ঢাকা ০৯:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
এক বছরে ১০.৬৩ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি তেল আমদানি মায়ের ছোট্ট অনুরোধে ভারতীয় ভিসা কেন্দ্রে শিশুদের ‘খেলা ঘর’ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রধান ভারতীয় হাইকমিশনারের সৌজন্য সাক্ষাৎ ১০ বছরের জ্বালানি পরিকল্পনা কক্মাসবাজার তারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী সৌদিতে কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধার মৃত্যু এসএসসি-সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ, পাস ৬২.২৫ শতাংশ নদী মরছে, বিপন্ন হচ্ছে নগরসভ্যতা থেমে গেছে প্রতিদিনের হাঁটা ১১ পলিথিনে খন্ডিত মরদেহ মেলেনি মাথা-পা বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি যুবক নিহত প্রধানমন্ত্রীর উপহার সিএনজি-রিকশা পেলেন জুলাইযোদ্ধারা

ট্রাম্পের অযৌক্তিক যুদ্ধ ও অবাস্তব প্রত্যাশার ফল  ইরান চুক্তি

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১২:৪২:৩৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬ ১৫৯ বার পড়া হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের দিনও দক্ষিণ লেবাননে হামলা চালায় ইসরায়েল। হামলার পর আকাশে ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে। ১৭ জুন ২০২৬ছবি: রয়টার্স

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

একটি পুরোনো সামরিক প্রবাদ আছে, শত্রুর সঙ্গে প্রথম সংঘর্ষের পর কোনো যুদ্ধই আর পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয় না। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যে সংঘাতে জড়িয়েছিলেন, তার লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। তিনি চেয়েছিলেন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিষ্ক্রিয় করতে এবং হিজবুল্লাহ, হামাসসহ আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থনের অবসান ঘটাতে।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে এসব লক্ষ্য থেকে সরে আসতে হয়েছে। এখন যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) হয়েছে, তাতে ইরান কেবল পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আরও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছে। অথচ ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত বৃহত্তর লক্ষ্যগুলোর বেশিরভাগই এতে অনুপস্থিত।

বিশেষভাবে লক্ষণীয়, সমঝোতা স্মারকে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির কোনো উল্লেখ নেই। অন্যদিকে লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় হিজবুল্লাহ এটিকে নিজেদের রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে তুলে ধরছে, যদিও ইসরায়েল এখনো লেবাননের কিছু এলাকা ‘বাফার জোন’ হিসেবে দখলে রেখেছে।

যুদ্ধ চলাকালে ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত শক্তি হয়ে ওঠে হরমুজ প্রণালি—বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। যুদ্ধ শুরুর আগেই বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছিলেন, সংঘাত শুরু হলে ইরান দ্রুত এই প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। বাস্তবে সেই আশঙ্কাই ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে।

হরমুজ প্রণালি সচল রাখতে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বড় ধরনের সংকট থেকে রক্ষা করতে যুক্তরাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত নিজের অনেক কৌশলগত লক্ষ্য থেকে সরে আসতে হয়েছে। অন্যথায়, ট্রাম্পের ভাষাতেই, বিশ্বকে একটি ‘বৈশ্বিক মহামন্দা’র মুখোমুখি হতে হতে পারত।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশিষ্ট কূটনৈতিক ফেলো বারবারা লিফের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধ শুরু করেছিল কয়েকটি গুরুতর ভুল মূল্যায়নের ভিত্তিতে। তারা ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকে অবমূল্যায়ন করেছিল এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ কিংবা উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ও মিত্র স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানার তেহরানের সক্ষমতাকেও যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি।

লিফের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র খুব দ্রুত বুঝতে পারে যে তারা এমন এক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়েছে, যে চার দশক ধরে অপ্রচলিত যুদ্ধকৌশলে দক্ষতা অর্জন করেছে। এমন প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করার জন্য ওয়াশিংটনের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছিল না।

এদিকে যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব দ্রুত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ও বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তার কারণে এর চাপ গিয়ে পড়ে সাধারণ মার্কিন ভোক্তাদের ওপরও। ফলে যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে ওঠে।

বারবারা লিফের মতে, ট্রাম্প এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। তিনি নতুন করে যুদ্ধ শুরু করতে চান না। কিন্তু সংঘাত যদি প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহেই শেষ করা যেত, তাহলে যে কৌশলগত সুবিধা তিনি পেতে পারতেন, তার বড় অংশ ইতোমধ্যেই হারিয়ে গেছে।

গত কয়েক দিন ধরেই স্পষ্ট ছিল যে ট্রাম্প প্রশাসন সমঝোতা স্মারকের পূর্ণাঙ্গ শর্ত প্রকাশে অনীহা দেখাচ্ছে। অবশেষে এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা ব্রিফিং কলে এর বিষয়বস্তু পড়ে শোনালেও হোয়াইট হাউস এখনো এর আনুষ্ঠানিক অনুলিপি প্রকাশ করেনি।

এর কারণও স্পষ্ট। ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেই এই চুক্তি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ রয়েছে। লুইজিয়ানার বিদায়ী সিনেটর বিল ক্যাসিডি একে ‘গত কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় পররাষ্ট্রনীতি–সংক্রান্ত ভুল’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

ক্যাসিডির ভাষায়, ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি; বরং তারা শিখেছে যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার হুমকি অত্যন্ত কার্যকর একটি কৌশল। ভবিষ্যতেও তেহরান এই কৌশলকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। একই সঙ্গে এই চুক্তি ইরানকে তাদের অবকাঠামো পুনর্গঠনের সুযোগ করে দিচ্ছে।

নর্থ ক্যারোলাইনার রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিসও প্রকাশিত ১৪ দফাকে ‘ভালো চুক্তি’ হিসেবে বিবেচনা করতে রাজি নন।

বছরের পর বছর ধরে ট্রাম্প বারাক ওবামার আমলে সম্পাদিত যৌথ সামগ্রিক কর্মপরিকল্পনা (জেসিপিওএ) চুক্তির কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, ওবামা প্রশাসন ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখতে বিপুল আর্থিক সুবিধা দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের দিনও দক্ষিণ লেবাননে হামলা চালায় ইসরায়েল। হামলার পর আকাশে ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে। ১৭ জুন ২০২৬ছবি: রয়টার্স
হরমুজ প্রণালি। ১৫ জুন ২০২৬ছবি: রয়টার্স

কিন্তু নিজে যখন ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর প্রয়োজনীয়তার মুখে পড়লেন, তখন ট্রাম্পকে আরও বড় আকারের সম্পদ হস্তান্তর, অতিরিক্ত আর্থিক প্রণোদনা, লেবাননে যুদ্ধবিরতির সমর্থন এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে ইরান ও ওমানের আলোচনার সুযোগকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে তুলে ধরতে হয়েছে।

বিদেশে জব্দ থাকা ইরানি সম্পদ সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, ‘এটা আমাদের অর্থ নয়, এটা তাদেরই অর্থ। আমরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তা স্থগিত করেছিলাম। এখন মনে হচ্ছে, আমাদের সেটি ফিরিয়ে দিতে হবে।’

এক পর্যায়ে তাঁর বক্তব্যে ইরানের অবস্থানের প্রতিধ্বনিও শোনা যায়। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সৌদি আরবের যদি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকার অধিকার থাকে, তাহলে একই যুক্তিতে ইরানেরও তা থাকা উচিত।

ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি প্রসঙ্গে ট্রাম্প মন্তব্য করেন, অন্য অনেক দেশের মতো ইরানকেও শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে, বিশেষত বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য, এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া উচিত। তাঁর মতে, এ ক্ষেত্রে কিছু বাস্তবসম্মত চিন্তাভাবনা প্রয়োজন।

তবে সব বিতর্কের পরও ট্রাম্প প্রশাসনের এই সমঝোতা স্মারককে শেষ পর্যন্ত একটি বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত বলেই বিবেচনা করা যায়। রাজনৈতিক মূল্য যা-ই হোক না কেন, সংঘাত যত দ্রুত সম্ভব শেষ করা জরুরি ছিল।

বারবারা লিফ বলেন, ভুল পরিকল্পনার ভিত্তিতে শুরু হওয়া এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে—এতে তিনি গভীর স্বস্তি অনুভব করছেন। তবে ভবিষ্যতে ট্রাম্প প্রশাসন আবারও একই ধরনের সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে না, এমন নিশ্চয়তা এখনো নেই।

ওবামা আমলে জেসিপিওএ আলোচনায় অংশ নেওয়া সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা রবার্ট ম্যালির মতে, দুই চুক্তির সরাসরি তুলনা খুব একটা অর্থবহ নয়। কারণ, এগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রেক্ষাপটে সম্পাদিত হয়েছে।

তাঁর মূল্যায়ন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সমঝোতা স্মারক বিদ্যমান অন্য যেকোনো বাস্তবসম্মত বিকল্পের তুলনায় বেশি গ্রহণযোগ্য। এই সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা জোর দিয়ে বলেন, ‘এটাই চূড়ান্ত কথা।’

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

ট্রাম্পের অযৌক্তিক যুদ্ধ ও অবাস্তব প্রত্যাশার ফল  ইরান চুক্তি

আপডেট সময় : ১২:৪২:৩৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

একটি পুরোনো সামরিক প্রবাদ আছে, শত্রুর সঙ্গে প্রথম সংঘর্ষের পর কোনো যুদ্ধই আর পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয় না। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যে সংঘাতে জড়িয়েছিলেন, তার লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। তিনি চেয়েছিলেন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিষ্ক্রিয় করতে এবং হিজবুল্লাহ, হামাসসহ আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থনের অবসান ঘটাতে।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে এসব লক্ষ্য থেকে সরে আসতে হয়েছে। এখন যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) হয়েছে, তাতে ইরান কেবল পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আরও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছে। অথচ ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত বৃহত্তর লক্ষ্যগুলোর বেশিরভাগই এতে অনুপস্থিত।

বিশেষভাবে লক্ষণীয়, সমঝোতা স্মারকে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির কোনো উল্লেখ নেই। অন্যদিকে লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় হিজবুল্লাহ এটিকে নিজেদের রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে তুলে ধরছে, যদিও ইসরায়েল এখনো লেবাননের কিছু এলাকা ‘বাফার জোন’ হিসেবে দখলে রেখেছে।

যুদ্ধ চলাকালে ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত শক্তি হয়ে ওঠে হরমুজ প্রণালি—বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। যুদ্ধ শুরুর আগেই বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছিলেন, সংঘাত শুরু হলে ইরান দ্রুত এই প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। বাস্তবে সেই আশঙ্কাই ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে।

হরমুজ প্রণালি সচল রাখতে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বড় ধরনের সংকট থেকে রক্ষা করতে যুক্তরাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত নিজের অনেক কৌশলগত লক্ষ্য থেকে সরে আসতে হয়েছে। অন্যথায়, ট্রাম্পের ভাষাতেই, বিশ্বকে একটি ‘বৈশ্বিক মহামন্দা’র মুখোমুখি হতে হতে পারত।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশিষ্ট কূটনৈতিক ফেলো বারবারা লিফের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধ শুরু করেছিল কয়েকটি গুরুতর ভুল মূল্যায়নের ভিত্তিতে। তারা ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকে অবমূল্যায়ন করেছিল এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ কিংবা উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ও মিত্র স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানার তেহরানের সক্ষমতাকেও যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি।

লিফের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র খুব দ্রুত বুঝতে পারে যে তারা এমন এক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়েছে, যে চার দশক ধরে অপ্রচলিত যুদ্ধকৌশলে দক্ষতা অর্জন করেছে। এমন প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করার জন্য ওয়াশিংটনের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছিল না।

এদিকে যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব দ্রুত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ও বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তার কারণে এর চাপ গিয়ে পড়ে সাধারণ মার্কিন ভোক্তাদের ওপরও। ফলে যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে ওঠে।

বারবারা লিফের মতে, ট্রাম্প এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। তিনি নতুন করে যুদ্ধ শুরু করতে চান না। কিন্তু সংঘাত যদি প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহেই শেষ করা যেত, তাহলে যে কৌশলগত সুবিধা তিনি পেতে পারতেন, তার বড় অংশ ইতোমধ্যেই হারিয়ে গেছে।

গত কয়েক দিন ধরেই স্পষ্ট ছিল যে ট্রাম্প প্রশাসন সমঝোতা স্মারকের পূর্ণাঙ্গ শর্ত প্রকাশে অনীহা দেখাচ্ছে। অবশেষে এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা ব্রিফিং কলে এর বিষয়বস্তু পড়ে শোনালেও হোয়াইট হাউস এখনো এর আনুষ্ঠানিক অনুলিপি প্রকাশ করেনি।

এর কারণও স্পষ্ট। ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেই এই চুক্তি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ রয়েছে। লুইজিয়ানার বিদায়ী সিনেটর বিল ক্যাসিডি একে ‘গত কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় পররাষ্ট্রনীতি–সংক্রান্ত ভুল’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

ক্যাসিডির ভাষায়, ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি; বরং তারা শিখেছে যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার হুমকি অত্যন্ত কার্যকর একটি কৌশল। ভবিষ্যতেও তেহরান এই কৌশলকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। একই সঙ্গে এই চুক্তি ইরানকে তাদের অবকাঠামো পুনর্গঠনের সুযোগ করে দিচ্ছে।

নর্থ ক্যারোলাইনার রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিসও প্রকাশিত ১৪ দফাকে ‘ভালো চুক্তি’ হিসেবে বিবেচনা করতে রাজি নন।

বছরের পর বছর ধরে ট্রাম্প বারাক ওবামার আমলে সম্পাদিত যৌথ সামগ্রিক কর্মপরিকল্পনা (জেসিপিওএ) চুক্তির কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, ওবামা প্রশাসন ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখতে বিপুল আর্থিক সুবিধা দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের দিনও দক্ষিণ লেবাননে হামলা চালায় ইসরায়েল। হামলার পর আকাশে ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে। ১৭ জুন ২০২৬ছবি: রয়টার্স
হরমুজ প্রণালি। ১৫ জুন ২০২৬ছবি: রয়টার্স

কিন্তু নিজে যখন ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর প্রয়োজনীয়তার মুখে পড়লেন, তখন ট্রাম্পকে আরও বড় আকারের সম্পদ হস্তান্তর, অতিরিক্ত আর্থিক প্রণোদনা, লেবাননে যুদ্ধবিরতির সমর্থন এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে ইরান ও ওমানের আলোচনার সুযোগকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে তুলে ধরতে হয়েছে।

বিদেশে জব্দ থাকা ইরানি সম্পদ সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, ‘এটা আমাদের অর্থ নয়, এটা তাদেরই অর্থ। আমরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তা স্থগিত করেছিলাম। এখন মনে হচ্ছে, আমাদের সেটি ফিরিয়ে দিতে হবে।’

এক পর্যায়ে তাঁর বক্তব্যে ইরানের অবস্থানের প্রতিধ্বনিও শোনা যায়। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সৌদি আরবের যদি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকার অধিকার থাকে, তাহলে একই যুক্তিতে ইরানেরও তা থাকা উচিত।

ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি প্রসঙ্গে ট্রাম্প মন্তব্য করেন, অন্য অনেক দেশের মতো ইরানকেও শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে, বিশেষত বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য, এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া উচিত। তাঁর মতে, এ ক্ষেত্রে কিছু বাস্তবসম্মত চিন্তাভাবনা প্রয়োজন।

তবে সব বিতর্কের পরও ট্রাম্প প্রশাসনের এই সমঝোতা স্মারককে শেষ পর্যন্ত একটি বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত বলেই বিবেচনা করা যায়। রাজনৈতিক মূল্য যা-ই হোক না কেন, সংঘাত যত দ্রুত সম্ভব শেষ করা জরুরি ছিল।

বারবারা লিফ বলেন, ভুল পরিকল্পনার ভিত্তিতে শুরু হওয়া এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে—এতে তিনি গভীর স্বস্তি অনুভব করছেন। তবে ভবিষ্যতে ট্রাম্প প্রশাসন আবারও একই ধরনের সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে না, এমন নিশ্চয়তা এখনো নেই।

ওবামা আমলে জেসিপিওএ আলোচনায় অংশ নেওয়া সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা রবার্ট ম্যালির মতে, দুই চুক্তির সরাসরি তুলনা খুব একটা অর্থবহ নয়। কারণ, এগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রেক্ষাপটে সম্পাদিত হয়েছে।

তাঁর মূল্যায়ন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সমঝোতা স্মারক বিদ্যমান অন্য যেকোনো বাস্তবসম্মত বিকল্পের তুলনায় বেশি গ্রহণযোগ্য। এই সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা জোর দিয়ে বলেন, ‘এটাই চূড়ান্ত কথা।’