শুক্রবার, ১৯ অগাস্ট ২০২২, ০৫:২৮ অপরাহ্ন

Plastic pollution in the sea  :  সাগরে প্লাস্টিক দূষণ রোধে ‘রোবট ফিশ’

Reporter Name
  • প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১২ জুলাই, ২০২২
  • ৮২

দূষণ সনাক্তকারী রোবোটিক মাছ  : ছবি সংগ্রহ

ড. বিরাজলক্ষী ঘোষ

‘২০২৫ সালের মধ্যে প্রতি ৩ টন মাছের বিপরীতে সমুদ্রে ১ টন প্লাস্টিক এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ওজনের দিক থেকে প্লাস্টিকের সংখ্যা মাছের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাবে’

১৯০৭ সালের ১১ জুলাই বেলজিয়ামের রসায়নবিদ লিও হেনরিক বায়েকল্যান্ড খুব গর্ব করে বলেছিলেন, “যদি আমি ভুল না করে থাকি, আমার এই উদ্ভাবন (প্লাস্টিক) ভবিষ্যতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রমাণিত হবে।” সেদিন তার উদ্ভাবন নিয়ে যে গর্ববাণী দিয়েছিলেন মি. লিও হেনরিক বায়েকল্যান্ড, জানি না আজ তিনি বেচে থাকলে পৃথিবীর এই দূরাবস্থা প্রত্যক্ষ করে কি বলতেন!

তার হাত ধরেই মানব সভ্যতা প্রবেশ করে প্লাস্টিক যুগে। বায়েকল্যান্ডের ধারণা ছিল, তার এই উদ্ভাবন মানুষের জন্য একসময় বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। হ্যাঁ, হয়েছেও তাই। কালের পরিক্রমায় প্লাস্টিক পণ্য মানব সভ্যতার সাথে মিশে গিয়ে আজ জীবনের নিত্য দিনের সঙ্গী। সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে বায়েকল্যান্ডের তৈরি সিন্থেটিক প্লাস্টিকের বিবর্তন ঘটেছে, যে প্লাস্টিক পরিবেশে মেশে না, পৃথিবীতে থেকে যায় বহু বছর।

৮ মিটার (২৬-ফুট) স্পার্ম মৃত তিমির পেটে ৪৮ পাউন্ড প্লাস্টিক পাওয়া  যায় : ছবি সংগ্রহ

‘রসকাইলড বিশ্ববিদ্যালয়ে’র বিজ্ঞানী ক্রিস্টিয়ান সাইবার্গ সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যুর কারণ নিয়ে করা গবেষণায় প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে সামুদ্রিক প্রাণীদের জীবন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর মতে, প্লাস্টিক সেবনের কারণে সামুদ্রিক প্রাণী শ্বাসরুদ্ধ হয়ে বা খাদ্যাভাবে মারা যেতে পারে। কারণ, এগুলো এদের পরিপাকনালী প্রায় রুদ্ধ করে দেয়।

গবেষণায় আর পাওয়া যায়, ‘শুধুমাত্র প্লাস্টিক দূষণের শিকার হয়ে প্রতি বছর প্রায় ১০০ মিলিয়ন সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী মারা যাচ্ছে। এছাড়াও প্রতি বছর ৮৪ শতাংশ সামুদ্রিক কচ্ছপ, ৪৪ শতাংশ সামুদ্রিক পাখি ও ৪৩ শতাংশ অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যুর কারণও প্লাস্টিক’।

মহাসাগরে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণে সৃষ্ট বিপদগুলির মধ্যে মাছ এবং অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী ভুলবশত এটি খেয়ে ফেলে এবং এটি তাদের জীবনহানি ঘটায় এবং সেই সঙ্গে বাস্তুতন্ত্রে মারাত্মক আঘাত হানে। কিন্তু সমস্যাটি সমাধান কি একটি রোবটকে উদ্দেশ্য করে ব্যবহার করার জন্য ডিজাইন করাকে জড়িত করতে পারে? শুনতে অবাক লাগলেও গবেষণা সেই পথেই এগোচ্ছে।

দূষণ শনাক্তকারী রোবোটিক মাছ  : ছবি সংগ্রহ

চীনের সিচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা  রোবোটিক মাছের জন্য একটি খসড়া প্রমাণ তৈরি করেছেন যা তার শরীরের মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক শোষণ করতে পারে,  এবং মহাসাগরকে প্লাস্টিক বিপন্নতার হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।

গবেষণার সহ-লেখক এবং সিচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিমার রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষক ইউয়ান ওয়াং দ্য গার্ডিয়ান এ উল্লেখ করেছেন, ‘জলজ পরিবেশ থেকে ক্ষতিকারক মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণকে সঠিকভাবে সংগ্রহ এবং নমুনা করার জন্য একটি রোবট তৈরি করা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।’  তিনি আরো বলেন ‘আমাদের সর্বোত্তম জ্ঞান অনুসারে, এটি এমন সফট্ রোবটের প্রথম উদাহরণ।’

বুধবার ন্যানো লেটার্সে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে নতুন রোবোটিক মাছের পরিচয় দেওয়া হয়েছে। Phys.org দ্বারা প্রকাশিত আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির সংবাদবার্তা অনুসারে এটি প্রায় আধা-ইঞ্চি লম্বা এবং আলোর সাহায্যে ‘সাঁতার কাটতে’ সক্ষম। একটি ইনফ্রারেড লেজার এর লেজের উপর চকচক করে যা উপাদানটিকে বাঁকতে এবং ফ্ল্যাপ করে, এটিকে সামনের দিকে চালিত করে ঠিক আসল মাছের মত।

‘প্রুফ-অফ-কনসেপ্ট’ রোবটটি প্রতি সেকেন্ডে ২.৬৭ শারীরিক দৈর্ঘ্যের সর্বোচ্চ সাঁতারের গতির উপর জোর দেওয়ার জন্য প্রদর্শিত হয়, যার গতি প্ল্যাঙ্কটনের সাথে তুলনীয়, বেশিরভাগ কৃত্রিম নরম রোবটের আউটপারফরম্যান্সের প্রতিনিধিত্ব করে বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।

সাগরে ভয়াবহ প্লাষ্টিক দূষণ : ছবি সংগ্রহ

কিন্তু এক্ষেত্রে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হল রোবট সাঁতার কাটতে গিয়ে কি করতে পারে? সে তার কাছাকাছি মাইক্রোপ্লাস্টিক গুলি সংগ্রহ করতে সক্ষম? দ্য গার্ডিয়ান ব্যাখ্যা করেছে যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সাথে সংযুক্ত ভারী ধাতু, রং এবং অ্যান্টিবায়োটিকের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে এমন উপকরণ থেকে এই রোবট ফিশটি তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে মাইক্রোপ্লাস্টিক মাছের শরীরে লেগে যায় এবং সহজেই জল প্লাস্টিকমুক্ত হয়।

ওয়াং দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছেন, রোবটটি জলে মাইক্রোপ্লাস্টিকগুলি সংগ্রহ করার পরে, গবেষকরা সেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের গঠন এবং শারীরবৃত্তীয় বিষাক্ততা নিয়ে আরও বিশ্লেষণ করতে পারেন।

বিবিসি সায়েন্স ফোকাস ম্যাগাজিনের মতে, রোবটের উপাদান আংশিকভাবে প্রকৃতির ধারণা দ্বারা অনুপ্রাণিত। বিশেষত, গবেষকরা মাদার-অফ-পার্ল থেকে তাদের ধারণাটি নিয়েছেন, যে উপাদানটি ক্ল্যামের খোসার ভিতরে আবরণ তৈরি করে। মাদার-অফ-পার্ল বা ন্যাক্রে, স্তরে স্তরে নির্মিত। বিজ্ঞানীরা রোবটটিকে একইভাবে ডিজাইন করেছেন, এমনভাবে যা এটির নড়াচড়া করার জন্য যথেষ্ট নমনীয় এবং স্থায়ী হওয়ার জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী। আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি  প্রথমত  সালফোনযুক্ত গ্রাফিনে β-সাইক্লোডেক্সট্রিন অণুর ন্যানোশিট তৈরি করেছিলেন। এগুলিকে তখন পলিউরেথেন ল্যাটেক্স মিশ্রণে একত্রিত করা হয়েছিল এবং লেয়ারিং ব্যবহার করে চূড়ান্ত উপাদান রূপে তৈরি করা হয়েছিল।

দ্য গার্ডিয়ান বলছে
‘আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হল যে রোবটটি নিজেকে নিরাময় করতে এবং তার মূল ক্ষমতার ৮৯ শতাংশে সঞ্চালন করতে সক্ষম। তবে রোবটগুলি আসলে মাইক্রোপ্লাস্টিক শোষণের জন্য চারপাশে সাঁতার কাটতে শুরু করার আগে আরও কিছু কাজ করা প্রয়োজন। বর্তমানে, এটি কেবল জলের পৃষ্ঠে সাঁতার কাটতে পারে। বিজ্ঞানীরা আরও  এক ধাপ এগিয়ে সংস্করণ কাজ করে চলেছেন। যা কিনা আরও গভীরতায় ডুব দিতে পারে এবং কাজ করতে পারে।

সাগরে প্লাষ্টিকের কঠিন স্তর ছবি সংগ্রহ

২০১৯ সালের জুনে প্রকাশিত একটি গবেষণার পর্যালোচনাতে বলা হয়েছে যে, কেবল খাদ্য, পানীয় এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে আমেরিকানরা প্রতি বছর কমপক্ষে ৭৪,০০০ মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা নিজেদের অজান্তেই খাদ্যের সাথে গ্রহণ করছে। ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড (World Wildlife Fund) দ্বারা পরিচালিত অস্ট্রেলিয়ার নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকদের করা অন্য একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, আমরা মানুষেরা প্রতি সপ্তাহে গড়ে ৫০০ গ্রাম প্লাস্টিক খাচ্ছি। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও, এর পরিমাণ প্রায় একটি ক্রেডিট কার্ডের সমতুল্য। প্লাস্টিক মানব শরীরে ক্যান্সার, কিডনি, এ্যাজমা জনিত বহু রোগ সৃষ্টিতে সক্ষম। এভাবে প্লাস্টিক খাদ্যচক্রে প্রবেশের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।

আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির মতে, এটি সমুদ্র থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিকগুলিকে বের করে আনার ক্ষেত্রে কিছু সমস্যার সমাধান করতে পারে, যেমন তাদের ফাটলগুলি থেকে সরানো। ওয়াং দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছেন, আমি মনে করি ন্যানোপ্রযুক্তি ট্রেস অ্যাবসর্ভার, সংগ্রহকারী এবং দূষণকারীদের সনাক্তকরণ এর ক্ষেত্রে অপারেটিং খরচ কমানোর সাথে সাথে দক্ষতা উন্নত করতে দুর্দান্ত প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন।

আধুনিকতার নামে এ কোন পথে হেঁটে চলেছি আমরা? যে ক্ষতি আমরা প্রতিনিয়ত পরিবেশের করছি, তা কোন না কোন ভাবে বুমেরাং হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসছে। গবেষণা বলছে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রতি ৩ টন মাছের বিপরীতে সমুদ্রে ১ টন প্লাস্টিক এবং ২০৫০ সালের মধ্যে, ওজনের দিক থেকে প্লাস্টিকের সংখ্যা মাছের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাবে।

চিলির একটি সমুদ্রসৈকতে লাখ লাখ মৃত মাছ ছবি সংগ্রহ

বিশেষজ্ঞরা দেশগুলোর অনিয়ন্ত্রিত প্লাস্টিকের ব্যবহার ও বর্জ্য নিষ্কাশনের অব্যবস্থাপনাকেই  বিপর্যয়ের জন্য দায়ী করছেন। যেহেতু এই দেশগুলোর বেশিরভাগ এশিয়ার, তাই বেশিরভাগ দেশ গ্রেট প্যাসিফিকের আবর্জনা প্যাচের কাছাকাছি রয়েছে। এই দূষণের জন্য কোন একক দেশ দায়ী নয়, তাই এককভাবে এই দূষণের দায়ভার কেউ নিতে প্রস্তুত নয়। এক্ষেত্রে, সমুদ্রে প্লাস্টিক দূষণ রোধে প্রয়োজন সকলের সম্মিলিত প্রয়াস।

অদূর ভবিষ্যতে এই রোবট ফিশ সত্যিই এই কাজটি করতে সক্ষম হয়, তাহলে সমুদ্র দূষণ অনেকটা কমবে। তবে সেক্ষেত্রে স্থলভাগের কি হবে সেকথা এখানে উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু প্লাস্টিক দূষণ রোধে সর্বোপরি দরকার জনসচেতনতা ও কঠোর আইনী প্রক্রিয়া।

লেখক : ড. বিরাজলক্ষী ঘোষ, শিক্ষাবিদ, গবেষক, পরিবেশ সংগঠক, রবীন্দ্র গবেষক, সম্পাদক দ্য ওমেন ভয়েস

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published.

More News Of This Category
© All rights reserved © 2017 voiceekattor
কারিগরি সহযোগিতায়: সোহাগ রানা
11223