ঢাকা ০৪:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
খুব দ্রুত বিশ্ববাজারে কমবে জ্বালানি তেলের দাম: ট্রাম্প ইসরায়েলে বহুমুখী হামলার প্রস্তুতি, মিত্রদের একজোট করছে ইরান এলএনজি সংরক্ষণ ও গ্যাসে রূপান্তরে বিনিয়োগে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র নিউ মেক্সিকো’র নাম পরিবর্তন করে নিউ আমেরিকা রাখার প্রস্তাব ট্রাম্পের রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের অন্যতম বড় সংকট : প্রধানমন্ত্রী সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটো নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিতের আহ্বান জনপ্রশাসন উপদেষ্টার ডেঙ্গুর ভয়াবহ ছোবল একদিনে রেকর্ড ১,৫৫৮ ভর্তি, মৃত্যু ৪ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানে গুরুত্ব রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দেড় লাখ  কোটি টাকা কোথায় আটকে আছে অর্থ

শিক্ষক দিবসে ফিদেলের আয়নায় নিজের মুখ

 শর্মিষ্ঠা বিশ্বাস
  • আপডেট সময় : ১২:২০:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৮৬ বার পড়া হয়েছে

ফিদেলের আয়নায় নিজের মুখ

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

আজ শিক্ষক দিবস।

আজকের দিনে সাধারণত যাঁরা আমাদের অক্ষর চিনিয়েছেন, পৃথিবীকে চিনতে শিখিয়েছেন, তাঁদের কথা মনে পড়ে।

কিন্তু আজ আমি একজন শিক্ষককে নয়, একজন বিপ্লবীর কথা ভাবছি।

ফিদেল কাস্ত্রো।

কারণ কখনও কখনও ইতিহাসের কিছু মানুষ আমাদের শিক্ষক হয়ে ওঠেন-তাঁরা শ্রেণিকক্ষে পড়ান না, কিন্তু আমাদের নিজেদের বিশ্বাসের সামনে দাঁড় করিয়ে দেন।

ফিদেল তেমনই একজন।

আমি নিজেকে মার্কসবাদী বলি।

এই কথাটা বলার মধ্যে আমার কোনো সংকোচ নেই। বরং দীর্ঘদিনের চিন্তা, বিশ্বাস, প্রশ্ন আর জীবনের অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে পাওয়া এই পরিচয়টাকে আমি নিজের গাত্রেই রেখেছি।

কিন্তু আজ শিক্ষক দিবসে একটা কথা আরও স্পষ্ট করে মনে হচ্ছে-

শিক্ষা যদি প্রশ্ন করতে না শেখায়, তবে সে শিক্ষা কতটা শিক্ষা?

আর মার্কসবাদ যদি নিজের ভিতরের প্রশ্নকেও ভয় পায়, তবে সে মার্কসবাদই বা কতটা জীবন্ত?

নিজের গায়ে কোনো তকমা লাগিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা বোধহয় তখনই আসে, যখন সেই তকমাটাকেই একটু দূর থেকে দেখে নিতে হয়।

আজ ফিদেল কাস্ত্রোর কথা ভাবতে গিয়ে সেই জায়গাটাতেই এসে দাঁড়ালাম।

ফিদেল—একজন মার্কসবাদী বিপ্লবী।

একজন রাষ্ট্রনায়ক।

একজন বিতর্কিত মানুষ।

একজন দীর্ঘ ইতিহাসের চরিত্র।

কিন্তু ধর্ম নিয়ে তাঁর ভাবনাটা আমাকে আজ অন্যভাবে টানে।

ছোটবেলায় ক্যাথলিক শিক্ষায় বড় হওয়া মানুষটি পরে মার্কসবাদী বিপ্লবের নেতৃত্ব দিলেন। আর জীবনের পরের পর্বে এসে ধর্মকে শুধু অন্ধবিশ্বাসের অভিধানে রেখে দিলেন না।

Frei Betto-র সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ কথোপকথনে যিশুকে তিনি একজন “great revolutionary” বলে দেখেছিলেন।

কথাটা আমার কানে আজও আটকেই আছে।

যিশু-বিপ্লবী?

হ্যাঁ, যদি বিপ্লবের অর্থ শুধু রাষ্ট্রক্ষমতা দখল না হয়।

যদি বিপ্লবের অর্থ হয়-

অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো,

ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো,

অপমানিত মানুষকে মর্যাদা দেওয়া,

ক্ষমতার সামনে দুর্বল মানুষের অস্তিত্বকে দৃশ্যমান করা-

তাহলে যিশুর মধ্যে বিপ্লবের ভাষা খুঁজে পাওয়া অসম্ভব নয়।

আর এখানেই আমার নিজের সঙ্গে আমার কথাবার্তা শুরু হয়।

আমরা মার্কসবাদীরা ধর্মকে কীভাবে দেখি?

মার্কসের সেই বহুল উচ্চারিত বাক্য-

‘ধর্ম আফিম’-

আমরা কত সহজেই মানুষের সামনে তুলে ধরি!

কিন্তু মানুষ কেন আফিম খোঁজে, সেই প্রশ্নটা কি ততটা করি?

ক্ষুধার্ত মানুষ কেন ঈশ্বরের কাছে যায়?

অসুস্থ মানুষ কেন প্রার্থনা করে?

মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষ কেন কোনো অদৃশ্য আশ্রয় খোঁজে?

একজন মা সন্তানের জন্য মন্দিরে প্রদীপ জ্বালালে, তার ভিতরে কি শুধু অজ্ঞতা থাকে?

নাকি থাকে ভয়, ভালোবাসা, অসহায়তা, আশ্রয়ের আকাঙ্ক্ষা—অর্থাৎ একেবারে বাস্তব মানুষের বাস্তব অনুভূতি?

একজন শিক্ষক তো প্রথমে আমাদের এইটুকুই শেখান-

দেখো, তারপর প্রশ্ন করো।

তাহলে মানুষকে না বুঝে তার বিশ্বাসকে কীভাবে বুঝব?

আজকের ভারতবর্ষে প্রশ্নটা তাই আরও কঠিন।

কারণ ধর্ম এখন শুধু মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জায়গায় নেই। ধর্মকে রাষ্ট্রের ভাষায় নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে। ধর্মীয় পরিচয়কে নাগরিক পরিচয়ের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

এখানে আমার মনে হয়, আমাদের একটা পার্থক্য খুব পরিষ্কার করে বুঝতে হবে-

ধর্ম আর ধর্মীয় রাজনীতি এক জিনিস নয়।

মানুষের ঈশ্বরবিশ্বাসকে আমি সম্মান করতে পারি।

কিন্তু ঈশ্বরের নামে রাষ্ট্রক্ষমতার দাবি মেনে নিতে পারি না।

কেউ মন্দিরে যাবে-যাক।

কেউ মসজিদে যাবে-যাক।

কেউ গির্জায় যাবে-যাক।

যে কোনো ধর্ম মানবে না-সেও তার মতো থাকুক।

রাষ্ট্রের কাজ তাদের কাউকেই ঈশ্বরের নামে বিচার করা নয়।

আর শিক্ষা?

শিক্ষার কাজ তো আরও বড়।

সে যেন কাউকে শেখায় না—“এই বিশ্বাসটাই সত্য, বাকিগুলি মিথ্যা।”

সে বরং শেখাক-

“প্রশ্ন করো।

জেনে নাও।

অন্যের বিশ্বাসকেও বুঝতে শেখো।

তারপর নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নাও।”

এখানেই ফিদেল আমাকে আবার থামিয়ে দেন।

তিনি মার্কসকে ছেড়ে যিশুর কাছে যাননি।

আবার যিশুকে গ্রহণ করে মার্কসবাদও ত্যাগ করেননি।

তিনি দুটো জায়গার মধ্যে একটি মিল খুঁজেছিলেন-

মানুষের মুক্তি।

হয়তো ভারতীয় বাম রাজনীতিরও আজ সেই জায়গায় ফিরে তাকানো দরকার।

ধর্মকে মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া নয়।

বরং ধর্মকে রাষ্ট্রের হাত থেকে মুক্ত করা।

কারণ ধর্ম যদি মানুষের ব্যক্তিগত আশ্রয় হয়, তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া আমার কাজ নয়।

কিন্তু ধর্ম যদি ক্ষমতার অস্ত্র হয়ে ওঠে, তখন তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই আমার রাজনৈতিক দায়িত্ব।

আমি তাই আজ ভাবছি-

আমরা কি ধর্মের বিরুদ্ধে লড়ব,

নাকি ধর্মের নামে মানুষের উপর যে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে লড়ব?

দুটো এক কথা নয়।

আর শিক্ষক দিবসে দাঁড়িয়ে মনে হয়-

এই পার্থক্যটুকু বুঝতে শেখানোও তো এক ধরনের শিক্ষা।

আমি মার্কসবাদী।

তাই আমার প্রশ্ন করার অধিকারও আছে।

বরং বলা উচিত-

আমি মার্কসবাদী বলেই প্রশ্নটি করছি।

আমার মার্কসবাদ যদি আমাকে শুধু অন্যের বিশ্বাসকে ভুল প্রমাণ করতে শেখায়, তাহলে সে অসম্পূর্ণ।

আমার মার্কসবাদ যদি আমাকে শেখায়-

মানুষ কেন বিশ্বাস করে,

কেন ভয় পায়,

কেন আশ্রয় খোঁজে,

কেন মুক্তি চায়-

তাহলে হয়তো সে এখনও জীবন্ত।

আজ শিক্ষক দিবসে তাই কোনো একটি মুখের সামনে ফুল রেখে থামতে ইচ্ছে করছে না।

বরং সেইসব শিক্ষককে প্রণাম করতে ইচ্ছে করছে,

যাঁরা আমাদের উত্তর মুখস্থ করাননি-

প্রশ্ন করতে শিখিয়েছেন।

ফিদেলের আয়নায় আজ তাই নিজের মুখটাই দেখতে চাই।

ঈশ্বর আছেন কি নেই-সে প্রশ্ন আজ নয়।

আজকের প্রশ্ন-

ঈশ্বরের নামে মানুষকে কে শাসন করবে?

আর তারও ওপরে-

ভারতের সংবিধান কি মানুষের বিশ্বাসের বিচার করবে,

নাকি মানুষের বিশ্বাসের স্বাধীনতা ও বাঁচার অধিকারকে রক্ষা করবে?

আমার উত্তর খুব সরল-

রাষ্ট্রের ধর্ম নেই।

মানুষের ধর্ম থাকতে পারে।

শিক্ষার কাজ—মানুষকে তার বিশ্বাসসহ স্বাধীনভাবে ভাবতে শেখানো।

আর রাজনীতির কাজ-সেই স্বাধীনতাকে রক্ষা করা।

এইটুকু জায়গা যদি আমরা রক্ষা করতে না পারি,

তাহলে ধর্মনিরপেক্ষতা শুধু সংবিধানের পাতায় থাকবে-

মানুষের জীবনে থাকবে না।

আজ সেই শিক্ষকদের প্রণাম,

যাঁরা আমাদের শুধু পড়াননি-

নিজেদেরও প্রশ্ন করতে শিখিয়েছেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

শিক্ষক দিবসে ফিদেলের আয়নায় নিজের মুখ

আপডেট সময় : ১২:২০:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আজ শিক্ষক দিবস।

আজকের দিনে সাধারণত যাঁরা আমাদের অক্ষর চিনিয়েছেন, পৃথিবীকে চিনতে শিখিয়েছেন, তাঁদের কথা মনে পড়ে।

কিন্তু আজ আমি একজন শিক্ষককে নয়, একজন বিপ্লবীর কথা ভাবছি।

ফিদেল কাস্ত্রো।

কারণ কখনও কখনও ইতিহাসের কিছু মানুষ আমাদের শিক্ষক হয়ে ওঠেন-তাঁরা শ্রেণিকক্ষে পড়ান না, কিন্তু আমাদের নিজেদের বিশ্বাসের সামনে দাঁড় করিয়ে দেন।

ফিদেল তেমনই একজন।

আমি নিজেকে মার্কসবাদী বলি।

এই কথাটা বলার মধ্যে আমার কোনো সংকোচ নেই। বরং দীর্ঘদিনের চিন্তা, বিশ্বাস, প্রশ্ন আর জীবনের অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে পাওয়া এই পরিচয়টাকে আমি নিজের গাত্রেই রেখেছি।

কিন্তু আজ শিক্ষক দিবসে একটা কথা আরও স্পষ্ট করে মনে হচ্ছে-

শিক্ষা যদি প্রশ্ন করতে না শেখায়, তবে সে শিক্ষা কতটা শিক্ষা?

আর মার্কসবাদ যদি নিজের ভিতরের প্রশ্নকেও ভয় পায়, তবে সে মার্কসবাদই বা কতটা জীবন্ত?

নিজের গায়ে কোনো তকমা লাগিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা বোধহয় তখনই আসে, যখন সেই তকমাটাকেই একটু দূর থেকে দেখে নিতে হয়।

আজ ফিদেল কাস্ত্রোর কথা ভাবতে গিয়ে সেই জায়গাটাতেই এসে দাঁড়ালাম।

ফিদেল—একজন মার্কসবাদী বিপ্লবী।

একজন রাষ্ট্রনায়ক।

একজন বিতর্কিত মানুষ।

একজন দীর্ঘ ইতিহাসের চরিত্র।

কিন্তু ধর্ম নিয়ে তাঁর ভাবনাটা আমাকে আজ অন্যভাবে টানে।

ছোটবেলায় ক্যাথলিক শিক্ষায় বড় হওয়া মানুষটি পরে মার্কসবাদী বিপ্লবের নেতৃত্ব দিলেন। আর জীবনের পরের পর্বে এসে ধর্মকে শুধু অন্ধবিশ্বাসের অভিধানে রেখে দিলেন না।

Frei Betto-র সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ কথোপকথনে যিশুকে তিনি একজন “great revolutionary” বলে দেখেছিলেন।

কথাটা আমার কানে আজও আটকেই আছে।

যিশু-বিপ্লবী?

হ্যাঁ, যদি বিপ্লবের অর্থ শুধু রাষ্ট্রক্ষমতা দখল না হয়।

যদি বিপ্লবের অর্থ হয়-

অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো,

ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো,

অপমানিত মানুষকে মর্যাদা দেওয়া,

ক্ষমতার সামনে দুর্বল মানুষের অস্তিত্বকে দৃশ্যমান করা-

তাহলে যিশুর মধ্যে বিপ্লবের ভাষা খুঁজে পাওয়া অসম্ভব নয়।

আর এখানেই আমার নিজের সঙ্গে আমার কথাবার্তা শুরু হয়।

আমরা মার্কসবাদীরা ধর্মকে কীভাবে দেখি?

মার্কসের সেই বহুল উচ্চারিত বাক্য-

‘ধর্ম আফিম’-

আমরা কত সহজেই মানুষের সামনে তুলে ধরি!

কিন্তু মানুষ কেন আফিম খোঁজে, সেই প্রশ্নটা কি ততটা করি?

ক্ষুধার্ত মানুষ কেন ঈশ্বরের কাছে যায়?

অসুস্থ মানুষ কেন প্রার্থনা করে?

মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষ কেন কোনো অদৃশ্য আশ্রয় খোঁজে?

একজন মা সন্তানের জন্য মন্দিরে প্রদীপ জ্বালালে, তার ভিতরে কি শুধু অজ্ঞতা থাকে?

নাকি থাকে ভয়, ভালোবাসা, অসহায়তা, আশ্রয়ের আকাঙ্ক্ষা—অর্থাৎ একেবারে বাস্তব মানুষের বাস্তব অনুভূতি?

একজন শিক্ষক তো প্রথমে আমাদের এইটুকুই শেখান-

দেখো, তারপর প্রশ্ন করো।

তাহলে মানুষকে না বুঝে তার বিশ্বাসকে কীভাবে বুঝব?

আজকের ভারতবর্ষে প্রশ্নটা তাই আরও কঠিন।

কারণ ধর্ম এখন শুধু মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জায়গায় নেই। ধর্মকে রাষ্ট্রের ভাষায় নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে। ধর্মীয় পরিচয়কে নাগরিক পরিচয়ের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

এখানে আমার মনে হয়, আমাদের একটা পার্থক্য খুব পরিষ্কার করে বুঝতে হবে-

ধর্ম আর ধর্মীয় রাজনীতি এক জিনিস নয়।

মানুষের ঈশ্বরবিশ্বাসকে আমি সম্মান করতে পারি।

কিন্তু ঈশ্বরের নামে রাষ্ট্রক্ষমতার দাবি মেনে নিতে পারি না।

কেউ মন্দিরে যাবে-যাক।

কেউ মসজিদে যাবে-যাক।

কেউ গির্জায় যাবে-যাক।

যে কোনো ধর্ম মানবে না-সেও তার মতো থাকুক।

রাষ্ট্রের কাজ তাদের কাউকেই ঈশ্বরের নামে বিচার করা নয়।

আর শিক্ষা?

শিক্ষার কাজ তো আরও বড়।

সে যেন কাউকে শেখায় না—“এই বিশ্বাসটাই সত্য, বাকিগুলি মিথ্যা।”

সে বরং শেখাক-

“প্রশ্ন করো।

জেনে নাও।

অন্যের বিশ্বাসকেও বুঝতে শেখো।

তারপর নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নাও।”

এখানেই ফিদেল আমাকে আবার থামিয়ে দেন।

তিনি মার্কসকে ছেড়ে যিশুর কাছে যাননি।

আবার যিশুকে গ্রহণ করে মার্কসবাদও ত্যাগ করেননি।

তিনি দুটো জায়গার মধ্যে একটি মিল খুঁজেছিলেন-

মানুষের মুক্তি।

হয়তো ভারতীয় বাম রাজনীতিরও আজ সেই জায়গায় ফিরে তাকানো দরকার।

ধর্মকে মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া নয়।

বরং ধর্মকে রাষ্ট্রের হাত থেকে মুক্ত করা।

কারণ ধর্ম যদি মানুষের ব্যক্তিগত আশ্রয় হয়, তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া আমার কাজ নয়।

কিন্তু ধর্ম যদি ক্ষমতার অস্ত্র হয়ে ওঠে, তখন তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই আমার রাজনৈতিক দায়িত্ব।

আমি তাই আজ ভাবছি-

আমরা কি ধর্মের বিরুদ্ধে লড়ব,

নাকি ধর্মের নামে মানুষের উপর যে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে লড়ব?

দুটো এক কথা নয়।

আর শিক্ষক দিবসে দাঁড়িয়ে মনে হয়-

এই পার্থক্যটুকু বুঝতে শেখানোও তো এক ধরনের শিক্ষা।

আমি মার্কসবাদী।

তাই আমার প্রশ্ন করার অধিকারও আছে।

বরং বলা উচিত-

আমি মার্কসবাদী বলেই প্রশ্নটি করছি।

আমার মার্কসবাদ যদি আমাকে শুধু অন্যের বিশ্বাসকে ভুল প্রমাণ করতে শেখায়, তাহলে সে অসম্পূর্ণ।

আমার মার্কসবাদ যদি আমাকে শেখায়-

মানুষ কেন বিশ্বাস করে,

কেন ভয় পায়,

কেন আশ্রয় খোঁজে,

কেন মুক্তি চায়-

তাহলে হয়তো সে এখনও জীবন্ত।

আজ শিক্ষক দিবসে তাই কোনো একটি মুখের সামনে ফুল রেখে থামতে ইচ্ছে করছে না।

বরং সেইসব শিক্ষককে প্রণাম করতে ইচ্ছে করছে,

যাঁরা আমাদের উত্তর মুখস্থ করাননি-

প্রশ্ন করতে শিখিয়েছেন।

ফিদেলের আয়নায় আজ তাই নিজের মুখটাই দেখতে চাই।

ঈশ্বর আছেন কি নেই-সে প্রশ্ন আজ নয়।

আজকের প্রশ্ন-

ঈশ্বরের নামে মানুষকে কে শাসন করবে?

আর তারও ওপরে-

ভারতের সংবিধান কি মানুষের বিশ্বাসের বিচার করবে,

নাকি মানুষের বিশ্বাসের স্বাধীনতা ও বাঁচার অধিকারকে রক্ষা করবে?

আমার উত্তর খুব সরল-

রাষ্ট্রের ধর্ম নেই।

মানুষের ধর্ম থাকতে পারে।

শিক্ষার কাজ—মানুষকে তার বিশ্বাসসহ স্বাধীনভাবে ভাবতে শেখানো।

আর রাজনীতির কাজ-সেই স্বাধীনতাকে রক্ষা করা।

এইটুকু জায়গা যদি আমরা রক্ষা করতে না পারি,

তাহলে ধর্মনিরপেক্ষতা শুধু সংবিধানের পাতায় থাকবে-

মানুষের জীবনে থাকবে না।

আজ সেই শিক্ষকদের প্রণাম,

যাঁরা আমাদের শুধু পড়াননি-

নিজেদেরও প্রশ্ন করতে শিখিয়েছেন।