় পড়েন। নারীরাএবং ছেলেশিশুরা এই সমস্যায় বেশি আক্রান্ত হন।যুক্তরাষ্ট্রের শিশুদের ৮-৯ ভাগ শিশু কণ্ঠের সমস্যায় ভুগে।এদের মধ্যে পাঁচ ভাগ শিশুর উচ্চারণের জটিলতা রয়েছে। অন্যান্য জরিপে দেখা যায়, দেশটির ৪৬ দশমিক শূন্য ৯ ভাগ কণ্ঠশিল্পী, ৪৫ভাগ কলসেন্টারের কর্মী কণ্ঠের সমস্যার কারণে কর্মক্ষেত্রে ক্ষতি গ্রস্ত হন।

বাংলাদেশেও কণ্ঠের ওপর সুনির্দিষ্ট গবেষণা এখনও হয়নি। তবে কণ্ঠদিবস পালন এবিষয়ে বিশ্বজুড়েই প্রতি বছরেই সচেতনতা আনছে। ১৯৯৯সালে ব্রাজিলে প্রথম ১৬ এপ্রিল বিশ্ব কণ্ঠ দিবস পালিত হয়। আর ধারণাটি লুফে নেওয়ায় ২০০২ সাল থেকেই বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হচ্ছে। দিবসটি উপলক্ষে এবছরের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘আপনার কন্ঠসরকে উন্নত করুন’।

বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত কণ্ঠস্বরের সমস্যাগুলো নিয়ে তেমন কোন গবেষণা হয়নি। তবে,আমরা সাধারণ নাগরিকদের কণ্ঠস্বরের যত্ম নেওয়ার ক্ষেত্রে সচেতনতাকে গুরুত্ব দিচ্ছি। কণ্ঠকে শুধুমাত্র যোগাযোগের প্রধান উপায় ভাবলে ভুল হবে। বাক্যের ভাব প্রকাশের ক্ষেত্রে কণ্ঠের ওঠা-নামা আমাদের ব্যবহার করা শব্দের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।আপনার কথা কী প্রভাব সৃষ্টি করবে তার ৩৮ভাগ নির্ভর করে কণ্ঠের ওঠানামার অপর। দৈনন্দিন সাংসারিক বা কর্মক্ষেত্রে কথা বার্তার জন্য ভালো কণ্ঠের গুরুত্ব অনেক বেশি।

জীবন যাপনের কণ্ঠ

জীবন যাপনের ছাড়াও কণ্ঠ যোগাযোগ, জীবন যাপন এবং জীবিকা অর্জনের জন্যও অতি প্রয়োজন। আইনজীবী, শিক্ষক, খবরপাঠ, সাংবাদিক, কণ্ঠশিল্পীসহ প্রত্যেক মানুষেরই সুন্দর কণ্ঠ প্রয়োজন। সেকারণে আমরা কণ্ঠস্বরের নিয়মিত যত্ম নিতে বলি। যত্ম নেওয়ার পাশাপাশি কোনও ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে সেটার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। আবার রোগ হয়ে গেলে সেটার জন্য চিকিৎসা রয়েছে। কিছু টিউমারাসকন্ডিশন আছে যেগুলোর জন্য সার্জারি প্রয়োজন হয়ে থাকে।

কণ্ঠেরে যত্ন নেওয়া

জোরে কথা না বলা, কণ্ঠের অপব্যবহার, অতিরিক্ত ব্যবহার এগুলো থেকে দূরে থাকতে হবে। আমরা দেখি যে, অনেক ছোট শিশু বিশেষ করে কোরআনে হাফেজ যারা এদেরকে বোধ হয় জোরে পড়তে হয়। এদের জোরে পড়ার কারণে আমরা ভয়েসের ভোকাল কর্ডে সমস্যা দেখতে পাই। দীর্ঘ দিন জোরে পড়লে কণ্ঠে নডিউল হয়। সেটি প্রাথমিক অবস্থায় আসলে বড় সমস্যা দেখা দেয় না। রোগ বেড়ে গেলে টিউমার হলে সেটা সার্জারি করে ফেলতে হয়। যেহেতু কণ্ঠস্বর যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম তাই আমরা এটির যত্ম নেওয়ার জন্য বলি।

কণ্ঠের ঠিক মতো যত্ম না নিলে কণ্ঠ নালীর প্রদাহ, কণ্ঠস্বরের অতিব্যবহারের কারণে পলিপ, নডিউল বাসিস্ট, রক্তক্ষরণ সৃষ্টি হওয়া এবং কন্ঠনালীর ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। কণ্ঠ ভালো রাখতে এর যত্ম নেওয়ার বিকল্প নেই। এজন্য সবার আগে দরকার সচেতনতা। অনেকেই জানেনা যে তাদের পেশার জন্য সুস্থ ও সুন্দর কণ্ঠকতটা জরুরি।নিজের কণ্ঠ নিজে শুনতে হবে, যেন কোনও সমস্যা তাড়াতাড়ি আন্দাজ করা যায়। সমস্যা ৩ সপ্তাহের বেশি থাকলে নাক কান গলা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। কণ্ঠের সুস্থতার জন্য প্রতিদিন অন্তত দুই লিটার জল পান করতে হবে।

ঘুমাতে যাবার দুই ঘন্টা আগে খাবার

অতি উচ্চ বা পরিবর্তিত স্বরে কথা বলা যাবেনা। অ্যালকোহল, কফি, চা, কোমলপানীয় শরীরের কোষে জলশূন্যতা ঘটায়। তাই এসব খেলেও অল্প পরিমাণে খেতে হবে। ধূমপান এবং অ্যালকোহল, তামাক, গাঁজা, পান খাওয়াসহ অন্যান্যনেশা সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলতে হবে। ঘুমাতে যাওয়ার কমপক্ষে ২ঘণ্টা আগে খাওয়া শেষ করতে হবে এবং অল্প আহার করতে হবে। ফোনে বেশি ক্ষণ কথা বলা যাবে না। অপ্রয়োজনে বারবার গলা পরিষ্কার বা কাশি দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। উড়োজাহাজে চলাচলের সময় বাতাস শুষ্ক থাকে।এসময় কফি, চা, কোমল পানীয় এড়িয়ে চলতে হবে এবং প্রতিঘণ্টায় কমপক্ষে ৮আউন্স জল পান করতে হবে। অনেক সময় গলা শুকনা থাকলে অথবা মিউকাস জমে থাকলে আমরা জোরে কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করার চেষ্টা করি যা অত্যন্ত ক্ষতিকর। এজন্য প্রথমে বুক ভরে শ্বাস নিয়ে কিছুক্ষণ ধরে রাখতে হবে এবং শ্বাসছাড়ার সময় আস্তে শব্দ করে ছাড়তে হবে।

কি ব্যবহার করা যাবে কি যাবে না

এছাড়াও তিনি বলেন, এলার্জি বা ঠাণ্ডার সমস্যায় এন্টিহিস্টামিন ঔষধ ব্যবহার করা যাবেনা। সম্ভব হলে এগুলো এড়িয়ে স্টেরয়েড স্প্রে নাকে ব্যবহার করতে হবে। স্থানীয় চেতনানাশক যথেচ্ছ ব্যবহার করা যাবেনা। ধোঁয়া, ধুলা, দূষিত বাতাস এড়িয়ে চলতে হবে। কণ্ঠশিল্পীদের গান গাওয়ার সময় শারীরিক, মানসিক অবসাদমুক্ত থাকতে হবে।এসময় হাল্কা গরম জল দিয়ে গড়গড়া করতে নেওয়া যেতে পারে। সই সেঙ্গে নিয়মিত ব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত ঘুমাতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক ডা.মনিলাল আইচ লিটু এমবিবিএস (ডিএমসি), এমএস (ইএনটিএন্ডহেড-নেকসার্জারী) এফআরসিএস (গ্লাসগো), এফএসিএস (আমেরিকা), ফেলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, এন্ডোস্কপিকসার্জারী মাইক্রোইয়ারসার্জারী, ভয়েজসার্জারী, থাইরয়েডসার্জারী, লেজার, রবোটিকএন্ডস্লিপঅ্যাপনিয়া, সার্জারীতে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত (ইউএসএ, ভেলোর, মাদ্রাজ, মুম্বাই, দিল্লী ও সিংগাপুর), সাবেক অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইএনটিএন্ড হেড নেকসার্জারী বিভাগ স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেলকলেজ, ঢাকা এবং মুগদামেডিকেল কলেজ, ঢাকা। বর্তমানে অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2017 voiceekattor
কারিগরি সহযোগিতায়: সোহাগ রানা
11223