ঢাকা ০৪:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
খুব দ্রুত বিশ্ববাজারে কমবে জ্বালানি তেলের দাম: ট্রাম্প ইসরায়েলে বহুমুখী হামলার প্রস্তুতি, মিত্রদের একজোট করছে ইরান এলএনজি সংরক্ষণ ও গ্যাসে রূপান্তরে বিনিয়োগে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র নিউ মেক্সিকো’র নাম পরিবর্তন করে নিউ আমেরিকা রাখার প্রস্তাব ট্রাম্পের রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের অন্যতম বড় সংকট : প্রধানমন্ত্রী সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটো নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিতের আহ্বান জনপ্রশাসন উপদেষ্টার ডেঙ্গুর ভয়াবহ ছোবল একদিনে রেকর্ড ১,৫৫৮ ভর্তি, মৃত্যু ৪ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানে গুরুত্ব রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দেড় লাখ  কোটি টাকা কোথায় আটকে আছে অর্থ

২০২৭ সালেও দুই পর্বে বিশ্ব ইজতেমা দ্বীনের ময়দানে বিভাজনের ছায়া সংঘাত ঠেকানোই বড় চ্যালেঞ্জ

ভয়েস ডিজিটাল ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৬:৪৩:৪৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৪৯ বার পড়া হয়েছে

২০২৭ সালেও দুই পর্বে বিশ্ব ইজতেমা দ্বীনের ময়দানে বিভাজনের ছায়া সংঘাত ঠেকানোই বড় চ্যালেঞ্জ

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বিশ্ব ইজতেমা মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশ। প্রতিবছর টঙ্গীর তুরাগ নদের তীরে লাখো মুসল্লির উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই ইজতেমার মূল লক্ষ্য মানুষের মধ্যে ধর্মীয় চেতনা, আত্মশুদ্ধি, দাওয়াত ও ইসলামী জীবনব্যবস্থার প্রতি আগ্রহ তৈরি করা। কিন্তু তাবলিগ জামাতের নেতৃত্ব ও কিছু মতাদর্শিক বিষয়কে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের বিভাজন এখন বিশ্ব ইজতেমাকেও দুই ধারায় ভাগ করে দিয়েছে। ফলে যে আয়োজনের মূল বার্তা হওয়ার কথা ছিল ঐক্য, সেখানে বিভাজন ও সংঘাতের ঘটনাও বারবার আলোচনায় এসেছে।

২০২৭ সালের বিশ্ব ইজতেমাও দুই পর্বে অনুষ্ঠিত হওয়ার সূচি জানানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, প্রথম পর্ব ৮ থেকে ১০ জানুয়ারি এবং দ্বিতীয় পর্ব ১৫ থেকে ১৭ জানুয়ারি টঙ্গীর তুরাগ তীরে অনুষ্ঠিত হবে। ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, প্রথম পর্বে জুবায়েরপন্থী এবং দ্বিতীয় পর্বে সাদপন্থী অনুসারীরা অংশ নেবেন। দুই পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই আয়োজনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তাবলিগ জামাতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, মুরব্বিদের অনুসরণ, দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা এবং ইজতেমা ও মারকাজের ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মতপার্থক্য রয়েছে। এই বিরোধ ক্রমে তাবলিগের অনুসারীদের মধ্যে দুটি প্রধান ধারার সৃষ্টি করে, বাংলাদেশে যাদের সাধারণভাবে জুবায়েরপন্থী ও সাদপন্থী হিসেবে পরিচিত করা হয়।

জুবায়েরপন্থীরা মাওলানা জুবায়ের আহমদের অনুসারী ধারার সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে সাদপন্থীরা মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। মাওলানা সাদ কান্ধলভী তাবলিগের দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজের সঙ্গে যুক্ত একজন গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। নেতৃত্ব ও কিছু ধর্মীয় ব্যাখ্যার বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতভেদ থাকায় বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে। এই বিরোধ শুধু মতের জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, ইজতেমা মাঠের ব্যবস্থাপনা, কে কখন ইজতেমা করবে এবং কোন পক্ষের অনুসারীরা মাঠে অবস্থান করবেন—এসব বিষয়েও বিরোধ দেখা দিয়েছে। ফলে কয়েক বছর ধরে সরকার ও প্রশাসনকে দুই পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পৃথক সময় নির্ধারণ করতে হচ্ছে।

২০২৭ সালে কে কখন ইজতেমা করবে?

সরকারের ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, ৮, ৯ ও ১০ জানুয়ারি প্রথম পর্বে ইজতেমা করবেন জুবায়েরপন্থীরা। এরপর এক সপ্তাহের ব্যবধানে ১৫, ১৬ ও ১৭ জানুয়ারি দ্বিতীয় পর্বে ইজতেমা করবেন সাদপন্থীরা। দুই পর্বই অনুষ্ঠিত হবে টঙ্গীর তুরাগ তীরের ঐতিহাসিক ইজতেমা ময়দানে।

তবে সাদপন্থীদের পক্ষ থেকে জানুয়ারির দুই পর্বের পর রমজানের আগে আলাদা সময়ে ইজতেমা করার সুযোগ অথবা নভেম্বরের শেষ দিকে ইজতেমা আয়োজনের প্রস্তাবের কথাও উঠে এসেছে। এ বিষয়ে পরবর্তী আলোচনা ও সিদ্ধান্তের প্রয়োজন রয়েছে বলে সরকারি বক্তব্যে জানানো হয়েছে।

ইসলামের নামে বিভাজন, তারপর সংঘাত

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, তাবলিগ জামাতের মূল কাজ যেখানে মানুষকে নামাজ, আমল, নৈতিকতা ও দ্বীনের পথে আহ্বান করা, সেখানে নিজেদের মধ্যকার বিরোধ কখনো কখনো সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে টঙ্গীর ইজতেমা ময়দানে দুই পক্ষের সংঘর্ষে প্রাণহানি ও বহু মানুষ আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ওই সংঘর্ষে একাধিক মানুষের নিহত হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়।  এ ধরনের ঘটনা শুধু ইজতেমার ভাবমূর্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, সাধারণ মুসল্লিদের মধ্যেও উদ্বেগ সৃষ্টি করে। ধর্মীয় একটি বৃহৎ সমাবেশে জায়গা দখল, নেতৃত্বের কর্তৃত্ব কিংবা আয়োজনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যদি হাতাহাতি, মারামারি এমনকি প্রাণহানির ঘটনা ঘটে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে দ্বীনের কাজ করতে গিয়ে কেন মুসলমানদের মধ্যেই এমন সংঘাত?

দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে ইজতেমা ময়দান

ইজতেমা ময়দান নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বিরোধের বিষয়টি নতুন নয়। একসময় একই মাঠে একই ব্যবস্থাপনায় বিপুলসংখ্যক মুসল্লি অংশ নিলেও পরবর্তী সময়ে বিভাজনের কারণে পৃথক পর্বের প্রয়োজন দেখা দেয়। অবশ্য জায়গার সংকটের কারণেও অতীতে দুই পর্বে ইজতেমা হয়েছে। ২০১১ সাল থেকে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ও ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে দুই পর্বের আয়োজনের নজির ছিল, পরবর্তীতে তাবলিগের দুই পক্ষের বিরোধও পৃথক আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।  অর্থাৎ বর্তমান দুই পর্বের ইজতেমা শুধু ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়, এর সঙ্গে তাবলিগের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের বিরোধও জড়িয়ে গেছে।

মাওলানা সাদের বাংলাদেশে আসা নিয়েও প্রশ্ন

২০২৭ সালের দ্বিতীয় পর্বে মাওলানা সাদ কান্ধলভীর বাংলাদেশে আসার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, তাঁর আগমনের বিষয়টি প্রচলিত ভিসা নীতি ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুযায়ী ধর্ম মন্ত্রণালয় দেখবে। ফলে দ্বিতীয় পর্বের আগে এ নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হতে পারে।

সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

২০২৭ সালের ইজতেমা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করাই এখন সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ একই মাঠে দুই পক্ষকে আলাদা সময়ে আয়োজনের সুযোগ দিলেও দুই পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস পুরোপুরি দূর হয়নি। একটি পর্ব শেষ হওয়ার পর আরেক পক্ষের কাছে মাঠ হস্তান্তর, অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা, মুসল্লিদের যাতায়াত এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ সব ক্ষেত্রেই সমন্বয় প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষের বিরোধ যেন আর কোনোভাবেই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে না গড়ায়। মতপার্থক্য থাকতে পারে, ধর্মীয় ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্কও থাকতে পারে; কিন্তু সেই বিরোধ যদি মারামারি, হামলা কিংবা প্রাণহানিতে রূপ নেয়, তাহলে তা ইসলামের শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের মৌলিক শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বিশ্ব ইজতেমা বাংলাদেশের ধর্মীয় ও সামাজিক বাস্তবতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আয়োজন। তাই ২০২৭ সালের দুই পর্বের ইজতেমা শুধু সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করাই নয়, দুই পক্ষের মধ্যে সহনশীলতা ও সংলাপের পরিবেশ তৈরিরও একটি সুযোগ হতে পারে। জুবায়েরপন্থী ও সাদপন্থী উভয় পক্ষের অনুসারীরাই শেষ পর্যন্ত মুসলিম সমাজের অংশ। তাদের মতপার্থক্যের সমাধান যদি আলোচনার টেবিলে সম্ভব হয়, সেটিই হবে ইজতেমার মূল চেতনার সঙ্গে সবচেয়ে সামঞ্জস্যপূর্ণ পথ। কারণ ইজতেমার ময়দান যেন বিভাজনের নয়, ঐক্যের বার্তা দেয়, এটাই এখন সাধারণ মুসল্লিদের প্রত্যাশা।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

২০২৭ সালেও দুই পর্বে বিশ্ব ইজতেমা দ্বীনের ময়দানে বিভাজনের ছায়া সংঘাত ঠেকানোই বড় চ্যালেঞ্জ

আপডেট সময় : ০৬:৪৩:৪৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিশ্ব ইজতেমা মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশ। প্রতিবছর টঙ্গীর তুরাগ নদের তীরে লাখো মুসল্লির উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই ইজতেমার মূল লক্ষ্য মানুষের মধ্যে ধর্মীয় চেতনা, আত্মশুদ্ধি, দাওয়াত ও ইসলামী জীবনব্যবস্থার প্রতি আগ্রহ তৈরি করা। কিন্তু তাবলিগ জামাতের নেতৃত্ব ও কিছু মতাদর্শিক বিষয়কে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের বিভাজন এখন বিশ্ব ইজতেমাকেও দুই ধারায় ভাগ করে দিয়েছে। ফলে যে আয়োজনের মূল বার্তা হওয়ার কথা ছিল ঐক্য, সেখানে বিভাজন ও সংঘাতের ঘটনাও বারবার আলোচনায় এসেছে।

২০২৭ সালের বিশ্ব ইজতেমাও দুই পর্বে অনুষ্ঠিত হওয়ার সূচি জানানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, প্রথম পর্ব ৮ থেকে ১০ জানুয়ারি এবং দ্বিতীয় পর্ব ১৫ থেকে ১৭ জানুয়ারি টঙ্গীর তুরাগ তীরে অনুষ্ঠিত হবে। ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, প্রথম পর্বে জুবায়েরপন্থী এবং দ্বিতীয় পর্বে সাদপন্থী অনুসারীরা অংশ নেবেন। দুই পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই আয়োজনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তাবলিগ জামাতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, মুরব্বিদের অনুসরণ, দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা এবং ইজতেমা ও মারকাজের ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মতপার্থক্য রয়েছে। এই বিরোধ ক্রমে তাবলিগের অনুসারীদের মধ্যে দুটি প্রধান ধারার সৃষ্টি করে, বাংলাদেশে যাদের সাধারণভাবে জুবায়েরপন্থী ও সাদপন্থী হিসেবে পরিচিত করা হয়।

জুবায়েরপন্থীরা মাওলানা জুবায়ের আহমদের অনুসারী ধারার সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে সাদপন্থীরা মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। মাওলানা সাদ কান্ধলভী তাবলিগের দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজের সঙ্গে যুক্ত একজন গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। নেতৃত্ব ও কিছু ধর্মীয় ব্যাখ্যার বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতভেদ থাকায় বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে। এই বিরোধ শুধু মতের জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, ইজতেমা মাঠের ব্যবস্থাপনা, কে কখন ইজতেমা করবে এবং কোন পক্ষের অনুসারীরা মাঠে অবস্থান করবেন—এসব বিষয়েও বিরোধ দেখা দিয়েছে। ফলে কয়েক বছর ধরে সরকার ও প্রশাসনকে দুই পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পৃথক সময় নির্ধারণ করতে হচ্ছে।

২০২৭ সালে কে কখন ইজতেমা করবে?

সরকারের ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, ৮, ৯ ও ১০ জানুয়ারি প্রথম পর্বে ইজতেমা করবেন জুবায়েরপন্থীরা। এরপর এক সপ্তাহের ব্যবধানে ১৫, ১৬ ও ১৭ জানুয়ারি দ্বিতীয় পর্বে ইজতেমা করবেন সাদপন্থীরা। দুই পর্বই অনুষ্ঠিত হবে টঙ্গীর তুরাগ তীরের ঐতিহাসিক ইজতেমা ময়দানে।

তবে সাদপন্থীদের পক্ষ থেকে জানুয়ারির দুই পর্বের পর রমজানের আগে আলাদা সময়ে ইজতেমা করার সুযোগ অথবা নভেম্বরের শেষ দিকে ইজতেমা আয়োজনের প্রস্তাবের কথাও উঠে এসেছে। এ বিষয়ে পরবর্তী আলোচনা ও সিদ্ধান্তের প্রয়োজন রয়েছে বলে সরকারি বক্তব্যে জানানো হয়েছে।

ইসলামের নামে বিভাজন, তারপর সংঘাত

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, তাবলিগ জামাতের মূল কাজ যেখানে মানুষকে নামাজ, আমল, নৈতিকতা ও দ্বীনের পথে আহ্বান করা, সেখানে নিজেদের মধ্যকার বিরোধ কখনো কখনো সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে টঙ্গীর ইজতেমা ময়দানে দুই পক্ষের সংঘর্ষে প্রাণহানি ও বহু মানুষ আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ওই সংঘর্ষে একাধিক মানুষের নিহত হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়।  এ ধরনের ঘটনা শুধু ইজতেমার ভাবমূর্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, সাধারণ মুসল্লিদের মধ্যেও উদ্বেগ সৃষ্টি করে। ধর্মীয় একটি বৃহৎ সমাবেশে জায়গা দখল, নেতৃত্বের কর্তৃত্ব কিংবা আয়োজনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যদি হাতাহাতি, মারামারি এমনকি প্রাণহানির ঘটনা ঘটে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে দ্বীনের কাজ করতে গিয়ে কেন মুসলমানদের মধ্যেই এমন সংঘাত?

দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে ইজতেমা ময়দান

ইজতেমা ময়দান নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বিরোধের বিষয়টি নতুন নয়। একসময় একই মাঠে একই ব্যবস্থাপনায় বিপুলসংখ্যক মুসল্লি অংশ নিলেও পরবর্তী সময়ে বিভাজনের কারণে পৃথক পর্বের প্রয়োজন দেখা দেয়। অবশ্য জায়গার সংকটের কারণেও অতীতে দুই পর্বে ইজতেমা হয়েছে। ২০১১ সাল থেকে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ও ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে দুই পর্বের আয়োজনের নজির ছিল, পরবর্তীতে তাবলিগের দুই পক্ষের বিরোধও পৃথক আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।  অর্থাৎ বর্তমান দুই পর্বের ইজতেমা শুধু ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়, এর সঙ্গে তাবলিগের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের বিরোধও জড়িয়ে গেছে।

মাওলানা সাদের বাংলাদেশে আসা নিয়েও প্রশ্ন

২০২৭ সালের দ্বিতীয় পর্বে মাওলানা সাদ কান্ধলভীর বাংলাদেশে আসার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, তাঁর আগমনের বিষয়টি প্রচলিত ভিসা নীতি ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুযায়ী ধর্ম মন্ত্রণালয় দেখবে। ফলে দ্বিতীয় পর্বের আগে এ নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হতে পারে।

সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

২০২৭ সালের ইজতেমা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করাই এখন সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ একই মাঠে দুই পক্ষকে আলাদা সময়ে আয়োজনের সুযোগ দিলেও দুই পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস পুরোপুরি দূর হয়নি। একটি পর্ব শেষ হওয়ার পর আরেক পক্ষের কাছে মাঠ হস্তান্তর, অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা, মুসল্লিদের যাতায়াত এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ সব ক্ষেত্রেই সমন্বয় প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষের বিরোধ যেন আর কোনোভাবেই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে না গড়ায়। মতপার্থক্য থাকতে পারে, ধর্মীয় ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্কও থাকতে পারে; কিন্তু সেই বিরোধ যদি মারামারি, হামলা কিংবা প্রাণহানিতে রূপ নেয়, তাহলে তা ইসলামের শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের মৌলিক শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বিশ্ব ইজতেমা বাংলাদেশের ধর্মীয় ও সামাজিক বাস্তবতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আয়োজন। তাই ২০২৭ সালের দুই পর্বের ইজতেমা শুধু সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করাই নয়, দুই পক্ষের মধ্যে সহনশীলতা ও সংলাপের পরিবেশ তৈরিরও একটি সুযোগ হতে পারে। জুবায়েরপন্থী ও সাদপন্থী উভয় পক্ষের অনুসারীরাই শেষ পর্যন্ত মুসলিম সমাজের অংশ। তাদের মতপার্থক্যের সমাধান যদি আলোচনার টেবিলে সম্ভব হয়, সেটিই হবে ইজতেমার মূল চেতনার সঙ্গে সবচেয়ে সামঞ্জস্যপূর্ণ পথ। কারণ ইজতেমার ময়দান যেন বিভাজনের নয়, ঐক্যের বার্তা দেয়, এটাই এখন সাধারণ মুসল্লিদের প্রত্যাশা।