স্বর্ণের বাহক বিমানকর্মী, নেপথ্যে কারা?
- আপডেট সময় : ০৭:৩৫:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২১ বার পড়া হয়েছে
২৫ কোটি টাকার সোনাসহ বিমান কর্মী আটক বারবার একই কৌশলে কোটি কোটি টাকার চোরাচালান, ধরা পড়ে বাহক আড়ালেই কি মূল হোতারা?
দুবাই থেকে চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকায় আসা বাংলাদেশ বিমানের একটি উড়োজাহাজ থেকে ১২০টি সোনার বার জব্দ করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। উদ্ধার করা এসব সোনার মোট ওজন ১৩ কেজি ৯২০ গ্রাম, যার বর্তমান আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২৫ কোটি টাকা।
শনিবার সকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চালানো বিশেষ অভিযানে এই সোনা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে বাংলাদেশ বিমানের সহকারী কারিগরি সহকারী মো. সোয়েব গাজীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে পুলিশ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সকাল সাড়ে ১১টার দিকে দুবাই-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটের বিমান বাংলাদেশ নদীর একটি ফ্লাইটে সোনা পাচারের খবর পায় ঢাকা কাস্টমস হাউসের প্রতিরোধ দল। খবর পেয়ে কাস্টমস কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা প্রতিনিধিরা দ্রুত ওই উড়োজাহাজে অবস্থান নেন।
দুবাই-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটের বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইট থেকে ১২০টি স্বর্ণের বার উদ্ধারের পর আবারও সামনে এসেছে পুরোনো এক প্রশ্ন বিমানবন্দরের ভেতরে প্রবেশাধিকার থাকা কর্মীদের ব্যবহার করে কারা বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকার স্বর্ণ পাচার করছে?
সম্প্রতি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশেষ অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে ১২০টি স্বর্ণের বার। মোট ওজন ১৩ কেজি ৯২০ গ্রাম। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী এসব স্বর্ণের আনুমানিক মূল্য প্রায় ২৫ কোটি টাকা। এ ঘটনায় বাংলাদেশ বিমানের সহকারী কারিগরি সহকারী মো. সোয়েব গাজীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে।
তবে এই আটকের পরই তদন্তের আসল প্রশ্ন শুরু হয়েছে। সোয়েব গাজী কি কেবল বাহক, নাকি তিনি বিমানবন্দরকেন্দ্রিক একটি বড় চোরাচালান নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘লিংক’?
কারণ অতীতের ঘটনাগুলো বলছে, বাংলাদেশ বিমানের উড়োজাহাজ, ক্যাটারিং, পরিচ্ছন্নতা, প্রকৌশল ও নিরাপত্তা বিভাগের কর্মীদের ব্যবহার করে একাধিকবার স্বর্ণ পাচারের চেষ্টা হয়েছে।
একই ওজনের ১২০ বার, চার বছরের ব্যবধান
বর্তমান ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো, ২০২১ সালের ৫ অক্টোবরও দুবাই থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের একটি উড়োজাহাজের টয়লেটের টিস্যুর ঝুড়ি থেকে ১২০টি স্বর্ণের বার, মোট ১৩ কেজি ৯২০ গ্রাম উদ্ধার হয়েছিল।
অর্থাৎ একই ধরনের রুট, একই পরিমাণ স্বর্ণ এবং প্রায় একই ধরনের গোপন কৌশল
চার বছরের ব্যবধানে আবারও সামনে এসেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এসব ঘটনায় কি একই চক্র বা একই ধরনের নেটওয়ার্ক কাজ করছে? নাকি বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আলাদা আলাদা চক্র একই কৌশল অনুসরণ করছে?
১২৪ কেজির ঘটনায় ১০ বিমানকর্মী আসামি
বিমানকর্মীদের জড়িত থাকার ইতিহাসও দীর্ঘ। ২০১৩ সালের ২৪ জুলাই বাংলাদেশ বিমানের দুবাইফেরত একটি উড়োজাহাজের কার্গো হোল্ড থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল ১ হাজার ৬৫টি স্বর্ণের বার, মোট ১২৪ কেজি।
এই ঘটনায় তদন্তের পর বাংলাদেশ বিমানের ১০ কর্মীসহ ১৪ জনকে আসামি করা হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মেকানিক, মেকানিক অ্যাসিস্ট্যান্ট, জুনিয়র ইন্সপেকশন অফিসার, নিরাপত্তাকর্মী ও ক্লিনিং সুপারভাইজারসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মী।
পরবর্তী সময়ে তদন্ত আরও বিস্তৃত হয় এবং বিমানের ১৭ কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ৪৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। ২০২২ সালে অভিযোগ গঠন হলেও দীর্ঘদিনেও বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হয়নি।
এখানেই উঠে আসে বড় প্রশ্ন—এক যুগের বেশি সময় ধরে চলা একটি মামলায় যদি বিচার শেষ না হয়, তাহলে নতুন করে একই ধরনের অপরাধে জড়িতদের জন্য তা কতটা কার্যকর প্রতিরোধ তৈরি করতে পারছে?
নিরাপত্তা থেকে ক্যাটারিং সবখানেই বাহক
শুধু বড় চালান নয়, ছোট ও মাঝারি চালানের ক্ষেত্রেও বিমানকর্মীদের ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে।
২০২২ সালে বাংলাদেশ বিমানের এক নিরাপত্তাকর্মীর কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ৩০টি স্বর্ণের বার, যার ওজন ৩ কেজি ৪৮০ গ্রাম।
২০২৩ সালে বিমানের প্রকৌশল শাখার তিন পরিচ্ছন্নতাকর্মী স্বর্ণ পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। তাঁদের কাছ থেকে উদ্ধার হয় ২ কেজি ৩২০ গ্রাম স্বর্ণ। তদন্তে একজন দাবি করেন, এ ধরনের কাজের জন্য তিনি ২০ হাজার টাকা পেতেন।
২০২৪ সালে বিমানের ফ্লাইট ক্যাটারিং সেন্টারের এক কর্মীর কাছ থেকে উদ্ধার হয় ৪ কেজি ৬৪ গ্রাম স্বর্ণ। আরেক ঘটনায় একই বিভাগের একজন কর্মীর কাছ থেকে প্রায় ৮ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছিল।
২০২৫ সালেও বিমানকর্মী এবং বিমানবন্দর-সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বিরুদ্ধে স্বর্ণ পাচারের অভিযোগে আটকের ঘটনা ঘটে।
এতগুলো ঘটনা একটি বিষয় স্পষ্ট করে, পাচারকারীরা বিমানবন্দরের ভেতরের প্রবেশাধিকারকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।
বাহক ধরা পড়ে, মূল হোতারা কোথায়?
স্বর্ণ পাচারের প্রতিটি ঘটনায় সবচেয়ে সহজ কাজ হলো বাহককে শনাক্ত করা। কিন্তু আসল চ্যালেঞ্জ হলো, স্বর্ণের টাকা কে দিয়েছে? চালান কে পাঠিয়েছে? বিমানবন্দরের ভেতরে কে সহযোগিতা করেছে? বাইরে কে গ্রহণ করেছে? এবং বিক্রির পর অর্থ কার কাছে গেছে?
একজন বিমানকর্মীর কাছ থেকে কোটি কোটি টাকার স্বর্ণ উদ্ধার হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে এত বিপুল মূল্যের পণ্য তাঁর হাতে এলো কোথা থেকে?
তদন্ত যদি শুধু বাহক পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে মূল চক্র থেকে যাবে আড়ালে।
অতীতের কয়েকটি তদন্তে কথিত মূলহোতা বা গডফাদারের সন্ধান পাওয়া গেলেও তাঁদের সঙ্গে যুক্ত বহু ব্যক্তিকে শনাক্ত করার পরও সবাইকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়, স্বর্ণ পাচারের সিন্ডিকেটে নিচের সারির লোকজন ধরা পড়লেও ওপরের সারির নিয়ন্ত্রকরা কেন বারবার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে?
বর্তমান ঘটনায় যে তদন্ত জরুরি
১৩ কেজি ৯২০ গ্রাম স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তকারীদের সামনে এখন বড় সুযোগ।
শুধু আটক বিমানকর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ নয়, তদন্তে খুঁজে বের করা প্রয়োজন
স্বর্ণগুলো বিমানে কে ঢুকিয়েছে;
কোন পর্যায়ে সেগুলো লুকানো হয়েছিল;
চট্টগ্রামে বিমান অবস্থানের সময় কেউ জড়িত ছিল কি না;
সংশ্লিষ্ট কর্মী কার কাছ থেকে স্বর্ণ পেয়েছেন;
ঢাকায় কার কাছে চালানটি হস্তান্তরের কথা ছিল;
এর আগে একই ধরনের চালান বহন করা হয়েছিল কি না;
বিমানবন্দরের ভেতরে আর কারা সহযোগিতা করেছে;
বাইরে অপেক্ষমাণ রিসিভার কে বা কারা।
সিসিটিভি থেকে মোবাইল তদন্তে আসতে হবে সব তথ্য বিমানটি অবতরণের পর থেকে অভিযান পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মীদের চলাচলের পূর্ণাঙ্গ টাইমলাইন তৈরি করা প্রয়োজন সিসিটিভি ফুটেজ, প্রবেশ ও বহির্গমন-তথ্য, দায়িত্বের তালিকা, ফোন যোগাযোগ এবং আইনসম্মতভাবে সংগ্রহযোগ্য আর্থিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা দরকার, এই কর্মী একা ছিলেন, নাকি তাঁর সঙ্গে আরও একটি দল কাজ করছিলএকই সঙ্গে আগের স্বর্ণ পাচারের মামলাগুলোর সঙ্গে বর্তমান মামলার নাম, ফোন নম্বর, রুট, রিসিভার, পদ্ধতি ও আর্থিক যোগসূত্র মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উচিত মানি ট্রেইল
স্বর্ণ পাচারের মূল রহস্য অনেক সময় স্বর্ণের মধ্যে নয়, টাকার মধ্যে লুকিয়ে থাকে।
কারা বিদেশ থেকে স্বর্ণ কেনার অর্থ জোগান দিয়েছে, কারা চালান গ্রহণ করেছে, কোথায় বিক্রি হয়েছে এবং বিক্রির অর্থ কোন পথে মূল অর্থদাতার কাছে গেছে, এসব তথ্য বের করা গেলে সিন্ডিকেটের ওপরের স্তরে পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে।
প্রয়োজনে আইন অনুযায়ী সন্দেহভাজনদের ব্যাংক হিসাব, সম্পদ, ব্যবসা, বিদেশি লেনদেন ও অস্বাভাবিক আর্থিক কর্মকাণ্ডও তদন্তের আওতায় আনা যেতে পারে।
এবার কি ভাঙবে বিমানবন্দরকেন্দ্রিক সিন্ডিকেট?
সাম্প্রতিক ঘটনায় ২৫ কোটি টাকা মূল্যের স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনা নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য। কিন্তু এর চেয়েও বড় সাফল্য হবে এই ২৫ কোটি টাকার পেছনে থাকা অর্থের উৎস ও পুরো নেটওয়ার্ককে শনাক্ত করা।
কারণ একজন বাহককে আটক করা মানে একটি চালান থামানো। কিন্তু মূল অর্থদাতা, সরবরাহকারী, রিসিভার ও বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ সহযোগীদের শনাক্ত করা মানে একটি সম্ভাব্য চক্রের শিকড় পর্যন্ত পৌঁছানো। স্বর্ণের ১২০টি বার উদ্ধার হয়েছে, বাহকও আটক হয়েছেন, কিন্তু ২৫ কোটি টাকার এই চালানের নেপথ্যের মাস্টারমাইন্ড কোথায়?


















