৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঋণ বিতরণে ধীরগতি বন্ধ শিল্প পুনরায় চালুর চ্যালেঞ্জ
- আপডেট সময় : ১০:৩৭:৪৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৪৭ বার পড়া হয়েছে
বেসরকারি খাতকে চাঙা করা, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা ও সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বড় প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে।
প্যাকেজটির লক্ষ্য ছিল সংকটে থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সহজ শর্তে অর্থায়নের মাধ্যমে অর্থনীতির কর্মকাণ্ডে ফিরিয়ে আনা এবং একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের তারল্যকে উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত করা।
তবে প্যাকেজ ঘোষণার পর ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত গতি দেখা যায়নি। চ্যানেল ২৪-এর তথ্যমতে, এ পর্যন্ত পুরো প্যাকেজের আওতায় মোট ৫ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর জন্য নির্ধারিত ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ঋণ তহবিল থেকে গত তিন মাসে কোনো ঋণ ছাড় করা সম্ভব হয়নি।
প্রণোদনা প্যাকেজের কাঠামো
এই প্রণোদনা প্যাকেজের মোট আকার ৬০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অলস বা অব্যবহৃত অর্থ থেকে এবং ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে জোগানের কথা রয়েছে।
প্যাকেজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ২০ হাজার কোটি টাকা নির্দিষ্ট করা হয় বন্ধ শিল্পকারখানা ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় চালু করার জন্য। অর্থাৎ, যেসব প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকট, উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া বা অন্যান্য কারণে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না, তাদের প্রয়োজনীয় মূলধন সরবরাহ করে পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়।
এই ঋণের গ্রাহক পর্যায়ের সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ শতাংশ। নির্ধারিত সুদের হারের বাইরে ব্যাংকের অর্থায়নের ব্যয়ের একটি অংশ সরকার ভর্তুকি দেওয়ার কথা রয়েছে। ফলে উদ্যোক্তাদের জন্য তুলনামূলক কম খরচে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
কেন বন্ধ শিল্পে ঋণ যাচ্ছে না?
প্রণোদনা প্যাকেজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যগুলোর একটি ছিল বন্ধ শিল্পকারখানা সচল করা। কিন্তু বাস্তবে এই অংশে ঋণ বিতরণ কার্যত আটকে আছে। এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি নেওয়ার অনীহা
যে প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে কিংবা দীর্ঘদিন লোকসানে রয়েছে, তাকে নতুন করে ঋণ দেওয়া ব্যাংকের জন্য স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালু হওয়ার পর পর্যাপ্ত আয় করতে না পারলে ঋণের অর্থ ফেরত নাও আসতে পারে। এতে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে অনেক ব্যাংক সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় এ ধরনের ঋণ দিতে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, ঋণ পাওয়ার কঠোর শর্ত
প্রণোদনা তহবিল থেকে ঋণ পেতে উদ্যোক্তাদের আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসার সম্ভাবনা, জামানত বা গ্যারান্টি এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার মতো বিভিন্ন বিষয় যাচাই করা হচ্ছে। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ, তার আর্থিক অবস্থা সাধারণত দুর্বল থাকে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তৃতীয়ত, যাচাই–বাছাইয়ের দীর্ঘ প্রক্রিয়া
বন্ধ প্রতিষ্ঠানকে শুধু অতীতের ব্যবসায়িক তথ্যের ভিত্তিতে ঋণ দেওয়ার সুযোগ নেই। প্রতিষ্ঠানটি বাস্তবে পুনরায় চালু হলে বাজারে তার পণ্য বা সেবার চাহিদা থাকবে কি না, নতুন অর্ডার আছে কি না, উৎপাদন শুরু করলে আয় করে ঋণ পরিশোধ করতে পারবে কি না, এসব বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার আলোকে নিশ্চিত অর্ডার কিংবা বাজারে বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। এই যাচাই-বাছাইয়ের কারণে ঋণ অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া দীর্ঘ হচ্ছে।

নীতিমালায় নমনীয়তা বনাম ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে, বন্ধ শিল্পকারখানাগুলোকে পুনরায় সচল করতে হলে ঋণনীতির কিছু ক্ষেত্রে বাস্তবভিত্তিক নমনীয়তা প্রয়োজন হতে পারে।
কারণ, যে প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে, তার কাছে একটি সচল প্রতিষ্ঠানের মতো শক্তিশালী ব্যালান্সশিট, পর্যাপ্ত জামানত বা নিয়মিত নগদ প্রবাহ থাকা স্বাভাবিক নয়। তাই সব শর্ত যদি সচল ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের মতো করে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে যেসব প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা রাখে, তারাও তহবিল থেকে বাদ পড়ে যেতে পারে।
তবে শর্ত শিথিল করার অর্থ যেন যাচাই-বাছাই বন্ধ করে দেওয়া না হয়। বরং ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনা, ব্যবসায়িক মডেল, বাজারের চাহিদা, বিদ্যমান অর্ডার, ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা এবং ঋণ পরিশোধের সম্ভাব্য নগদ প্রবাহকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।
অপব্যবহারের ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখতে হবে
বন্ধ শিল্প পুনরায় চালুর জন্য বড় অঙ্কের সরকারি সহায়তা বা ভর্তুকিযুক্ত ঋণ দেওয়া হলে এর অপব্যবহারের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। কোনো অযোগ্য প্রতিষ্ঠান কাগজে-কলমে ব্যবসা পুনরায় চালুর পরিকল্পনা দেখিয়ে তহবিল নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। আবার প্রকৃতপক্ষে উৎপাদনে ফেরার সক্ষমতা নেই, এমন প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়া হলে ভবিষ্যতে তা খেলাপি ঋণে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
তাই নীতিমালায় নমনীয়তা আনার পাশাপাশি শক্তিশালী যাচাই ও নজরদারি ব্যবস্থা রাখা জরুরি। ঋণ দেওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিকানা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম, বাজারের সম্ভাবনা ও পুনরায় চালুর পরিকল্পনা যাচাই করার পাশাপাশি ঋণ পাওয়ার পর অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
কীভাবে কার্যকর করা যেতে পারে?
এই তহবিলকে কার্যকর করতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে
সম্ভাবনাময় কিন্তু সাময়িকভাবে বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠান এবং দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করা।
শুধু জামানতের ওপর নির্ভর না করে ভবিষ্যৎ নগদ প্রবাহ, নিশ্চিত অর্ডার ও বাজারের সম্ভাবনাকে ঋণ মূল্যায়নে গুরুত্ব দেওয়া।
বাস্তবসম্মত পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণের শর্ত পুনর্বিন্যাস করা।
ঋণের অর্থ নির্দিষ্ট উৎপাদন, কাঁচামাল, শ্রমিকের বেতন বা কার্যকরী মূলধনের কাজে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা।
ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ যাচাই-বাছাই এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
ভুয়া, কাগুজে বা পুনরায় চালুর বাস্তব সম্ভাবনাহীন প্রতিষ্ঠানে অর্থায়ন ঠেকাতে কঠোর নজরদারি রাখা।
ব্যাংকগুলো যাতে অযথা ঝুঁকি এড়িয়ে না যায়, আবার যাতে অযোগ্য প্রতিষ্ঠানেও ঋণ না দেয়, এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো তৈরি করা।
উপসংহার
৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের উদ্দেশ্য শুধু ব্যাংক থেকে ঋণ বিতরণ করা নয়; এর বড় লক্ষ্য হলো বেসরকারি খাতে অর্থের প্রবাহ বাড়ানো, বিনিয়োগ ও উৎপাদন সচল করা এবং বন্ধ শিল্পকারখানাকে পুনরায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফিরিয়ে আনা।
কিন্তু ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল থেকে ঋণ ছাড় না হওয়ার ঘটনা দেখাচ্ছে যে শুধু তহবিল বরাদ্দ করলেই বন্ধ শিল্প পুনরায় চালু করা সম্ভব নয়। ব্যাংকের ঝুঁকি, উদ্যোক্তার আর্থিক সক্ষমতা, জামানত, বাজারের সম্ভাবনা এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার মধ্যে একটি বাস্তবসম্মত সমন্বয় প্রয়োজন।
অতএব, এই তহবিলের কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য একদিকে যেমন কিছু শর্ত বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা দরকার, অন্যদিকে তেমনি অর্থের অপব্যবহার ও ভবিষ্যৎ খেলাপি ঋণের ঝুঁকি ঠেকাতে শক্তিশালী যাচাই, পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।



















