সোমবার, ১৬ মে ২০২২, ১১:০২ পূর্বাহ্ন

Salinity : সুন্দরবনের বাঘের চেয়েও ভয়ঙ্কর উপকূল অঞ্চলের লবণাক্ততা!

Reporter Name
  • প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১০ মে, ২০২২
  • ৬৫

ঢাকায় সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলন আয়োজিত  সাংবাদিক বৈঠক

‘অতিরিক্ত লবণাক্ত জলপানে নারীদের জরায়ু নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, ফলে তা কেটে ফেলে দিতে হচ্ছে, একারণে অনেক নারীই মাতৃত্ব হারাচ্ছেন’

এ. এইচ. ঋদ্ধিমান, ঢাকা

ঘূণিঝড় আইলা, সিডর আর আম্ফানের মতো প্রাকৃতিক ঝড়-জলচ্ছ্বোসে তছনছ হয়ে গিয়েছে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল। বার বার প্রাকৃতিক আঘাতে ক্ষতবিক্ষত অঞ্চলটিকে ঢাল হয়ে রক্ষা করছে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন। খুলনা-সাতক্ষীরা উপকূল অঞ্চলের মানুষের কাছে সুন্দরবনের বাঘের চেয়েও ভয়ঙ্কর রূপে হামলে পড়ছে লবনাক্ততা! অতিরিক্ত লবণাক্ত জলপানে নারীদের জরায়ু নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে তা কেটে ফেলে দিতে হচ্ছে। একারণে অনেক নারীই মাতৃত্ব হারাচ্ছেন।

২০২১ সালের একটি গবেষণা : সংগ্রহ

এখানে প্রতিনিয়ত বাস্তুচ্যুতির ঘটনার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লবণাক্তাতা। বর্তমান পরিস্থিতি খুবই নাজুক। মানবদেহে সহনীয় মাত্রার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি লবণাক্তাতার কারণে বিভিন্ন বয়সের নারী-শিশুদের অবস্থা দুর্বিসহ। শিক্ষার দিক থেকে পিছিয়ে পড়া এই অঞ্চলের মানুষ এখন খাদ্য চায় না। তারা বাকী জীবনটা নিশ্চিন্তে বসবাস চান। উপকূল অঞ্চলের মানুষের দাবি একটাই, বিশুদ্ধ খাবার জল এবং টেকসই বাঁধ নির্মাণে বিশেষ বাজেট বরাদ্দ।

মঙ্গলবার সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলন ঢাকায় সাংবাদিক বৈঠক  করে এমন গা হিম করা তথ্য তুলে ধরেন লিডার্স-এর নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার মন্ডল।  মূল প্রবন্ধে মোহন  বাবু যেতথ্য উপস্থাপন করেন তাতে এলাকার পরিস্থিতি যে মোটেও ভালো নয়, তার প্রমাণ মিলে ২০২১ সালের গবেষণায়ও।

দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থিত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন। যা সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসসহ নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবল থেকে উপকূলীয় অঞ্চলকে ঢাল হিসেবে রক্ষা করে আসছে। সাংবাদিক বৈঠকে  বক্তব্য রাখেন সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয় নিখিল চন্দ্র ভন্দ্র।

প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাঘেরহাট হচ্ছে নানাজাতের চিংড়ি, কাঁকড়া-কুচিয়ার মতো বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম ভান্ডার। মানুষ ও সম্পদ রক্ষায় সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাঘেরহাট জেলাকে জলবায়ু জুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণার দাবি জানানোও হয়।

২০২১ সালের শেষ ভাগে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ এবং ব্র্যাক সূত্রের বরাতে এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মোংলার জলে মাত্রাতিরিক্ত লবণ ছড়িয়ে পড়েছে। পশুর নদের মোংলা পয়েন্টে ১৯৬২ সালে লবণাক্ততার পরিমাণ ছিল ২ পিপিটি (পার্টস পার থাউজেন্ড)। শূন্য পিপিটির লবণ জল বিশুদ্ধ বলা হলেও ২০০৮ সালে তা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ২০ পিপিটিতে।

বাগেরহাট জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের তথ্যে বলা হয়েছে, উপকূলীয় এলাকায় প্রতি লিটার জলে লবণাক্ততার গ্রহণযোগ্য মাত্রা ১ হাজার মিলিগ্রাম। কিন্তু মোংলায় প্রতি লিটার জলে ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৯ হাজার মিলিগ্রাম পর্যন্ত লবণাক্ততা মিলেছে। নদী, খাল, বিল ছাড়াও ভূগর্ভস্থ জল পর্যন্ত অতিমাত্রায় লবণাক্ত। উপজেলায় ১ লাখ ৩৩ হাজার জনসংখ্যার মধ্যে মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষের সুপেয় জলের ব্যবস্থা রয়েছে। বাকি ৮৫ শতাংশ মানুষ লবণ জল অথবা বৃষ্টির জল বা অন্য উৎস থেকে চাহিদা মেটায়

বিশেষজ্ঞদের মতে মোংলার একজন মানুষ প্রতিদিন গড়ে দুই লিটার জল পান করেন। তাতে ১৬ গ্রাম লবণ গ্রহণ করে থাকে। যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ ‘একজন মানুষ দিনে সর্বোচ্চ পাঁচ গ্রাম লবণ’ গ্রহণ করতে পারে। মোংলার জলে লবণ ছাড়াও মাত্রাতিরিক্ত আয়রন, আর্সেনিক ও ফ্লোরাইড পাওয়া গিয়েছে বলেও জানান তারা।

লন্ডন ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ম্যাপলক্রাফট বিশ্বের ১৭০টি দেশের ওপর জরিপ চালিয়ে সর্বাপেক্ষা ঝুঁকিপূর্ণ ১৬টি দেশ চিহ্নি করে। যার শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। এই অঞ্চলে ৩৫ বছরে লবণাক্ততা ২৬ ভাগ বেড়ে গিয়ে ২ থেকে ৭ পিপিটিতে দাঁড়িয়েছে। বিজ্ঞানিদের আশঙ্কা দিন দিন যে হারে উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিজড়, জলোচ্ছ্বাসের পাশাপাশি লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে ২১০০ সালের মধ্যে এই অঞ্চলের প্রায় ৮৩৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে!

অতিরিক্ত লবণাক্ততা বছরে ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ হারে ফলস উৎপাদন কমে যাচ্ছে। উপকূল অঞ্চলে নারী-শিশুদের উন্নয়নে কাজ করা সমাজ কল্যাণ উন্নয়ন সংস্থার (স্কাস) চেয়ারম্যান জেসমিন প্রেমা তার অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, যে কোন দুর্যোগে নারী-শিশুরাই ক্ষতিগ্রস্ত তালিকায় ওঠে আসে। একারণে দিন দিন সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের হার উচ্চমুখি।

নিখিল চন্দ্র ভদ্র বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল অঞ্চল খুবই  সংকটে রয়েছে। লবণাক্ততার পাশাপাশি প্রায় প্রতিবছর প্রকৃতিক দুর্যোগ হানা দিচ্ছে। এই অঞ্চলে প্রতিনিয়ত বাস্তুহারার সংখ্যা বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী সকল শ্রেণীর মানুষকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি যেসব অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের আশঙ্কা  রয়েছে তার সুরক্ষা দাবি করেন নিখিল বাবু।

সাতক্ষিরা অঞ্চলের খাবার জলের সন্ধ্যানে : ছবি সংগ্রহ

নৌ সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে বলেন, খুলনা-সাতক্ষীরা ও আশপাশ উপকূলীয় অঞ্চলের জনসংখ্যা সাড়ে চারকোটি। এই অঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠীকে রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

নিখিল চন্দ্র ভদ্রের সঞ্চালনায়  বক্তব্য রাখেন এডাব পরিচালক জসীম উদ্দীন, উন্নয়ন ধারা ট্রাস্টের সদস্য সচিব আমিনুর রসুল বাবুল, ডিআরইউ’র সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম আজাদ,  বিএমএ দপ্তর সম্পাদক ডা. মো. শহীদুল্লাহ, স্ক্যান সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মুকুল, ফেইথ ইন একশন’র কর্মসূচী সমন্বয়কারী তীমন বাড়ই, সচেতন সংস্থার সাকিলা পারভীন, মৃত্তিকা সমাজ উন্নয়ন সংগঠনের খাদিজা খাতুন, ঢাকাস্থ পাইকগাছা সমিতির জাহাঙ্গীর আলম প্রমূখ।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2017 voiceekattor
কারিগরি সহযোগিতায়: সোহাগ রানা
11223